‘বাঙ্কার বাস্টার বোমার নাগালেরও বাইরে’: কোথায় আছে ইরানের অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম?
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ। তেহরানের কাছে মজুত পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
ধারণা করা হচ্ছে, এই ইউরেনিয়ামের একটা বড় অংশ মাটির এত গভীরে লুকানো রয়েছে যে, আমেরিকার শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমাও তা ধ্বংস করতে পারবে না। মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে সেই ইউরেনিয়াম উদ্ধার করতে গেলে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিশেষত কোনোভাবে এ ইউরেনিয়াম লিক করে বাতাসে আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে ওই পদার্থ অত্যন্ত বিষাক্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন কূটনৈতিক পথেই হাঁটতে চাইছে। বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে ইরানকে এই ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি করানোর চেষ্টা চলছে।
গত মঙ্গলবার সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, 'অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রাখা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির কারণেই ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তারা যদি এই মজুত ও করমসুচিত বাদ দিতে রাজি হয়, তবে চুক্তি মেনে চলার শর্তে সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে।'
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গত ফেব্রুয়ারির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ইরানের কাছে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। সাধারণত স্কুবা ডাইভিংয়ের সিলিন্ডারের আকারের পাত্রে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ রাখা হয়। ফলে পুরো মজুতটি সহজেই বিভিন্ন জায়গায় ভাগ করে রাখা সম্ভব।
আইএইএর পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন ছাড়া ইরানের এই পারমাণবিক উপকরণ ঠিক কোথায় রাখা আছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা অসম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে এই ইউরেনিয়াম কোথায় থাকতে পারে এবং তা উদ্ধার করা কেন এত কঠিন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ইরানের অধিকাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্ভবত ইস্ফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের কাছাকাছি মাটির নিচে মজুত রয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমেই এই উপাদানকে পারমাণবিক অস্ত্রের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
ওয়াশিংটনের গবেষণা সংস্থা জুইশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অভ আমেরিকার বিশ্লেষণে অনুসারে, ওই কমপ্লেক্সটি একটি পাহাড়ের নিচে এতটাই গভীরে অবস্থিত যে, তা বাঙ্কার-বাস্টার বোমার নাগালেরও বাইরে।
গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যখন আমেরিকাও সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, তখন তাদের বিমান হামলায় ইস্ফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্যাটেলাইট ছবি ইঙ্গিত করছে, কয়েকটি প্রবেশপথের ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে সম্ভবত সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে, সেগুলো ফের মাটিচাপা দেয় ইরান। এর কদিনের মধ্যেই ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল।
গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি বলছে, চলতি বছরের স্যাটেলাইট চিত্রে মাটির তৈরি কিছু প্রতিবন্ধকও চোখে পড়েছে। স্থলবাহিনীর আকস্মিক হামলা ঠেকাতেই সম্ভবত এই ব্যবস্থা। সংস্থাটিই গবেষক সারা বার্কহার্ড বলেন, একটি প্রবেশপথের কাছে আরও কিছু নতুন কাঠামো দেখা গেছে, যা প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখার ছাউনি হতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইরান যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইস্ফাহানে সরিয়ে নিয়ে গেছে, ছবিতে তারও কিছু পরোক্ষ প্রমাণ মিলেছে। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্রে ওই পারমাণবিক কমপ্লেক্সের এক প্রবেশপথের কাছে একটি কার্গো ট্রাক দেখা গিয়েছিল। সেটিতে যে ধরনের কনটেইনার বোঝাই ছিল, তা সাধারণত পারমাণবিক উপকরণ বহনের কাজেই ব্যবহৃত হয়। সংবাদমাধ্যম লা মঁদ-এ প্রথম এই ছবি-সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
যদিও ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে এখনও অনেক ধোঁয়াশা আছে। ওয়াশিংটনের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরমাণু বিশেষজ্ঞ জোসেফ রজার্স বলেন, '[ওই কনটেইনারে] সত্যিই ইউরেনিয়াম ছিল, নাকি ধাতু নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার সুরক্ষার্থে অন্য কোনো রাসায়নিক হচ্ছিল, সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।'
আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি অবশ্য মনে করেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি ছোট অংশ ইরানের বৃহত্তম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জেও রাখা থাকতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে আমেরিকা ও ইসরায়েল নাতাঞ্জে যৌথ বিমান হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল। চলতি বছরের মার্চে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ চলাকালীন সেখানে ফের হামলা চালানো হয়। পরমাণু বিশেষজ্ঞ রজার্সের ধারণা, ওই স্থাপনার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মাটির নিচে চিরতরে চাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সম্ভবত দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়েছিল। তবে সেখানে মজুত ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা ঠিক কী, তা এখনও অজানা।
নাতানজ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের প্রায় এক মাইল দূরে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইনের মাটির নিচে আরও একটি স্থাপনা আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সাল থেকে এর নির্মাণকাজ চলছে। স্যাটেলাইট ছবি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পরও ইরান সেখানে পুরোদমে কাজ চালিয়ে গেছে। সম্প্রতি সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ওই এলাকার চারপাশে একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে; সুড়ঙ্গের বেশ কিছু প্রবেশপথ আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
২০২৫ সালে মার্কিন বাহিনী প্রায় এক ডজন বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ফেলে ভূগর্ভস্থ ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাটি কার্যত ধ্বংস করে দিয়েছিল। তবে গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির দাবি, গত কয়েক সপ্তাহের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলোর দিকে যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে ইরান। সম্ভাব্য সামরিক হামলার গতি ধীর করতেই সম্ভত এই পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইস্ফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদোর বাইরে সম্পূর্ণ অজানা কোনো স্থানেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করে রাখা হতে পারে। তেমনটা হলে তেহরানের সহযোগিতা ছাড়া এই বিপুল ইউরেনিয়ামের মজুত উদ্ধার বা তা নষ্ট করা আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ওয়াশিংটনের সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের পরমাণু সামগ্রী সুরক্ষা কর্মসূচির ভাইস প্রেসিডেন্ট স্কট রোকার বলেন, 'আমেরিকা বা ইসরায়েল যৌথভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই পরমাণু সামগ্রী দখলের বা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা যদি ইরানের থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা এই মজতু এক জায়গায় না রেখে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রাখবে।'
ইরানের কাছে শুধু ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই নয়, অন্য মাত্রার ইউরেনিয়ামেরও বড় মজতু রয়েছে। আইএইএর সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশটির কাছে সব মিলিয়ে ১৯ হাজার ৯৩০ পাউন্ডেরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে ৪০৫ পাউন্ড, আর ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে ১৩ হাজার ২৮০ পাউন্ড।
এই সাধারণ ইউরেনিয়ামকে বোমার উপযোগী করে তুলতে কিছুটা সময় লাগলেও ইরানের অন্তত একটি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র সচল থাকলে তাদের সেই পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা থেকেই যাবে।
