ট্রাম্প ও ইরান: যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনে দ্বিমুখী চালে সুবিধা নিতে চাইছে চীন
ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হিসাব-নিকাশ মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই চীন নিজের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে নিজস্ব কৌশলে এগোচ্ছে। বেইজিং নিশ্চিত করতে চায় যে, যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, চূড়ান্ত মুনাফা যেন তাদের হাতেই থাকে।
একদিকে চীন ইরান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে অত্যন্ত গোপনে নিজেদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানে সহায়তা অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে। বেইজিংয়ের এই বাণিজ্যিক সমর্থন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ট্রাম্প যদি আবারো ইরানে আক্রমণ করেন, তাহলে ইরানের সামরিক বাহিনীকে সরাসরি সহায়তা করতে পারে।
চীন সরকার এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের বিষয়ে কোনো কঠোর বা সুনির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেনি। বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, চীনের লক্ষ্য এখানে বহুমুখী এবং তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলছে। মূলত যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তারা একটি 'হেজিং' বা ভারসাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছে।
আগামী ১৪ মে বেইজিংয়ে দুই দিনব্যাপী এক শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের বৈঠকের কথা রয়েছে। চলমান এই যুদ্ধ যে সেই সম্মেলনের একটি প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
একদিক থেকে চিন্তা করলে, মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আটকা পড়া চীনের জন্য সুবিধাজনক। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যেই তাদের বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ইরানের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে খরচ করে ফেলেছে, যা চীনের সাথে ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতে ব্যবহার করা যেত। এছাড়া এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ এশিয়া প্যাসিফিক থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ রেখেছে।
কিন্তু চীন আবার এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানার মধ্যেও নিজেদের ফায়দা দেখছে। দুই মাসেরও বেশি সময় আগে ট্রাম্প ও ইসরায়েল এই যুদ্ধের সূচনা করেছিল। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিলেও— চীনগামী তেলের জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এখন চীনের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মার্কিন নৌ-অবরোধের নেতিবাচক প্রভাবও বেইজিং অনুভব করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ফরেইন অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ গ্রুপ 'স্টিমসন সেন্টার'-এর চীনা বিশেষজ্ঞ ইউন সান বলেন, "যদিও অনেকে মনে করেন বেইজিং ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চায়, কিন্তু বাস্তবে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণী মহলে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষেই মত বেশি।"
ইরানের দুই কর্মকর্তার তথ্যমতে, চীন ও রাশিয়া উভয় দেশই ইরানকে আমেরিকানদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে এই যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছেন। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেঙ্গিউ জানান, বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং তার চীনা সমকক্ষ ওয়াং ই এই সংকট নিয়ে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।
যুদ্ধের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতোমধ্যেই শি জিনপিংয়ের সাথে পূর্বনির্ধারিত সম্মেলনটি একবার পিছিয়ে দিয়েছেন। কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প এখন শক্তিশালী অবস্থানে থেকে বেইজিংয়ে যেতে চান। তিনি চান না কোনো অমীমাংসিত সংঘাত বিশ্ববাজারকে অস্থির করে রাখুক কিংবা মার্কিন সামরিক শক্তিকে ক্ষয় করুক। নাহলে চীনের সাথে দর কষাকষিতে আমেরিকার অবস্থান আরও নাজুক হবে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউসের চীন নীতি নিয়ে কাজ করা এবং বর্তমানে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রাশ দোশি বলেন, "চীনের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো আমাদের নৌ-অবরোধ। আর আমাদের জন্য চিন্তার বিষয় হলো ইরানের প্রতি চীনের গোপন সমর্থন।"
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য রয়েছে যে, একটি চীনা কোম্পানি ইরানে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর চেষ্টা করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, চীনা কোম্পানিগুলো ইরানকে এমন সব সরঞ্জামও সরবরাহ করছে যা 'দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য' হিসেবে পরিচিত; অর্থাৎ এগুলো বেসামরিক কাজের পাশাপাশি সামরিক কাজেও লাগানো সম্ভব। যেমন অত্যাধুনিক কম্পিউটার চিপ, যা ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহার করা যায়।
গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ শুরু হওয়ার পর মেরিন সেনারা ইরানের পতাকাবাহী একটি জাহাজে কিছু সরঞ্জাম খুঁজে পায়, যা সম্পর্কে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন এগুলো 'খুব একটা সুবিধাজনক কিছু নয়' এবং সম্ভবত 'চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া উপহার'।
গত ২১ এপ্রিল সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম কারণ প্রেসিডেন্ট শি'র সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক এবং আমি ভেবেছিলাম আমাদের মধ্যে একটি সমঝোতা আছে। তবে ঠিক আছে, যুদ্ধ তো এভাবেই চলে, তাই না?"
এর এক সপ্তাহ আগে ফক্স নিউজকে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, তিনি শি জিনপিংকে একটি চিঠি লিখে ইরানকে অস্ত্র না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, শি চিঠির জবাবে জানিয়েছিলেন যে তিনি মূলত তেমন কিছু করছেন না।
এরপরেও ট্রাম্পের এই আপাত নিস্পৃহ আচরণ ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি যেভাবেই হোক শি'র সাথে প্রস্তাবিত সম্মেলনটি সফল করতে চান। কয়েক মাস আগে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ উপদেষ্টারা চীনের সাথে শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু এখন ইরান যুদ্ধ সেই সব আলোচনার ওপর গভীর ছায়া ফেলতে পারে।
বেইজিংয়ে সম্প্রতি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কিছু সাক্ষাৎকার নেন বিশ্লেষক ইউন সান, এরপরে তিনি জানান, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সরাসরি অনুরোধ না আসা পর্যন্ত বেইজিং ইরানের ওপর বড় ধরনের কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না।" যেহেতু চীনা কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে 'ইতিবাচক সম্পর্ক' জোরদার করতে চান, তাই ট্রাম্প যদি ইরানের বিষয়ে চীনের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট সাহায্য চান, তবে তারা সেটি গুরুত্বের সাথে নিতে পারে।
চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেঙ্গিউ এক বিবৃতিতে বলেছেন, "অঞ্চলটিকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা এবং জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের অনুকূল।" তিনি মার্কিন নৌ-অবরোধকে 'বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ' হিসেবে সমালোচনা করেন। তবে ইরান যেসব জাহাজকে 'সেফ প্যাসেজ' দেয়নি—সেগুলোর ওপর ইরানি বাহিনীর হামলার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
লিউ আরও যোগ করেন, "বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো যেকোনো উপায়ে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানো।" তিনি উল্লেখ করেন, এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির আগে চীনা শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ইরান, ইসরায়েল, রাশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সাথে ২৬ বার টেলিফোনে কথা বলেছেন।
তিনি আরও জানান, এর মধ্যে দুটি ফোনকল ছিল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিশেষ দূতও এই অঞ্চলে সফর করেছেন।
কয়েকজন বিদেশি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানকে যুদ্ধবিরতির শর্ত মানাতে নেপথ্যে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা এখন চীনকে এই প্রক্রিয়ায় আরও গভীরভাবে যুক্ত থাকার জন্য উৎসাহিত করছেন। সংবেদনশীল কূটনৈতিক বিষয় হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
ইরানে চীনা রপ্তানির বিষয়ে লিউ বলেন, "আমরা সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও দায়িত্বশীল এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানির ওপর আমাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।"
এদিকে 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ'-এর ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ জানান, ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যুদ্ধের পর চীনের সাথে সম্পর্ক আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তারা মূলত পাকিস্তানের মতো চীনের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সহায়তা পাওয়ার আশা করছে।
আলী ভায়েজ বলেন, "আমি দেখছি আইআরজিসি-র সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের কণ্ঠস্বর জোরালো হচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে বলছে যে ইরানের বড় ব্যর্থতা ছিল চীন ও রাশিয়ার সাথে জোটবদ্ধ না হয়ে—এককভাবে স্বাধীনতা রক্ষা করার চেষ্টা করা। তাদের মতে, পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে হলে দেশের একাংশ চীনের কাছে বন্ধকও রাখা রাখতে হবে।"
পারস্য উপসাগরের অপর প্রান্তে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও চাইছে, চীন যেন বড় ধরনের কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে। গত ২০ এপ্রিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেন।
একজন সৌদি কর্মকর্তার মতে, যুদ্ধের সময় দেশটি চীনের কাছে অনুরোধ করেছিল যেন তারা ইরানকে সৌদি আরবের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকার জন্য চাপ দেয়।
২০২৩ সালে চীন ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। রিয়াদ এখন চীনকে সৌদি-ইরান সম্পর্কের একজন অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করে।
পাকিস্তানও, যারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার প্রথম দফার আয়োজন করেছিল, আলোচনার অগ্রগতিতে চীনের ওপর নির্ভর করছে। গত ৩১ মার্চ চীন ও পাকিস্তান একটি পাঁচ দফা যৌথ বিবৃতি দেয়, যেখানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, শান্তি আলোচনা, বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়।
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্টে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন করতে সহায়তার জন্য পাঁচটি দেশকে ধন্যবাদ জানান। সেই তালিকার শীর্ষে ছিল চীনের নাম।
একই সপ্তাহে জাতিসংঘে রাশিয়া ও চীন একটি প্রস্তাবে ভেটো দেয়, যেখানে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের বিরুদ্ধে বহুজাতিক সামরিক অভিযানের কথা বলা হয়েছিল। এর মাধ্যমে চীন প্রকাশ্যে ইরানকে সমর্থন দেয়। তবে পর্দার আড়ালে চীন ইরানকে নমনীয় হতে এবং যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তা সত্ত্বেও, কিছু বিশ্লেষক মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক ভূমিকা বাড়ানোর ইচ্ছা সম্ভবত খুব বেশি না। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা রায়ান হাস বলেন, "বেইজিংয়ের অগ্রাধিকারগুলো অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। তারা মূলত জ্বালানি শক্তির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং তাদের রপ্তানি পণ্যের জন্য নিরাপদ বাজার চায়। তারা অন্য কোনো অঞ্চলের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে নিজের কাঁধে তুলে নিতে আগ্রহী নয়।"
