পারমাণবিক জ্বালানি কী? যেভাবে চলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
পারমাণবিক শক্তি হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্র থেকে নির্গত শক্তি, যা প্রোটন এবং নিউট্রন দ্বারা গঠিত। এই শক্তি দুটি উপায়ে উৎপাদিত হতে পারে: ফিশন—যখন পরমাণুর নিউক্লিয়াস কয়েক ভাগে বিভক্ত হয় এবং ফিউশন—যখন একাধিক নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহৃত হয় তা হলো নিউক্লিয়ার ফিশন। অন্যদিকে, ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারমাণবিক সমাধান তুলে ধরছে জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে।
নিউক্লিয়ার ফিশন কী?
নিউক্লিয়ার ফিশন হলো এমন একটি বিক্রিয়া, যেখানে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস দুই বা ততোধিক ক্ষুদ্রতর নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয় এবং একই সাথে শক্তি নির্গত করে।
উদাহরণস্বরূপ, যখন একটি নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে, তখন সেটি দুটি ছোট নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয় (যেমন: বেরিয়াম এবং ক্রিপ্টন নিউক্লিয়াস) এবং সাথে দুটি বা তিনটি নিউট্রন নির্গত করে। এই অতিরিক্ত নিউট্রনগুলো চারপাশের অন্যান্য ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুকে আঘাত করে, যা পুনরায় বিভাজিত হয় এবং আরও নিউট্রন তৈরি করে। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে একটি গুণিতক প্রভাব বা 'চেইন রিঅ্যাকশন' তৈরি হয়।
প্রতিবার বিক্রিয়াটি ঘটার সময় তাপ এবং তেজস্ক্রিয়তার আকারে শক্তি নির্গত হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করা হয়; ঠিক যেভাবে কয়লা, গ্যাস বা তেলের তাপ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে কাজ করে?
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর এবং এর সরঞ্জামগুলো ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদনের জন্য চেইন রিঅ্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করে। এক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে সাধারণত ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহৃত হয়।
এই তাপ রিঅ্যাক্টরের শীতলীকরণ এজেন্টকে (সাধারণত পানি) উত্তপ্ত করে বাষ্প তৈরি করে। এরপর সেই বাষ্পকে পাইপের মাধ্যমে টারবাইন ঘোরানোর জন্য পাঠানো হয়, যা একটি ইলেকট্রিক জেনারেটরকে সচল করে কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ইউরেনিয়াম আহরণ, সমৃদ্ধকরণ ও নিষ্পত্তি
ইউরেনিয়াম একটি ধাতু যা সারা বিশ্বের শিলা বা পাথরের মধ্যে পাওয়া যায়। ইউরেনিয়ামের বেশ কিছু প্রাকৃতিক আইসোটোপ রয়েছে।
আইসোটোপ হলো একই মৌলের ভিন্ন রূপ যাদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এক হলেও ভর ও ভৌত বৈশিষ্ট্য আলাদা। ইউরেনিয়ামের দুটি প্রধান আইসোটোপ হলো: ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫।
বিশ্বের অধিকাংশ ইউরেনিয়ামই ইউরেনিয়াম-২৩৮, কিন্তু এটি ফিশন চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করতে পারে না।
অন্যদিকে, ইউরেনিয়াম-২৩৫ ফিশনের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু এটি বিশ্বের মোট ইউরেনিয়ামের ১ শতাংশেরও কম।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে ফিশন প্রক্রিয়ার উপযোগী করার জন্য 'ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ' নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একবার সমৃদ্ধ করা হলে, এটি তিন থেকে পাঁচ বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রে কার্যকরভাবে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এরপরেও এটি তেজস্ক্রিয় থাকে এবং মানুষ ও পরিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর নির্দেশিকা অনুসরণ করে এটি নিষ্পত্তি করতে হয়।
ব্যবহৃত জ্বালানি বা 'স্পেন্ট ফুয়েল' রিসাইকেল করে বিশেষ ধরনের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল কী?
নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল বা পারমাণবিক জ্বালানি চক্র হলো একটি শিল্প প্রক্রিয়া যা ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে গঠিত। এই চক্র খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলন দিয়ে শুরু হয় এবং পারমাণবিক বর্জ্য নিষ্পত্তির মাধ্যমে শেষ হয়।
পারমাণবিক বর্জ্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ফলে বিভিন্ন মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এবং প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এগুলোকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য মোট বর্জ্যের খুব সামান্য অংশ মাত্র।
প্রতি বছর লাখ লাখ চিকিৎসা পদ্ধতি, তেজস্ক্রিয়তা ব্যবহারকারী শিল্প ও কৃষি প্রয়োগ এবং পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর (যা বিশ্বের প্রায় ৯ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে) থেকে এই উপজাত তৈরি হয়। বর্তমান এবং ভবিষ্যতে তেজস্ক্রিয়তা থেকে মানুষ ও পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য এই বর্জ্যগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যবস্থাপনা করা হয়।
ভবিষ্যতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
আগামী প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে 'উন্নত রিঅ্যাক্টর' বলা হয়, যা বর্তমান রিঅ্যাক্টরগুলোর তুলনায় অনেক কম বর্জ্য তৈরি করবে। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে।
পারমাণবিক শক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তন
পারমাণবিক শক্তি হলো একটি লো-কার্বন বা স্বল্প-কার্বন নিঃসরণ করে এমন শক্তির উৎস। কারণ, কয়লা, তেল বা গ্যাস চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো পরিচালনার সময় কার্যত কোনো কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করে না।
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরগুলো বিশ্বের মোট স্বল্প-কার্বন বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
