ইরান যুদ্ধ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আমেরিকার থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে
ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, আর সেই অনুযায়ী নিঃশব্দে নিজস্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে। অধিকাংশ দেশই 'অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার' নীতি গ্রহণ করেছে; তবে এই সতর্ক এবং নিরপেক্ষ অবস্থানের আড়ালে তারা ওয়াশিংটনের ওপর তাদের প্রতিরক্ষা নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করছে।
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং তার পরপরই মালাক্কা প্রণালির ওপর দিয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে উড্ডয়ন সুবিধা (ওভারফ্লাইট রাইটস) দেওয়ার বিষয়ে, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ এবং তারই ফলশ্রুতিতে পরে সেই প্রবেশাধিকার স্থগিতের ঘটনাটিও এই উত্তেজনারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অননুমেয় এবং লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের রাজধানীর মধ্যেকার ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এই মিত্রদের মধ্য্যে আস্থার ক্ষয় এবং নীতিগত সংহতির অভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। একই সঙ্গে আসিয়ান-এর বহুপাক্ষিক কাঠামোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ এই অঞ্চলে তাদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বহীনতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদিও এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে, তবে আগে তা সব সময় সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ বা ফলাফল দ্বারা সমর্থিত ছিল না। বারাক ওবামার 'পিভট টু এশিয়া', প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' এবং জো বাইডেনের অধীনে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাধ্যমে পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো বারবার এই অঞ্চলে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে বর্তমানে অত্র অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এর একটি প্রধান এবং দৃশ্যমান সূচক হলো—চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মিত্র ও অংশীদারদের কাছ থেকে প্রশ্নাতীত সমর্থনের অভাব। এমনকি ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালকৃষ্ণান গত মার্চ মাসের শেষের দিকে বলেছিলেন: "সংঘাত শুরু হওয়ার ঘটনায় আমি বিস্মিত হয়েছি। আমি মনে করি না, এর কোনো প্রয়োজন ছিল। এটি মোটেও সহায়ক নয়। এমনকি এখন এই যুদ্ধের বৈধতা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অথচ দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদের নীতি, বহুপাক্ষিকতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌম সমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিশ্বায়নের একটি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিয়ে এসেছিল। এটি বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন সমৃদ্ধি ও শান্তির এক যুগ নিশ্চিত করেছিল।"
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের 'স্টেট অফ সাউথইস্ট এশিয়া ২০২৬' জরিপ। খুব সঙ্গত কারণেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এই অঞ্চলের মনোভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ৫২% উত্তরদাতা এখন চীনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন, বিপরীতে ৪৮% এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে পছন্দ করছেন। সামগ্রিকভাবে এ ব্যবধান খুব সামান্য হলেও ফলাফলটি তাৎপর্যপূর্ণ: আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অপেক্ষা চীনকে এখন অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ মনে করছেন এই অঞ্চলের সাধারণ জনগণ।
আরও অবাক করা বিষয় হলো স্বতন্ত্রভাবে দেশগুলোর জনমতের ভিন্নতা। ইন্দোনেশিয়ায় ৮০%, মালয়েশিয়ায় ৬৮% এবং সিঙ্গাপুরের ৬৬% উত্তরদাতারা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্কের প্রতি স্পষ্ট ঝোঁক দেখিয়েছেন। এর বিপরীতে ফিলিপাইনের মাত্র ২৩% উত্তরদাতা চীনের দিকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথম কারণটি হচ্ছে, হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত ও অচলাবস্থা আসিয়ানের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে মারাত্মক আঘাত হেনেছে।
আসিয়ান সেন্টার অন এনার্জি-র রিপোর্ট অনুসারে, গত বছর আসিয়ান-ভুক্ত দেশগুলোর মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫৬% এসেছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে বর্তমান জ্বালানি সংকট সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যেই আঞ্চলিক বাজারগুলোতে অনুভূত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা থাইল্যান্ডের পুঁজিবাজারে থাকা তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দ্রুত হ্রাস পেতে থাকা আস্থা একটি বড় কারণ। শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ফোকাসের অভাব—ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয়কে আরও ঘনীভূত করেছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক, মেজাজি এবং প্রায়শই অস্থিরমতির দৃষ্টিভঙ্গি এই অঞ্চলের মিত্র ও অংশীদারদের তাদের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত একাধিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সম্পদ অতিরিক্ত ছড়িয়ে পড়া এবং দেশে-বিদেশে 'আমেরিকা ফার্স্ট' বা 'আমেরিকা প্রথম' নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রেক্ষাপটে, আসিয়ান দেশগুলোর এই কৌশলগত পরিবর্তন যুক্তিযুক্ত ও বোধগম্য।
পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃশ্যমান ব্যর্থতা একটি কঠিন সত্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে—স্বনির্ভরতা এবং বড় শক্তিগুলোর বিশ্বাসযোগ্য কৌশলগত সমর্থনই নিরাপত্তার চূড়ান্ত গ্যারান্টি।
এই অঞ্চলের অনেক মাঝারি ও ছোট শক্তির কাছে পছন্দটি এখন আর শুধু 'যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন'-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যদিও ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা কমছে, এর মানে এই নয় যে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেইজিংয়ের কক্ষপথে চলে যাচ্ছে।
পরিবর্তে, অধিকাংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ কৌশলগত অংশীদারিত্বের বৈচিত্র্যকরণ এবং নমনীয়তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে—তারা এমন অংশীদার হিসেবে দেখছে, যাদের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
মার্কিন-চীন দ্বৈরথকে প্রায়শই চীনের জন্য সুবিধাজনক হিসেবে দেখা হয়, তবে এই ধারণাটি অতি-সরলীকরণ। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে আসিয়ানের অভ্যন্তরে বিভাজন এখনো প্রবল।
যদিও চীন প্রায়শই আসিয়ান সদস্যদের মধ্যকার মতভেদকে নিজের কাজে লাগিয়েছে, তবে এই খণ্ডবিখণ্ড অবস্থা বেইজিংয়ের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপাইনের আরও জোরালো অবস্থান আঞ্চলিক কৌশল বজায় রাখার ক্ষেত্রে চীনের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে।
মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো একে তাদের নিজস্ব যুদ্ধ হিসেবে দেখছে না। বরং এটি তাদের বৈশ্বিক অবস্থানের পুনর্মূল্যায়ন করতে এবং আরও স্বায়ত্তশাসিত পররাষ্ট্রনীতি তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে।
সংকট সুযোগও তৈরি করে। অনেক আসিয়ান রাষ্ট্রের জন্য এটি হতে পারে অভ্যন্তরীণ বিভাজন মিটিয়ে ফেলার এবং একটি সুসংহত ও সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার মুহূর্ত—এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যা এই জোটকে শক্তিশালী করবে এবং বাহ্যিক আঘাতের মুখে তাদের দুর্বলতার জায়গাগুলোকে কমিয়ে আনবে।
লেখক: ডা. রাহুল মিশ্র ভারতের নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক এবং থাইল্যান্ডের থাম্মাসাট ইউনিভার্সিটির জার্মান-সাউথইস্ট এশিয়ান সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ফর পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্স-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। তিনি 'প্যালগ্রেভ সিরিজ ইন ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাডিজ'-এর সিরিজ এডিটর।
