ইরান যুদ্ধের জেরে ফুরিয়ে যাচ্ছে বিমানের জ্বালানি, বাতিল হতে পারে বহু ফ্লাইট
আপনি হয়ত ভাবছেন এবারের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুম খুব একটা ভালো কাটবে না। তবে আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখুন। ইরান যুদ্ধের কারণে বিমানভাড়া ও বিভিন্ন ফি বাড়ার পাশাপাশি এখন ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক এয়ারলাইন্স জেট জ্বালানির সম্ভাব্য সংকটের মুখে পড়েছে। এতে ফ্লাইট বাতিল ও সময়সূচি কমানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এখনই জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো সরাসরি ঝুঁকি না থাকলেও, বিশ্বব্যাপী এই সংকট মার্কিন এয়ারলাইনসগুলোর জন্য জ্বালানির খরচ আকাশচুম্বী করে তুলছে। মুনাফা বজায় রাখতে তারা এখন সস্তা ভাড়ার টিকিট বন্ধ করছে এবং কম লাভজনক রুটগুলোতে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। এই পদক্ষেপের কারণে বিশেষ করে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে মার্কিন পর্যটকদের পকেট থেকে আরও অনেক বেশি টাকা গুনতে হবে।
এমনকি আজ যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হয়, তবুও আসন্ন গ্রীষ্মের ভ্রমণের ওপর এর প্রভাব রয়েই যাবে। কারণ এয়ারলাইনসগুলো কয়েক মাস আগে থেকেই তাদের রুট এবং ভাড়ার পরিকল্পনা করে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, 'ইউনাইটেড এয়ারলাইনস' আগামী ছয় মাসের জন্য তাদের পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
পুরো গ্রীষ্মের আগে এয়ারলাইনস বা যাত্রীদের জন্য স্বস্তির কোনো খবর আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ তেল ও জেট ফুয়েলের স্বাভাবিক সরবরাহ পুনরায় নিশ্চিত করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। এনার্জি কনসাল্টিং ফার্ম 'কেপলার'-এর প্রধান মার্কিন বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, 'অন্তত জুলাই পর্যন্ত সময় লাগবে। আর সেটিও এখন অনেক আশাবাদী হয়ে করা হিসাব।'
শ্রম ব্যয়ের পরেই জ্বালানি হলো একটি এয়ারলাইনসের দ্বিতীয় বৃহত্তম খরচ। একটি সাধারণ সরু বডির বাণিজ্যিক বিমান ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ গ্যালন তেল পোড়ায়। বড় বিমানগুলোর ক্ষেত্রে এটি আরও অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বড় চারটি এয়ারলাইনস—ইউনাইটেড, আমেরিকান, ডেল্টা এবং সাউথওয়েস্ট—গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১০ কোটি ডলার খরচ করেছে কেবল তেলের পেছনে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ডেল্টা এয়ারলাইনস জানিয়েছে, নিজস্ব শোধনাগার থাকা সত্ত্বেও এ বছর তাদের আরও ২ বিলিয়ন ডলার বাড়তি খরচ হতে পারে। অন্যদিকে ইউনাইটেডের প্রধান নির্বাহী স্কট কার্বি মার্চ মাসে কর্মীদের জানিয়েছিলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে তাদের জ্বালানি খরচ ১১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ডয়চে ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য যেমন—ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মতো জায়গায় যাতায়াতের শেষ মুহূর্তের বিমান ভাড়া এ মাসের শুরুতে ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া হাওয়াই ভ্রমণের ভাড়াও বেড়েছে ২১ শতাংশ।
কেন এই জ্বালানি সংকট?
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী এবং জেট ফুয়েল রপ্তানিকারক হওয়ায় বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর তুলনায় মার্কিন সংস্থাগুলো কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। তবে কুয়েত ও বাহরাইনের মতো শীর্ষ রপ্তানিকারকদের জ্বালানি এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে আটকা পড়ে আছে। গত বছর সমুদ্রপথে সরবরাহ করা বৈশ্বিক জেট ফুয়েলের ২০ শতাংশেরও বেশি এই পথ দিয়ে গিয়েছিল, যার দুই-তৃতীয়াংশই যেত ইউরোপে।
বিশ্বের অনেক জেট ফুয়েল এশিয়ায় পরিশোধিত হয়, যার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া শীর্ষস্থানীয়। কিন্তু এশীয় দেশগুলো যে অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে, তার বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার পরিচালক উইলি ওয়ালশ গত সপ্তাহে জানিয়েছেন যে, অনেক এশীয় দেশ ইতোমধ্যে জেট ফুয়েল রপ্তানি সীমিত করতে শুরু করেছে। এটি মার্কিন বাজারে তেলের দামের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
বিপাকে স্বল্প ব্যয়ের এয়ারলাইনসগুলো
উচ্চ জ্বালানি মূল্য আর্থিকভাবে দুর্বল এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন্স স্পিরিট গত ১৮ মাসে দুইবার দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করেছে। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে তারা গ্রীষ্মের মধ্যে দেউলিয়া অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল।
তবে মার্চের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি তাদের ফলাফলে 'তাৎক্ষণিক ও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব' ফেলতে পারে, যা ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি ভেঙে প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
একইভাবে নতুন শুরু হওয়া বা আর্থিকভাবে দুর্বল অন্যান্য সাশ্রয়ী এয়ারলাইনসগুলোও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফিচ রেটিংস সতর্ক করেছে যে, এই সম্মিলিত চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক এয়ারলাইনস খেলাপি হতে পারে। বাজারে সস্তা ফ্লাইটের সংখ্যা কমে গেলে সামগ্রিকভাবে বিমান ভাড়া আরও বৃদ্ধি পাবে।
বড় এয়ারলাইনসগুলো ইতিমধ্যে তাদের ফ্লাইট শিডিউল ছোট করে আনছে এবং শুধুমাত্র লাভজনক রুটে নজর দিচ্ছে। আসন সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো, অবশিষ্ট টিকিটগুলোর দাম আরও বেড়ে যাওয়া। এ বিষয়ে ইউনাইটেডের সিইও স্কট কার্বি ব্লুমবার্গকে বলেছিলেন, 'যেসব ফ্লাইট লোকসান দেবে এবং জ্বালানি খরচ তুলতে পারবে না, সেগুলো চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না।'
