সংঘাত শেষ পর্যায়ে, ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চাই: সহযোগীদের ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, তিনি ইরানে কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চান না এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে চান।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পূর্ণ হতে চলল। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন, সংঘাতটি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প আগে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের যে সময়সীমার কথা জনসমক্ষে বলেছিলেন, সেই পরিকল্পনাতেই অটল থাকতে তিনি উপদেষ্টাদের তাগিদ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বেইজিংয়ে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি শীর্ষ সম্মেলনের পরিকল্পনা করছেন। তারা আশা করছেন, সেই বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।
তবে মূল সমস্যা হলো, ট্রাম্পের সামনে যুদ্ধ শেষ করার সহজ কোনো পথ আপাতত খোলা নেই এবং শান্তি আলোচনাগুলো এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের মনোযোগ মাঝেমধ্যে অন্য বিষয়ের দিকে সরে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন, বিমানবন্দরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের পাঠানোর সিদ্ধান্ত এবং ভোটারদের যোগ্যতার নিয়ম কঠোর করতে কংগ্রেসে আইন পাসের কৌশল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ একজন জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট তার এক সহযোগীকে বলেছেন যে এই যুদ্ধ তার অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক কাজের ক্ষেত্রে 'বিঘ্ন' ঘটাচ্ছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন এমন অন্য একজন জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট তার পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জের দিকে মনোযোগ দিতে প্রস্তুত। তবে সেই চ্যালেঞ্জটি ঠিক কী হবে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তার কোনো কোনো মিত্র আশা করছেন, ট্রাম্প এখন কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার দিকে নজর দেবেন। তবে তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা চান, ট্রাম্প এখন ভোটারদের সবথেকে জরুরি সমস্যা অর্থাৎ 'জীবনযাত্রার ব্যয়' নিয়ে কাজ করুন, যা এই যুদ্ধের কারণে আরও শোচনীয় রূপ নিয়েছে।
'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে অত্যন্ত দক্ষ এবং তিনি একই সঙ্গে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন,' জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। তিনি বলেন, ইরানের 'সন্ত্রাসী' শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ট্রাম্প পুরোপুরি মনোযোগী এবং তার একমাত্র লক্ষ্য হলো 'বিজয়'।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প এই সংঘাত নিরসনে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এমনকি সপ্তাহের শেষে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর যে হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, তা থেকেও কিছুটা সরে এসেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রাথমিক প্রস্তাবগুলো আদান-প্রদান করছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আগামী দিনগুলোতে আরও আলোচনার বিষয়ে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও অতিরিক্ত সৈন্য পাঠিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্প একটি বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সেটি হলো—যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব বা প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। তবে তিনি এ-ও জানিয়েছেন যে এই বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ শুরু হয়নি।
বুধবার সাংবাদিকদের প্রেস সেক্রেটারি লেভিট স্পষ্ট করে বলেন, ইরান যদি যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে দেশটির ওপর 'এযাবৎকালের সবথেকে শক্তিশালী আঘাত' হানা হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো ফাঁকা বুলি দেন না এবং তিনি নরক নামিয়ে আনতে প্রস্তুত।'
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইরানি ভূখণ্ডে স্থল সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিতে রাজি থাকলেও এখনই তা করতে কিছুটা দ্বিধান্বিত। এর কারণ হলো, তিনি মনে করেন এটি যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি ঘটানোর লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন ১৩ জন।
প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। কারণ সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি কখনো কূটনীতি, আবার কখনো হামলা বাড়ানোর দোলাচলের মধ্যে রয়েছেন। তবে ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারা ট্রাম্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে।
তবে যুদ্ধ শেষ করা কেবল ট্রাম্পের একার হাতে নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো থেকে অনেক দূরে রয়েছে এবং তেহরান এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি বা সামরিক বিজয় ছাড়া ট্রাম্পকে হয়তো হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থার মুখে পড়তে হবে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল রাখছে। পাশাপাশি ইসরায়েলও ইরানের হুমকিকে নিজেদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে, তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াই অভিযান চালিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের হামলার শিকার হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে।
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্প তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার পদাতিক সৈন্য মোতায়েন করছে যাতে প্রেসিডেন্টের সামনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প থাকে। অতিরিক্ত সৈন্য এবং মেরিনরা সেখানে অবস্থান নিলে ট্রাম্প খুব দ্রুত ইরানের অভ্যন্তরে অথবা দেশটির দক্ষিণ উপকূলের কোনো দ্বীপে সুনির্দিষ্ট অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন।
গত মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেন, 'আমরাও এই আলোচনার অংশ। আমরা বোমার মাধ্যমে দরকষাকষি করি।'
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনায় 'বেশ হতাশ'। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, 'তারা কোনো সমঝোতায় আগ্রহী ছিলেন না, তারা কেবল এই লড়াইয়ে জয়ী হতে চেয়েছিলেন।'
গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় দ্রুত সামরিক সফলতায় উজ্জীবিত হয়ে ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই যুদ্ধকে একটি সাময়িক বিষয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি এই সংঘাতকে একটি 'সফর' এবং 'সামরিক অভিযান' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গত মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, 'এই যুদ্ধে জয় অর্জিত হয়েছে। কেবল ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলোই এটি জিইয়ে রাখতে চায়।' ট্রাম্প এই যুদ্ধের বোঝা মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপানোর চেষ্টাও করছেন এবং তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা গুরুত্বপূর্ণ তেল করিডোর হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনের দায়িত্ব নেয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। গত মঙ্গলবার সাউথ ফ্লোরিডায় একটি 'স্টেট লেজসলেটিভ' (রাজ্য বিধানসভা) আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, যা ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্টের অন্তর্ভুক্ত এলাকা।
রিপাবলিকানরা আশঙ্কা করছেন যে যুদ্ধের উচ্চ ব্যয় এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে দলীয় প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সময় বের করে নিচ্ছেন। গত শুক্রবার মার-এ-লাগোতে মাথাপিছু ১,২০০ ডলারের একটি তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় রিপাবলিকানরা তাকে 'ইউএসএ' স্লোগানে স্বাগত জানান। ট্রাম্প কৌতুক করে বলেন, 'আমি জানতাম না যে আজ আমি এখানে থাকব। আমার এখন যুদ্ধ পরিচালনা করার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ খুব ভালোভাবেই চলছে।'
