ওয়াশিংটনে বন্দুকধারীর গুলিতে গুরুতর আহত ২ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য
আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসের একেবারে কাছে গুলিবর্ষণের ঘটনায় দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। হোয়াইট হাউস থেকে মাত্র দুই ব্লক দূরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। শহরের মেয়র এটিকে একটি 'টার্গেটেড শুটিং' বা 'পরিকল্পিত হামলা' বলে অভিহিত করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার বিকেলে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি একাই ওই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলির শব্দ শোনামাত্র আশপাশে অবস্থানরত অন্য ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে হামলাকারীকে আটক করেন।
সামনেই যুক্তরাষ্ট্রে 'থ্যাংকসগিভিং' উৎসব। ঠিক তার আগের দিন এমন হামলায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর সতর্কতার অংশ হিসেবে কিছু সময়ের জন্য হোয়াইট হাউস অবরুদ্ধ (লকডাউন) করে রাখা হয়। এমনকি শহরের প্রধান বিমানবন্দরেও সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছিল।
ঘটনার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডায় অবস্থান করছিলেন। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হামলাকারীকে এর জন্য 'চড়া মূল্য' দিতে হবে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আটক হওয়া সন্দেহভাজন ব্যক্তি একজন আফগান নাগরিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিনজন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, হামলাকারীর নাম রহমানুল্লাহ লাকানওয়াল।
বুধবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ নিশ্চিত হয়েছে যে, আটক ব্যক্তি একজন বিদেশী। সে আফগানিস্তান থেকে আমাদের দেশে ঢুকেছে।' এ সময় ট্রাম্প আফগানিস্তানকে 'পৃথিবীর বুকে এক নরক' বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি দাবি করেন, বাইডেন প্রশাসনের আমলে 'অপারেশন অ্যালাইজ ওয়েলকাম'-এর আওতায় ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিশেষ ব্যবস্থায় (মাস প্যারোল) ওই ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) আবেদন করেন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসনই তার সেই আবেদন মঞ্জুর করেছিল।
ট্রাম্পের সুর মিলিয়েই ওয়াশিংটন ডিসির হামলার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ক্রিস্টি নোয়েম। তিনি সন্দেহভাজন হামলাকারীর জাতীয়তা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অভিবাসন নীতিকে এই সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
হামলাকারীর নাম উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, 'আমি এই জঘন্য ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করব না। সে যে পরিচিতি পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছে, তা থেকে তাকে বঞ্চিত রাখা উচিত।'
ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের সাহসিকতার প্রশংসা করে নোয়েম জানান, তিনি এবং তার স্বামী আহত ভুক্তভোগীদের, তাদের পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য সদস্যদের জন্য প্রার্থনা করছেন।
ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের দায়িত্বে থাকা 'জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স ডিসি' এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে ফ্যারাগাট স্কয়ার মেট্রো স্টেশনের কাছে হামলাটি ঘটে।
শহরের ১৭ নম্বর এবং 'আই' স্ট্রিটের মোড়ে—যেখানে দুপুরের খাবারের সময় অফিসকর্মীদের ভিড় থাকে—সেখানেই বিশেষ টহলে ছিলেন ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা।
মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী প্রধান জেফ ক্যারল ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি হঠাৎ রাস্তার মোড় ঘুরে এসে কোনো সতর্কতা ছাড়াই টহলরত সদস্যদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে।
কাছাকাছি অবস্থানরত ন্যাশনাল গার্ডের অন্য সদস্যরা গুলির শব্দ শুনে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। জেফ ক্যারল বলেন, 'তারা সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। হামলাকারী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পুলিশ পৌঁছানো পর্যন্ত গার্ড সদস্যরা তাকে মাটিতে চেপে ধরে রাখেন।'
এফবিআই এখন এই ঘটনার তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল বলেন, ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের ওপর 'অত্যন্ত দুঃসাহসিক ও ভয়াবহ সহিংস হামলা' চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে সিবিএস নিউজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সন্দেহভাজন হামলাকারীর শরীরে চারটি গুলি লেগেছে।
হামলায় ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বা এর পেছনের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে অবস্থানরত ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক বার্তায় হামলাকারীকে 'পশু' বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি লিখেছেন, 'আমাদের দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্য এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। হামলাকারীও গুরুতর আহত। তবে যাই হোক, এর জন্য তাকে খুব চড়া মূল্য দিতে হবে।' তিনি সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
ঘটনার সময় উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে জানান, তিনি প্রথমে দুটি এবং পরপরই আরও তিনটি গুলির শব্দ শোনেন। গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। কেউ কেউ প্রাণ বাঁচাতে নিকটবর্তী একটি মদের দোকানে আশ্রয় নেন।
ঘটনাস্থলের কাছে গাড়িতে থাকা আরেক ব্যক্তি বিবিসিকে একটি ভিডিও দেখান। সেখানে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ দুই সেনা ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন এবং চিকিৎসকরা তাদের সেবা দিচ্ছেন। পাশের ফুটপাতে সন্দেহভাজন হামলাকারীকেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
এই হামলার পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসিতে অবিলম্বে আরও ৫০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পেন্টাগন প্রধান বলেন, 'রাজধানীকে নিরাপদ ও সুন্দর রাখার জন্য আমাদের সংকল্প এতে আরও দৃঢ় হবে।'
বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় ২,২০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, ওহাইও, জর্জিয়া ও আলাবামাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে এসব সেনা আনা হয়েছে। এরা মূলত সংরক্ষিত বা 'রিজার্ভিস্ট' বাহিনী। তাদের সামরিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা থাকলেও সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার বা আইন প্রয়োগের সরাসরি ক্ষমতা নেই।
শহরে অপরাধ 'নিয়ন্ত্রণের বাইরে' চলে গেছে—এমন অজুহাতে গত আগস্টে ট্রাম্প ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, এরপর অপরাধ কিছুটা কমেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যেখানে ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল, এ বছর একই সময়ে তা কমে ৬২-তে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আগস্ট থেকে মোট অপরাধের সংখ্যা ৯,৫০০ থেকে কমে প্রায় ৬,৫০০ হয়েছে।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লস অ্যাঞ্জেলেস ও শিকাগোর মতো ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতেও ন্যাশনাল গার্ড পাঠিয়েছেন। তিনি একে অপরাধ দমনের পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, বিরোধীরা একে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহার বলে সমালোচনা করছেন।
