ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর পোকরোভস্ক দখলের দ্বারপ্রান্তে রাশিয়া
রাশিয়ার সেনারা ধীরে ধীরে পূর্ব ইউক্রেনের কৌশলগত শহর পোকরোভস্ক দখলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পোকরোভস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব।
প্রায় তিন বছর আগে মস্কো ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকেই এই শহরের পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপ হয়েছে। তবে বর্তমানে এর প্রধান সরবরাহ লাইনগুলো হুমকির মুখে রয়েছে।
ইউক্রেন শহরটি রক্ষা করতে কঠোর চেষ্টা করছে। তবে শহরটি যদি পুরোপুরি ঘেরাও বা দখল হয়ে যায়, তাহলে রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের একাধিক শহরে আক্রমণ করার সযোগ পাবে। এতে কিয়েভের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে, যা যুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইউক্রেনের জন্য আরও কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।
পোকরোভস্ক শহরের অভ্যন্তরে মানুষের জীবনযাত্রা খুবই দুর্বিষহ। আঞ্চলিক গভর্নরের তথ্যমতে, যুদ্ধের আগে এই শহরের জনসংখ্যা ছিল ৬০ হাজার, কিন্তু এখন সেখানকার মাত্র ৭ হাজার বাসিন্দা বেঁচে আছেন।
শহরের শেষ পোস্ট অফিসটি সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। ডাকপিয়নরা এখন সুরক্ষিত আর্মড ট্রাকে করে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত কয়েকদিনে মস্কোর সেনারা পূর্ব ইউক্রেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব দিনিপ্রো শহর থেকে পোকরোভস্কে প্রবেশের মূল রেল লাইনে পৌঁছে গেছে।
পোকরোভস্ক ফ্রন্টে যুদ্ধরত ইউক্রেনের ৫৯তম অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ডেপুটি কমান্ডার বলেন, 'পরিস্থিতি কঠিন, শত্রুরা নিয়মিত স্থলভাগে আক্রমণ করছে।'
ওই অফিসার বলেন, শত্রু বাহিনী অনেক বেশি পদাতিক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করছে। তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আক্রমণ করছে এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতির পরও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ভূ-প্রকৃতি এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে ড্রোন থেকে আড়ালে রাখছে।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, 'তারা একনাগাড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।'
দনেস্ক অঞ্চলের পূর্ব ইউক্রেনে অবস্থিত পোকরোভস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেল সংযোগ কেন্দ্র। এটি ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনের বিশাল অংশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ কেন্দ্র। তবে গত কয়েক মাসে রাশিয়ার আর্টিলারি ও ড্রোন হামলার হুমকির কারণে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ওয়াশিংটনে কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কোফম্যান বলেন, পোকরোভস্কের ট্রানজিট রুটগুলো এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যদি শহরটি পতিত হয় তাহলে রুশ বাহিনী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উত্তর বা পশ্চিমে আক্রমণ জোরদার করতে পারবে।
তিনি বলেন, 'এর ফলে রুশ বাহিনী দনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়ারওে সুযোগ পাবে..তাই ফ্রন্টলাইনের পেছনে তারা রেললাইন তৈরি করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এরপর তারা নিজেদের লজিস্টিক্স এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। এর ফলে তাদের আরও পশ্চিমে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।'
দনিপ্রোপেট্রোভস্ক একটি বড় প্রদেশ, যার পূর্ব প্রান্তটি পোকরোভস্কের মুখোমুখি। রুশ সেনারা বর্তমানে এর সীমানা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার (৩ মাইল) দূরে রয়েছে। যদিও রাশিয়া ইউক্রেনের যে চারটি অঞ্চল দাবি করেছে, এটি তার অন্তর্গত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। এসময় মস্কো এই অঞ্চলের একটি অংশ দখল করে নিতে পারলে, ভবিষ্যতে আলোচনায় রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
কৌশল পরিবর্তন
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ভিক্টর ত্রেহুবভ বলেছেন, 'রাশিয়ানরা পশ্চিম দিক থেকে এসে পোকরোভস্কের চারপাশে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।'
তিনি বলেন, বড় শহরগুলো দখলে আগে রুশ সেনাদের অনুসরণ করা পদ্ধতি থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেসময় তারা সম্মুখ আক্রমণ এবং স্থল হামলার পথ বেছে নিতো।
তিনি আরও বলেন, 'মনে হচ্ছে প্রথমবারের মতো তারা তাদের মানবসম্পদ বাঁচানোর চেষ্টা করছে।'
এদিকে, গত রোববার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দেশটির অন্যতম শীর্ষ জেনারেল ল্যান্ড ফোর্সের প্রধান মিখাইলো দ্রাপাতিকে পোকরোভস্কসহ ফ্রন্টলাইনের বিশাল অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌশলগত কমান্ডে নিয়োগ দেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রব লি বলেন, 'তিনি একজন সম্মানিত কমান্ডার। তার নিয়োগ ফ্রন্টলাইনে ইউনিটগুলো মধ্যে নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে; যা গত এক বছরে ইউক্রেনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
