ইসরায়েলকে স্থল আক্রমণের আগে কেন ভাবতে হচ্ছে
শনিবার সকালে গত কয়েক বছরের মধ্যে ইসরায়েলে সবচেয়ে বড় আক্রমণ চালায় হামাস। এ আক্রমণে মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থান ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৫ হাজার রকেট ছোড়ে বলে জানিয়েছে তারা। এরপর পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরায়েলও। এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত গাজায় এ পর্যন্ত ৭০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে; অন্যদিকে ইসরায়েলে মারা গেছেন প্রায় ৯০০ জন। ইসরায়েল যদি গাজায় সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে স্থল আক্রমণ শুরু করে, তাহলে কেমন হতে পারে তার ফলাফল?
গাজায় পূর্ববর্তী সংঘাত থেকে আমরা যা জানি
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং হামাসের মধ্যে ঘটা সংঘাতগুলোতে একই ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে ভারী ব্যারেজ দিয়ে শুরু হয় ইসরায়েলিদের স্থল অনুপ্রবেশ।
এরপর শুরু হয় হামাসের সামরিক অবকাঠামো, সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন, উপকূলীয় স্থাপনা, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আবাসস্থলে স্থল-ভিত্তিক আর্টিলারি এবং নৌ গানবোট থেকে বিপুল পরিমাণে গোলাবর্ষণ।
ভৌগলিক অবস্থান যুদ্ধকে কিভাবে প্রভাবিত করবে?
গাজার ভৌগলিক অবস্থানের কারণে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী আক্রমণের জন্য একই রুট ব্যবহার করে।
ইসরায়েলের আক্রমণ রুটগুলো হলো- গাজার উত্তরে ইরেজ ক্রসিংয়ের পাশে গ্রামাঞ্চল; গাজার দক্ষিণে অবস্থিত বুরেজ থেকে গাজার কেন্দ্র পর্যন্ত থাকা রিজ লাইন। আবার দক্ষিণে খান ইউনিসের পূর্বে সহজেই ভারী ট্যাংক ও বর্ম বসিয়ে ফায়ারিং পজিশনে যেতে পারে ইসরায়েল। আরেকটি পথ হলো, সুদূর দক্ষিণে রাফাহ এর কাছে ফিলাডেলফি রুট।
ইসরায়েল অতীতে গাজা শহর এবং দক্ষিণের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য কেন্দ্রীয় গাজার দিকে যাওয়া পথগুলো ব্যবহার করেছে।
হামাসও এ বিষয়ে সচেতন যে ইসরায়েলি বাহিনী এসব রুট ব্যবহার করতে পারে; তাই এই অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও থাকে জোরদার।
বালুকাময় গ্রামাঞ্চল শহরাঞ্চলে পরিণত হওয়ায়, গাজার দিকে অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। জাবালিয়া এবং বেইত লাহিয়ার মতো জায়গায় সুউচ্চ আবাসিক ভবন থাকায় উত্তর দিক থেকে অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার উত্তর-দক্ষিণের রাস্তাটি শিল্প এলাকা দিয়ে পরিবেষ্টিত; এই রুট হামাস আগে প্রতিরক্ষা হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ইসরায়েলিরা কি প্রধান শহরগুলোতে প্রবেশ করবে?
ইসরায়েলি বাহিনী এর আগে ফিলিস্তিনের প্রধান শহুরে কেন্দ্রগুলোতে অগ্রসর হওয়ার সময় ভারী আক্রমণের শিকার হয়েছে। হামাস এবং ফিলিস্তিনের অন্যান্য বাহিনীর কাছে অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন এবং অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল রয়েছে যা তারা মর্টার ফায়ারের সাথে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে।
২০১৪ সালের যুদ্ধের সময় শুজিয়ায় এক রাতে একটি অ্যান্টি-ট্যাংক মাইনের আক্রমণে ১৩ জন সৈন্য হারায় ইসরায়েল।
তবে, ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে বর্ম নিয়ে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর থাকলেও, হামাসের কাছে এখন কর্নেট অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইলের একটি বড় মজুদ রয়েছে বলে মনে করা হয়; যেগুলো লেবাননে ইসরায়েলি যুদ্ধ ট্যাংকের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ ব্যবহার করেছিল।
এছাড়া, ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত অস্ত্র-সজ্জিত ড্রোনও তৈরি করেছে হামাস; যা সরাসরি যানবাহন এবং সেনাদের উপর বোমা ফেলতে পারে। এটিও ইসরায়েলের জন্য একটি নতুন বাধা।
হামাসের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
হামাসের ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াই করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। হামাসে এমন কিছু নেতা রয়েছেন যারা ইসরায়েলি যুদ্ধ পন্থার সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে হিব্রু ভাষাভাষী; যারা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছে।
স্থল আক্রমণের যেকোনো প্রচেষ্টায় ইসরায়েলের জন্য একটি বড় সমস্যা হলো, তাদেরকে হামাসের প্রস্তুতকৃত প্রতিরোধ ব্যবস্থার মোকাবিলা করতে হবে। এসব প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে কয়েক বছর ধরে ব্যাপকভাবে উন্নত যুদ্ধ টানেল।
হামাসের টানেল নেটওয়ার্ক একসময় উন্নত ছিল না। কিন্তু এখন যোদ্ধা মোতায়েনের জন্য ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার নির্মাণে তাদের প্রকৌশলীদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তাছাড়া, ইসরায়েল যেমন গাজার উপর নজরদারি করেছিল; তেমনি সস্তা ও সহজলভ্য বেসামরিক ড্রোন দিয়ে হামাসও ইসরায়েলিদের অগ্রসর হওয়ার পথ পর্যবেক্ষণ করেছে।
ইসরায়েল কি গাজা পুনরুদ্ধার করতে পারবে?
যদিও শনিবারের হামলার পর গাজায় তাণ্ডব চালানোর সামরিক ক্ষমতা ও ইচ্ছা ইসরায়েলের রয়েছে; তবে এতে ইসরায়েলি সামরিক এবং ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের এবং ফিলিস্তিনে আটক ইসরায়েলি জিম্মিদের চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।
সম্পূর্ণভাবে গাজার দখল নেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে তাদেরকে চালানোও হয়তো ইসরায়েলের পরিচালন ক্ষমতার বাইরে। এর অর্থ হচ্ছে, ইসরায়েল যদি পূর্ণ আগ্রাসন চালায়, তাহলে তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকবে হামাসের পরাজয় নিশ্চিত করা।
