ইউক্রেনে বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রায় শূন্য ইউরোপের অস্ত্রাগারগুলো
শব্দচয়ন খুব মেপে মেপেই করেন ন্যাটোর নরওয়েজিয়ান মহাসচিব জেন্স স্টোলটেনবার্গ, সরাসরি কাজের আলাপে চলে আসার খ্যাতি আছে তার। চলতি সপ্তাহে তিনি বলেছেন, 'প্রচণ্ড চাপের' মধ্যে থাকা পশ্চিমাদের প্রতিরক্ষা খাতের 'একটি সমস্যা' রয়েছে। তার এই সতর্কবাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
এক বছর হতে চলল ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ (২৪ ফেব্রুয়ারি বর্ষপূর্তি হবে যুদ্ধের); ইতোমধ্যে ঝরে গেছে লাখো প্রাণ। এপর্যন্ত পশ্চিমা সরকারগুলো ইউক্রেনকে ১১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সহায়তা দিয়েছে। এরমধ্যে অস্ত্র সহায়তা ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ছিল বলে জানিয়েছে কিল ইনস্টিটিউট।
যুদ্ধের রসদ জোগাতে গিয়ে ন্যাটোর নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডারই তথৈবচ। ইউরোপের অনেক দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের এমন উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন তাদের জেনারেলরা। তারা বলছেন, অবস্থা যে তলানিতে তাতে দান করার মতো বিশেষ কিছু নেই। গুদাম ও অস্ত্রাগারগুলো প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছে। যেমন ডেনমার্ক তাদের সবগুলো সিজার হাউইটজার দিয়েছে ইউক্রেনকে। এস্তোনিয়া এতগুলো ১৫৫ মিলিমিটার কামান দিয়েছে যে তাদের কাছেই আর একটিও অবশিষ্ট নেই।
চলতি সপ্তাহে ন্যাটো সদর দপ্তরে বৈঠক করেছেন পশ্চিমা প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা। বৈঠকে তাদের কুঞ্চিত ভ্রু ও শঙ্কিত চেহারা দেখা যায়। কথাবার্তায় ছিল উদ্বেগ আর সতর্কতার আভাস। সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠেয় মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনেও যোগ দেবেন তারা। এখন তাদের মূল আলোচনার বিষয়: বর্তমান দশায় কীভাবে এ পরিমাণ সমর্থন অব্যাহত রাখা যাবে, আর কী দিয়ে তা দেওয়া হবে?
অথচ তাদের সামনে খড়গের মতো ঝুলছে রাশিয়ার আসন্ন বসন্তকালীন আক্রমণ অভিযান। স্টোলটেনবার্গ যদিও বলেছেন, ইতোমধ্যেই অভিযানটি (সীমিত পরিসরে হলেও) শুরু হয়েছে। এবারের অভিযানে নতুন ভর্তি হওয়া বিপুল সংখ্যক সেনার অংশগ্রহণ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযান শুরু হলে দৈনিক যে পরিমাণ কামানের গোলা রুশ বাহিনী ছুঁড়বে, তা ইউরোপ এক মাস ধরে উৎপাদন করে।
নেদারল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাইসা ওলোনগ্রেন স্বীকার করেন, 'সামনে আশঙ্কাজনক কিছু একটা আসছে'।
চলতি সপ্তাহের বৈঠকে তার সমকক্ষ ন্যাটো জোটের অন্যান্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে 'দ্রুত একটা কিছু করার তাগিদ' বা তটস্থ ভাব ছিল বলে জানান তিনি। 'এটা খুবই সংকটময় মুহূর্ত; কারণ (যুদ্ধে) মাঠপর্যায়ে যা হচ্ছে তা আমরা জানি, আবার সামনের মাসগুলোয় কী হবে সে সম্পর্কেও আমাদের একটা আশঙ্কা রয়েছে'।
ওলোনগ্রেন আরো বলেন, 'আমরা কিছুটা আগাম ভাবছি। সেখানে যুদ্ধ দীর্ঘকাল ধরে চলার মতো গুরুতর পরিস্থিতির শঙ্কা রয়েছে'।
ইউক্রেনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সমর্থন দিতে পারবে না ইউরোপের দেশগুলি। সেই সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের। উন্নত মানের সমরাস্ত্র তৈরি করলেও, দীর্ঘযুদ্ধের জন্য বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম উৎপাদনের ঘাটতি তাদের তৈরি হয় স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর থেকেই। পুতিন ইউক্রেনে আগ্রাসন চালালে ইউরোপের সরকারগুলো হতচকিত হয়ে যায়, এটা তারা প্রত্যাশা করেনি। এরপর তারা অনুমান করেছিল, দিনকয়েকের মধ্যেই পতন হবে কিয়েভের।
তবে অচিরেই এই হতোদ্যম ভাব কাটিয়ে উঠে ঐক্যবদ্ধ হয় তারা। একযোগে ইউক্রেনকে অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দিতে থাকে। তাদের এমন ঐক্য অতীতে দেখা যায়নি। যদিও এর একটা সমস্যাও ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর অবহেলিত হয়েছে ইউরোপের সামরিক বাহিনীগুলো। তাদের সরকারি অর্থায়ন অনেকটাই কমে। এতে প্রতিরক্ষা খাতে দ্রুত গতিতে অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পায়। তারপরও ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর সামরিক বাহিনীগুলো নিজ নিজ দেশের সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউক্রেনের সহায়তায় এগিয়ে আসে। মজুত থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদের চালান পাঠাতে থাকে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব রণ-উপকরণের স্রোত বইতে থাকে পোল্যান্ড হয়ে ইউক্রেনে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে তা ইউরোপের সরকারগুলো বিশ্বাস করেনি। অথচ গত ১২ মাসে পুতিনের সেনাবাহিনী ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক- সব ধরনের অবকাঠামোকে নিশানায় পরিণত করে। এই অবস্থায়, কিয়েভকে ব্যাপক সহায়তা দিতে গিয়ে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়েছে ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাত।
ইউক্রেনের এক সপ্তাহের চাহিদা পূরণের মতো গোলা প্রস্তুতে হিমশিম দশা ইউরোপের কারখানাগুলোর। কিছু কিছু গোলা সরবরাহ করতে বেশ দেরিও হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরু দিকে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী সোভিয়েত আমলের অস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। পূর্ব ইউরোপের কাছে এ ধরনের যত সরঞ্জাম মজুত ছিল তা এখন ফুরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশে তৈরি নতুন ধরনের অস্ত্র যেমন সাঁজোয়া যান ও ট্যাঙ্ক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক মাতামাতি চললেও, কার্যত দেখা যাচ্ছে এগুলো পাঠাতে বেশ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগবে। কারণ সেনাবাহিনী উপলদ্ধি করছে এসব সরঞ্জামের অনেক সংস্কার করে তারপর ইউক্রেনকে দিতে হবে।
চিন্তক সংস্থা কার্নেগি ইউরোপের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো জুডি ডেম্পসি বলেন, 'ইউক্রেনীয়দের জন্য সবকিছু ঠিকঠাক এগোচ্ছে না। তারা সবকিছুর ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। পাল্টা লড়াই চালিয়ে যেতে তাদের যে সহায়তা দরকার, তারা সেটা পাচ্ছে না'।
তার মতে, 'ইউরোপীয়রা পুরোদমে ইউক্রেনের সাথে আছে। কিন্তু, তা যথেষ্ট নয়। ইউক্রেনকে তাদের দেওয়া রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে কারো সন্দেহ নেই, তবে প্রতিশ্রুতি মাফিক যথেষ্ট পরিমাণ (অস্ত্র, অর্থ) সরবরাহের সক্ষমতা এবং তা দ্রুততর সময়ে পাঠানোর দিকটিই প্রশ্নবিদ্ধ'।
এই সমস্যার সমাধান হতে পারে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হলে। এর মাধ্যমে, ইউরোপের সরকারগুলো ইউক্রেনে যুদ্ধ শেষ হলেও বিপুল সমরাস্ত্র ক্রয় করবে। ফলে উদ্যোক্তারা তাদের কারখানা সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ করবে এবং তাতে প্রাণ ফিরে পাবে সমরাস্ত্র শিল্পোৎপাদন। বর্ধিত সক্ষমতা দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে ইউক্রেনের জন্য। ধারণা করা হচ্ছে, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে এবিষয়ের আলোচনা প্রাধান্য পাবে।
চলতি সপ্তাহে এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী তার ন্যাটো সহকর্মীদের ৪০০ কোটি ইউরো মূল্যের এক ক্রয় প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইউক্রেনকে দাতা দেশগুলো ১০ লাখ রাউন্ড কামানের গোলা কিনবে। এ ধরনের যৌথ ক্রয় প্রচেষ্টা প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।
বুধবার যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও ডেনমার্কসহ সাত ইউরোপোয় দেশ ২০ কোটি পাউন্ডের একটি ক্রয় চুক্তিতে যৌথভাবে অর্থায়নের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদকদের থেকে যুদ্ধ সরঞ্জাম কিনবে তারা। কামানের গোলা থেকে শুরু করে ট্যাংকের যন্ত্রাংশ– বিবিধ পণ্য থাকবে এর আওতায়।
গত বছরের শেষদিকেই সদস্য দেশগুলোকে নিজ নিজ অস্ত্রভাণ্ডারের অবস্থা যাচাই করতে বলেছিল ন্যাটো। সেই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে যেসব দেশে সমরাস্ত্র মজুতের দশা বেশি নাজুক – সেসব দেশের সরকারকে নতুন ক্রয় চুক্তি সই করতে তাগাদা দেবে।
স্টোলটেনবার্গ চলতি সপ্তাহে বলেছেন, 'আমরা অলস বসে শুধু দেখে যাব না'। প্রয়োজনে সমরাস্ত্র কারখানাগুলোয় বাড়তি শিফট যোগ করে 'ছুটির দিনেও সচল রাখতে হবে' বলেন তিনি।
তবে সমস্যা হলো, রাশিয়া এক বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধকালীন অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আর ইউরোপ কেবল সেই প্রস্তুতি শুরু করছে।
- সূত্র: ফিন্যানসিয়াল টাইমস
