মুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই কেন ওটিটি থেকে উধাও দিলজিৎ দোসাঞ্জের এই সিনেমা?
জনপ্রিয় ভারতীয় গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত একটি সিনেমা ওটিটি (স্ট্রিমিং) প্ল্যাটফর্ম থেকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার পর ভারতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। 'সাতলুজ' নামের এই সিনেমাটি মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরার জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। খালরা পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেও নিখোঁজ হন।
পরে জানা যায় যে জসবন্ত সিং খালরাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে পরবর্তীতে পাঞ্জাব পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাজা দেওয়া হয়।
গত শুক্রবার 'জি ফাইভ' ওটিটি প্ল্যাটফর্মে 'সাতলুজ' সিনেমাটি মুক্তি পায়। কিন্তু মাত্র দুই দিন পর রবিবারই সেটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এক বিবৃতিতে জি ফাইভ জানিয়েছে, 'চলতি পরিস্থিতির' কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতে সিনেমাটি দেখা যাবে না। তবে এই 'পরিস্থিতি' আসলে কী, সে বিষয়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। জি ফাইভ সরিয়ে নেওয়ার পর এখন অফিশিয়ালি ভারতে সিনেমাটি দেখার আর কোনো সুযোগ নেই।
২০২২ সালে সিনেমাটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও ভারতের ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ডের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের কারণে এটি কখনোই সিনেমা হলে মুক্তি পায়নি। তবে ওটিটি-তে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মুক্তি পেলেও 'সাতলুজ' সমালোচকদের কাছ থেকে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যম 'দ্য হলিউড রিপোর্টার' সিনেমাটিকে 'চলতি বছরের অন্যতম সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্র' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর এক প্রতিবেদনে সিনেমাটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান 'আরএসভিপি মুভিজ'-এর এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর ওটিটি থেকে সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ভারত সরকার এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে জনসমক্ষে কোনো মন্তব্য করেনি। এ বিষয়ে জবাব চেয়ে বিবিসি ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
সিনেমাটি ওটিটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ এসে অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ বলেন, তিনি জানতেন যে সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়া হতে পারে, তবে এত দ্রুত নেওয়া হবে তা ভাবেননি।
দিলজিৎ বলেন, 'আপনাদের সবার প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমি যা আগে থেকেই আশঙ্কা করেছিলাম, ঠিক সেটাই ঘটেছে। আমি ভেবেছিলাম সোমবার যখন সরকারি অফিসগুলো খুলবে, তখন হয়তো সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা হবে। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যার মধ্যেই যে এটি ঘটে যাবে, তা আমার জানা ছিল না।'
দিলজিৎ আরও জানান, এই সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে সব সময়ই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। আর এই কারণেই ছবির নির্মাতারা প্রচার-প্রচারণা একদম ন্যূনতম রেখেছিলেন। তিনি বলেন, 'আমরা যদি এর প্রচারণা করতাম, তবে সিনেমাটি কখনোই মুক্তি পেত না।' তবে দেরিতে হলেও দর্শকেরা যে এটি দেখতে পেরেছেন, তাতেই তিনি আনন্দিত।
কী নিয়ে এই সিনেমার গল্প?
মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এই সিনেমাটিতে একজন অধিকার কর্মীকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে দেখা যায়। এটি আধুনিক ভারতের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।
১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত স্বাধীন 'খালিস্থান' রাষ্ট্রের দাবিতে শিখ বিদ্রোহীরা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল, যাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন।
সরকার যখন এই বিদ্রোহ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তখন মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তোলে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছিল যে বিদ্রোহ দমনের জন্য কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল এবং ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরা অভিযোগ করেছিলেন যে, অনেক ভুক্তভোগীকে পরিবারের অজ্ঞাতে বা সঠিক নথিপত্র ছাড়াই গোপনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। তিনি নিজেই এই অভিযোগগুলোর তদন্ত করছিলেন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি নিখোঁজ হন এবং পরে জানা যায় তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে।
কেন বারবার বাধার মুখে পড়েছে সিনেমাটি?
মুক্তির আলো দেখার আগে থেকেই সিনেমাটিকে এক অস্বাভাবিক এবং কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
সিনেমাটির মূল নাম ছিল 'ঘাল্লুঘারা'। এটি শিখ ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত একটি পাঞ্জাবি শব্দ। মূলত ১৭৪৬ সালে মোঘল বাহিনী এবং ১৭৬২ সালে আফগান শাসক আহমদ শাহ দুররানির বাহিনীর হাতে শিখদের ব্যাপক গণহত্যার ঘটনাকে এই নামে অভিহিত করা হয়।
ছবির পরিচালক হানি ত্রেহান জানিয়েছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড (সিবিএফসি) সিনেমাটির নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল, তবে তারা এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। পরে ছবিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'পাঞ্জাব ৯৫'—যা মূলত জসবন্ত সিং খালরার নিখোঁজ হওয়ার বছরকে নির্দেশ করে।
২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রিমিয়ার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে সার্টিফিকেশন জট কেটে না ওঠায় প্রযোজকেরা শেষ মুহূর্তে উৎসব থেকে সিনেমাটি প্রত্যাহার করে নেন।
ছবির পরিচালক হানি ত্রেহান ২০২৫ সালে সংবাদ ওয়েবসাইট 'স্ক্রল'-কে জানিয়েছিলেন, ছবির দৃশ্য কাটার জন্য সেন্সর বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রথমে ২১টি আপত্তি জানানো হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বেড়ে ১২৭টি কাটের (দৃশ্য বাদ দেওয়া) প্রস্তাবে দাঁড়ায়।
হানি ত্রেহান বলেন, 'বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো তথ্যই সিনেমা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।' তিনি যুক্তি দেন যে এই পরিবর্তনগুলো করলে সিনেমার মূল বার্তা ও কাঠামোই বদলে যেত।
তিনি গত বছর 'নিউ লাইনস ম্যাগাজিন'-কে বলেছিলেন, সিবিএফসি সিনেমাটির নাম পরিবর্তন, খালরার সমস্ত উল্লেখ বাদ দেওয়া এবং পুলিশের সহিংসতার দৃশ্যগুলো এডিট করার দাবি জানিয়েছিল। বোর্ড আরও দাবি করেছিল যে এই ছবি মুক্তি পেলে পাঞ্জাবের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
সেন্সর বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্মাতারা বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করলেও পরবর্তীতে তারা আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেন। ভারতীয় গণমাধ্যম 'দ্য হিন্দু'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত ছাড়পত্র পাওয়ার আশায় নির্মাতারা সেন্সর বোর্ডের শর্তগুলো মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে পরিচালক হানি ত্রেহান জানান, সমস্যা সমাধানের সব চেষ্টা সত্ত্বেও সেন্সর বোর্ডের আপত্তির তালিকা কেবল দীর্ঘই হচ্ছিল। এই অমীমাংসিত জটিলতার কারণে প্রকল্পটি প্রায় তিন বছর ধরে ঝুলে ছিল।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে গত সপ্তাহে নির্মাতারা ঘোষণা করেন যে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহের বদলে সরাসরি 'জি ফাইভ' ওটিটি প্ল্যাটফর্মে 'সাতলুজ' নামে মুক্তি পাবে।
জি ফাইভ-এ মুক্তির দিন পরিচালক হানি ত্রেহান বলেছিলেন, সিনেমাটি কোনো দৃশ্য বাদ বা আপস ছাড়াই নির্মাতাদের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যদিও তারা 'পাঞ্জাব ৯৫' নামটি ধরে রাখতে পারেননি।
ভারতে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা মুক্তির জন্য সিবিএফসি-র ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সরাসরি মুক্তির জন্য সেন্সর বোর্ডের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত 'তথ্য প্রযুক্তি নিয়মমালা ২০২১' দ্বারা পরিচালিত হয়, যেখানে ছবি সরিয়ে নেওয়ার সরকারি নির্দেশের বিরুদ্ধে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর আইনি কোনো সুরক্ষাকবচ নেই।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সিনেমাটি আকস্মিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার পর পরিচালক হানি ত্রেহান হতাশা প্রকাশ করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, 'আমি এখন একদম দিশেহারা। এই ঘটনার পর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব, তা আমি বুঝতে পারছি না।'
এদিকে জি ফাইভ জানিয়েছে, তারা সিনেমাটির নির্মাতা ও তাদের সৃজনশীল চিন্তাধারার পাশে রয়েছে এবং দ্রুতই তারা 'সাতলুজ' ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনার আশা করছে। তবে এর জন্য কোনো সময়সীমা নির্দিষ্ট করেনি তারা।
