যুক্তরাষ্ট্রে বাড়লেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অপ্রচলিত বাজারে কমেছে তৈরি পোশাক রপ্তানি
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিকে উত্তর আমেরিকার প্রধান পোশাক রপ্তানি বাজারগুলোতে উন্নতি হওয়ায় দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানির সামগ্রিক পতন কিছুটা কমেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে—বিশেষ করে জার্মানিতে এবং প্রধান অপ্রচলিত বাজারগুলোতে দুর্বলতা দেশের বাজার বহুমুখীকরণ প্রচেষ্টার ভঙ্গুরতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ সংকলিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম।
অর্থবছরের শেষ দিকে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী বাজারে প্রবৃদ্ধি হলেও, সামগ্রিক রপ্তানি কমে যাওয়ায় সেই ইতিবাচক চিত্র আড়াল হয়ে গেছে। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম পোশাক রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কানাডায় রপ্তানি ৩ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি ০ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বৃহত্তম আঞ্চলিক পোশাক রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম একক তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গন্তব্য জার্মানিতে রপ্তানি কমে যাওয়াই ওই অঞ্চলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি কমার অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এছাড়া ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও ডেনমার্কেও রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডে প্রবৃদ্ধি হলেও তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অর্থবছরের শেষ দিকে যে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, সেটিকে নতুন ক্রয়াদেশ ফিরে আসার লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'গত বছরের জুন মাসে ঈদের ছুটির কারণে কার্যদিবস উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। অথচ এ বছর কারখানাগুলো পুরো মাসজুড়েই উৎপাদন চালাতে পেরেছে। ফলে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার একটা অংশ কার্যদিবসের পার্থক্যের প্রতিফলন, নতুন ক্রয়াদেশে বড় ধরনের বৃদ্ধির কারণে নয়।'
তিনি বলেন, খাতটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ আসেনি এবং আগামী কয়েক মাসের পরিস্থিতিও দুর্বল থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে হাতেম বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় ক্রেতারা ধীরে ধীরে তাদের সোর্সিংয়ের একটি অংশ ভারতে সরিয়ে নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'শুধু জার্মানিই নয়, ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই রপ্তানি কমেছে। ক্রেতারা আগেভাগেই ভারতে তাদের সোর্সিং সক্ষমতা গড়ে তুলছেন। কারণ তাদের ধারণা, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ শুল্কের মুখে পড়তে পারে, অন্যদিকে ভারত অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা ভোগ করবে।'
হাতেম বলেন, এইচঅ্যান্ডএমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জানা গেছে, এ বছর বাংলাদেশে কোম্পানিটির ক্রয়াদেশ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম। তিনি বলেন, পোশাক খাতে বিনিয়োগে ভারতের নীতিগত সহায়তা, বাংলাদেশের রপ্তানি-সুবিধা হ্রাস এবং জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে প্রতিবেশী দেশটি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এদিকে, পশ্চিমা ক্রেতাদের ওপর নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এটি তৈরি পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক পতনের চেয়েও বেশি।
অপ্রচলিত বাজারগুলোতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। বোনা পোশাক রপ্তানি ২৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাড়ায় চীনে মোট রপ্তানি ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৬৩ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে বাংলাদেশের বড় বিকল্প বাজারগুলোতে রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য এই প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ছিল না। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বাংলাদেশের বৃহত্তম অপ্রচলিত পোশাক রপ্তানি বাজার ভারতেও রপ্তানি ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ৫৭০ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল বোনা পোশাক রপ্তানি ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশ কমে যাওয়া। রাশিয়ায় রপ্তানি ২৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে ২২৮ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোতেও রপ্তানি কমেছে।
অর্থবছরে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির মধ্যে অপ্রচলিত বাজারের অংশ ছিল ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা বাজারগুলোর ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভরতা মোটামুটি আগের মতোই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এর আগে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছিলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে অপ্রচলিত বাজারগুলোর গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তবে সীমিত রপ্তানি ঋণ-সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন রপ্তানিকারকেরা।
তিনি জানিয়েছিলেন, উদীয়মান বাজারগুলোতে রপ্তানি সম্প্রসারণে রপ্তানিকারকদের সহায়তা করতে আরও শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি, উন্নত বাজার-সুবিধা এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে মন্দাভাব এবং ভারত, রাশিয়াসহ অন্যান্য অপ্রচলিত গন্তব্যে রপ্তানি কমে যাওয়া বাংলাদেশের বাজার বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টায় টেকসই গতি না থাকার বিষয়টিই স্পষ্ট করে তুলেছে।
