বিদ্যুৎ খাতের ঋণ পরিশোধে সরকারের ঋণের দায় কমছে ১৫,১০৮ কোটি টাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন আর্থিক ও অআর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সরকারের দেওয়া গ্যারান্টি বা জামিনের দায় এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৫ হাজার ১০৮ কোটি টাকা কমতে যাচ্ছে। মূলত বিদ্যুৎ খাতের বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের ফলেই সরকারের এই দায় কমছে।
অর্থ বিভাগের বাজেট নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সরকারের দেওয়া গ্যারান্টির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৮২ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬ সালের ৩০ জুন নাগাদ তা কমে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা, কোম্পানি বা যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান যখন দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়, তখন ঋণদাতারা সাধারণত সরকারি গ্যারান্টি চেয়ে থাকে। সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তার অংশ হিসেবে এসব ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি দেওয়া হয়। কোনো কারণে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে, সেই দায় সরকারের ওপর বর্তায়। এ কারণে এই ঋণগুলোকে সরকারের সম্ভাব্য বা আপৎকালীন দায় (কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটি) হিসেবে গণ্য করা হয়, যা সরকারের ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় ঋণ পরিশোধ
অর্থ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মোট ১৮ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট (রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র)। প্রকল্পটি ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের ১৭ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে এই প্রকল্পের বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭,১১৫ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের জুন নাগাদ মাত্র ১৩৭ কোটি টাকায় নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পটি ২০১৭ সালে ঋণটি নিয়েছিল।
এছাড়া, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি দুটি ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের এইচএসবিসি কর্পোরেট ট্রাস্টি কোম্পানি থেকে নেওয়া ৫০২ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে নেওয়া ২৪৪ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের ৩১০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প ৪০০ কোটি টাকা এবং ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্রকল্প ২৫২ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে।
বিবিয়ানা ৩৩৫ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির আওতাধীন বেশ কয়েকটি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানিও তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছে।
তবে এই সময়ে কিছু নতুন ঋণও নেওয়া হয়েছে। খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট ডুয়েল-ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাংক অব চায়না থেকে প্রায় ২,০০৫ কোটি টাকা নতুন ঋণ নিয়েছে। রুরাল পাওয়ার কোম্পানি তাদের ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালী প্রকল্পের জন্য যথাক্রমে ৮৫ কোটি ও ১৮০ কোটি টাকা এবং সৈয়দপুর ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৭০ কোটি টাকা নতুন ঋণ নিয়েছে।
বিমান, জ্বালানি ও টেলিকমে দায় হ্রাস
একই সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিপরীতে সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ১,৪৮৮ কোটি টাকা কমেছে। জ্বালানি খাতে এই ধরনের ঋণ কমেছে ৯০৮ কোটি টাকা এবং টেলিকম খাতে কমেছে ২০৬ কোটি টাকা।
খাদ্য, কৃষি ও আর্থিক খাতে দায় বৃদ্ধি
কিছু খাতে ঋণের বিপরীতে সরকারি গ্যারান্টির পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ২,৮০০ কোটি টাকা বেড়ে ৩,৯৬১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নিয়েছে।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ঋণ ২০০ কোটি টাকা বেড়ে ২৮৫ কোটি টাকা হয়েছে। কর্মসংস্থান ব্যাংকের গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ১৮০ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,২৮২ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সার আমদানির ঋণে। এক বছরে এই ঋণ ৪,০০০ কোটি টাকা বেড়ে ২১,৮৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
২০২৫ সালে সংস্থাটি ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ১,৩২৪ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। এছাড়া সোনালী ও জনতা ব্যাংক থেকেও তাদের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
এদিকে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ ২৫০ কোটি টাকা বেড়ে ১,০০০ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা বেড়ে ২,০১২ কোটি টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট মোকাবেলা এবং উচ্চ সুদের পুরোনো ঋণ পরিশোধের জন্য ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) সরকারের গ্যারান্টির বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩,০০০ কোটি টাকার নতুন ঋণ সুবিধা পেয়েছে।
গ্যারান্টির ওপর ফি আরোপের উদ্যোগ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সহজেই সরকারি গ্যারান্টি পাওয়ার সুযোগ থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক শৃঙ্খলার দুর্বলতা, অদক্ষ বিনিয়োগ ও ঋণের অপব্যবহারের ঘটনা ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার এখন গ্যারান্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে ফি আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এজন্য 'রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি/কাউন্টার গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৪' সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায়, নতুন কোনো ঋণে সরকারি গ্যারান্টি দেওয়ার বিপরীতে মোট ঋণের ওপর এককালীন ০.২৫ শতাংশ ফি চার্জ করা হবে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা অনেক বৃদ্ধি পাবে।
