অ্যালেন গিন্সবার্গ || সাহিত্যকে আমরা ছিনিয়ে এনে রাস্তায় স্থাপন করেছি
[মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ। তিনি জন্মেছেন নিউজার্সিতে ১৯২৬-এর ৩ জুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর 'বিট আন্দোলন' নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রথাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। মার্কিন সরকারের সাম্রাজ্যবাদ নীতির তীব্র সমালোচক ছিলেন। মানবিক একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন। হাউল তার বিখ্যাত কবিতা, যা তাকে বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতা এসে বাঙালি শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখেছেন। সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড নামে তার বিখ্যাত কবিতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আখ্যান করে রচিত। এই পৃথিবীর অন্যতম মানবিক নাগরিক অ্যালেন গিন্সবার্গ মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৭-এর ৫ এপ্রিল।]
নাসির আলী মামুন: পৃথিবীর কোন দেশের কোন শহরটি আপনার প্রিয়?
অ্যালেন গিন্সবার্গ: এখন থেকে ৫০ বছর আগে কেউ আমাকে এই প্রশ্নটি করলে আমি বলতাম নিউইয়র্ক। এখনো একই শহর, যেখানে সবকিছু মুক্ত করা যায়। তার আগে নিউজার্সির প্যাটারসন, যেখানে আমার শৈশব কেটেছে। পরে একঘেয়েমি লেগেছে প্যাটারসন, আমার স্কুল। আমার বড় ভাই ইউজিন, মা নাওমি ও বাবা লুই গিন্সবার্গ সবাই ছোট শহরে থাকতে পছন্দ করতেন।
মামুন: আপনার জন্ম হয়েছিল অন্য শহরে।
গিন্সবার্গ: তখন আমার মা অসুস্থ ছিলেন। ১৯২৬ সালের ৩ জুন জন্ম হলো আমার নিউইয়র্কের বেথ ইসরায়েল হাসপাতালে। আমার দাদার বাবা আভড়ুম গিন্সবার্গের নামে আমার নাম রাখা হয়েছিল। আমার জন্মের সময় বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। আর বামঘেঁষা মা নাওমি ছিলেন গৃহিণী।
মামুন: আপনার পূর্বপুরুষেরা রাশিয়ার বাসিন্দা?
গিন্সবার্গ: আমাকে কথা বলতে শেষ করতে না দিয়ে তুমি প্রশ্ন করছ!
মামুন: আপনার প্রিয় শহর…
গিন্সবার্গ: যখন আমি সানফ্রান্সিসকোতে ছিলাম, সেটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শহর। আর যখন মরক্কোর ট্যানজিয়ায়, তখনকার জন্য সেটা প্রিয়। মানুষের সব প্রিয় বিষয় বদলে যায় এক সময় থেকে আরেক সময়ে। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘকাল আটকে থাকা বা তার জন্য অবসেশন তৈরি করা আমার ধাতে নেই। কিছুদিন পর পর আমি নতুন কিছু তৈরি করতে বা ভাবতে অথবা নতুন জায়গায় বসবাস করতে পছন্দ করি। আমি একজন অতৃপ্ত মানুষ। আমাকে কোনো কিছুর প্রতি দীর্ঘদিন বিশ্বাসে রাখা যাবে না। আমি প্রশ্ন করবই। নতুন ইমেজ আমি ভাবতে শিখেছি বন্ধুবান্ধবের জীবন থেকে। তুমি যে উত্তরটা আশা করছ—এই মুহূর্তে প্রিয় শহর নিউইয়র্ক—এখানে পৃথিবী থাকে।
মামুন: আপনার বন্ধুরা সবাই ছিলেন অস্থির।
গিন্সবার্গ: সে কারণে তারা নতুন সাহিত্য-ভাষার জন্ম দিতে পেরেছে। আমেরিকার কলোনিয়াল লিটারেচার দেখো, আর আমাদের ঠিক পূর্বের সাহিত্য দেখো। ব্যবধান আছে—ভাষার নয়, বিষয়েরও। আমেরিকার গত শতাব্দীর সাহিত্য স্থবির, দু-চারটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছাড়া অনেক বিমূর্ত।
মামুন: ওয়াল্ট হুইটম্যান বলতেন, সাহিত্য সাধারণ মানুষদের জন্য। বিটরা কী বলেন?
গিন্সবার্গ: এই স্লোগান থেকে আমরা আলাদা হতে পারিনি। সাধারণ থেকে বা সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে সাহিত্যকে বিচ্ছিন্ন করা আমাদের সংকল্প নয়। আবহমানকাল থেকে সাহিত্যরসিকদের বা পাঠকদের ঠকানো হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, সাহিত্য সবার জন্য নয়। কথাটা আসলে বলা হয়েছে এভাবে—সাহিত্য শিক্ষিত শ্রেণির! এটার কোনো সঠিক সংজ্ঞা আছে কি! যারা অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানে, তাদের জন্য কেউ কি কলম ধরবেন না! আমরা বিটরা বলেছি, এটা হতে দেব না।
রাজদরবার থেকে সাহিত্যকে আমরা ছিনিয়ে এনে রাস্তায় স্থাপন করেছি—পানির কলের মতো। আমরা বলছি এসো ভাই-বোনেরা, যে যার প্রয়োজনমতো নিয়ে যাও। বিশ্বব্যাংকের মতো আমরা তোমাদের ধোঁকা দেব না। এটা ঋণ নয়। আর পূর্বসূরিদের সাহিত্য-বাণিজ্যকে আমরা ভেঙে দিয়েছি। আমরা এখনো বলছি, সাহিত্যের উৎপত্তি হবে জেলখানা থেকে, মদ ও নেশার আসর থেকে। ভাষা নির্মাণ হবে বেশ্যাপাড়া থেকে আর আর আর... ফুটপাত থেকে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসবে সব পাঠক। রাজা-রানির প্যালেস থেকে জনগণ-ফুঁসলানো বাক্য আর নয়। তাদের যুদ্ধ আমরা ঠেকাবই।
মামুন: কত দিন ঠেকাবেন?
গিন্সবার্গ: হয়তো এভাবেই... সারা জীবন জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে শেষ হয়ে যাব। তবু নীরব থাকতে চাই না। আমরা প্রতি মুহূর্তে যন্ত্রণাকে আলিঙ্গন করেছি।
মামুন: প্রায় ৫০ বছর ধরে আপনারা যুদ্ধবিরোধী ভূমিকা রাখলেন। আপনাদের জীবতকালে যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বাধাইছে।
গিন্সবার্গ: আমাদের বিট মুভমেন্ট এবং বিট জেনারেশন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পর আমরা বলেছি যুদ্ধ চাই না—তখন কোরিয়া-ভিয়েতনাম ছিল না। এ রকম একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এবং যুদ্ধে ভয়ংকরভাবে ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার পর নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠতে থাকে, তারা অসুস্থ এবং উন্মাদ হয়ে যায়। এর শত শত কারণ থাকতে পারে। তবে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণটা যুদ্ধপরবর্তী মেধাবী প্রজন্মকে ধ্বংস করে। দুটি মহাযুদ্ধে আমরা দেখেছি কীভাবে হত্যা করা হয় তরুণ মেধাগুলোকে। আমরা তো দাবার ঘুঁটি নই। আমরা নড়েচড়ে বসতে পারি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ যখন শেষ দিকে, তখন আমার বয়স মাত্র ২২ বছর। যুদ্ধ চলাকালেই কলম্বিয়ায় এবং নিউইয়র্কের ডাউনটাউনে বন্ধুদের সঙ্গে বহু মতবিনিময় করি। তখনই আমাদের লক্ষ্য এক হয়ে যায়। এটা এমন নয় যে কাউকে জোর করে ধরে এনে বিট আন্দোলনে শামিল করা হয়েছে। আসলে সমমনা সবাই তখন ভাবছিল যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে, নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে হবে।
কোরিয়া বা ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যত না জড়িত ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজদের অহংকার। প্রথমে তারা ভেবেছিল ভিয়েতনামকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে সব মানুষকে হত্যা করে হলেও যুদ্ধটাতে জয়ী হবে। কিন্তু জয়ী হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, যুদ্ধটা আসলে ভিয়েতনামের সঙ্গে নয়, যুদ্ধ হয়েছিল চীন ও সোভিয়েত দুই পরাশক্তির সঙ্গে। বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল পেন্টাগনের। হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই এবং বেকারত্বের জন্য নৈরাজ্য বিরাজ করছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউস থেকে যে পরিকল্পনা হচ্ছিল, তাতে মনে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে ছাড়বে ভিয়েতনামে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং প্রতিক্রিয়া যতখানি ছিল, ম্যাক আর্থারের কোরিয়া অভিযানে ততখানি প্রতিক্রিয়া হয়নি। কারণ, ভিয়েতনাম যুদ্ধটা ছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রায় ২০ হাজার মার্কিন সৈন্য সেখানে নিহত হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন করেছি। তোমাকে মানতেই হবে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের চাপে। হোয়াইট হাউস বাধ্য হয়েছে সে দেশ থেকে সৈন্য সরিয়ে নিতে। এমনিতেই যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। বিটদের রক্তের কত মূল্য, তুমি জানো না। এখনো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা ঝুলছে। আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো চাকরি যথেষ্ট যোগ্যতা থাকলেও পাই না। দেয়া হয় না অনেক সামাজিক সম্মান আমাদের। আমরা নাকি দেশের তরুণ সমাজটাকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছি।
গালফ ওয়ার বা মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ ১৯৯৩ সালে, তা বাণিজ্যিক লড়াই। অর্থাৎ তেলের এবং অস্ত্র বিক্রির জন্য এই যুদ্ধ। ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও, যদিও আমি কোনো ধর্মে নেই, একবার ইসরায়েলে গিয়ে প্যালেস্টাইনের পক্ষে কথা বলাতে আমাকে হোটেল থেকে সোজা এয়ারপোর্টে পাঠিয়ে দেয় ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েল কেন অবস্থান করতে পারবে না? যুদ্ধটা হচ্ছে কেন? একজন আরেকজনের অস্তিত্বকে স্বীকার করছে না; বরং ধ্বংস করতে ইচ্ছুক। এ সবকিছু হচ্ছে পেন্টাগনের বদৌলতে।
মামুন: দোষটা বেশি কার, ইসরায়েল না প্যালেস্টাইনের?
গিন্সবার্গ: আমি যদি জাতিসংঘ হই, তাহলে বলতেই হবে ইসরায়েল কর্তৃপক্ষের গোঁয়ার্তুমি এবং তাদের মুরব্বির নির্দেশে তারা প্যালেস্টাইনিদের প্রতি যা করছে, তা অন্যায়। ইহুদিদের আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে, মুসলমানদের কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র থাকবে না? এটা অবাস্তব যে, কয়েক মাস পর পর শান্তিচুক্তি হচ্ছে এই দুই পক্ষের এবং ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি নেতাদের বৈঠক হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যস্থতায়, আবার তা ভেঙে যাচ্ছে ওয়াশিংটনের কৌশলী পরামর্শে।
মামুন: আপনি জাতিসংঘের কথা বললেন, এই বিশ্ব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়ে আপনি অনেকবার বিরূপ মন্তব্য করছেন!
গিন্সবার্গ: এটা একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। একটা ক্লাবের মতো বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা নেতারা এখানে আসেন, কথা বলেন, চা-কফি পান করেন, বাথরুমের কাজ সারেন, এই পর্যন্তই। জাতিসংঘ বিবৃতি ছাড়া এ পর্যন্ত কোনো সমস্যার সুরাহা করতে পেরেছে?
মামুন: যে বিশ্বযুদ্ধের আগে লিগ অব ন্যাশনস ছিল, পরে জাতিসংঘ হইছে। সামনে কি এই রকম বিশ্বশান্তি বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা কইরা আরেকটি নতুন প্রতিষ্ঠানের চিন্তা করা যায়?
গিন্সবার্গ: জাতিসংঘে প্রথম থেকেই বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। পাঁচটি যুদ্ধবাজ দেশ যেকোনো বিষয়ে ভেটো দিতে পারবে। অর্থাৎ অন্যদের তাদের কথামতো চলতে হবে। যারা যুদ্ধ বাধাতে চায়, তাদের হাতে জাতিসংঘ জিম্মি। আমেরিকার ভূখণ্ডে জাতিসংঘের সদর দপ্তর এটা স্বীকার করতে হলে করুণা করতে হয় বাদবাকি সব রাষ্ট্রকে।
মামুন: আপনি যা বলছেন, দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে কেউ নাই। তারা কীভাবে সবল রাষ্ট্র থেকে রক্ষা পাবে?
গিন্সবার্গ: তুমি আমাকে এমন প্রশ্ন করছ যে আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিশ্বব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ আমি নই। সব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।
মামুন: কিন্তু আপনি একজন কট্টর যুদ্ধবিরোধী।
গিন্সবার্গ: সে কারণে যুদ্ধ যাতে কেউ না করে তার দায়িত্ব আমাকে নিতে বলছ?
মামুন: না, না। আপনার মতামত।
গিন্সবার্গ: তুমি আমাকে এমন কিছু বলতে বলছ, যা মিথ্যা অথবা আমি বিশ্বাস করি না। আমি অতীতে যুদ্ধবিরোধী কী কী সংগঠিত করেছি, তুমি জানো না। না জানার কারণে তোমার এত প্রশ্ন, আমার সময় নষ্ট।
মামুন: নিউইয়র্কে আমরা অভিবাসীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকি। আপনি যখন প্রথম এই শহরে আসছিলেন তখন আর এখন...
গিন্সবার্গ: তখন আর এখন বদলেছে। মৃত্যু হয়নি নিউইয়র্কের। এখনো এটি এই গ্রহের প্রতিটি শহরের ওপর মাথা উঁচু করে চিৎকার করছে। ম্যানহাটন একটা আস্ত জাদুঘরের মতো। কী নেই এখানে! পৃথিবী এসে হাজির হয়েছে ১২ মাইল লম্বা এই সরু দ্বীপে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শহরগুলোর মতো এই শহর ঘুমিয়ে পড়ে না। ৩৬৫ দিন চালু আছে নিউইয়র্কের গতি। এখানে এলে মানুষ নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের লোক এখানে বসবাস করছে। আমি যখন প্রথম বসবাস করতে আসি, তখন কলাম্বিয়ার ছাত্র। শহরটা ছিল ছিমছাম। এখন মানুষে ভর্তি হয়ে গেছে শহরটা। ভালো লাগে, সব দেশের মানুষ দেখা যায়।
লোয়ার ইস্ট সাইডে ১৯৭৪ সালে সন্ধ্যায় আমি এক গ্যাংয়ের খপ্পরে পড়েছিলাম। ওরা আমার নগদ অর্থ এবং হাতঘড়িটা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে 'মাগিং' নামে একটি কবিতা লিখি সেই ঘটনা নিয়ে, যা নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়। যে এলাকায় আমি বসবাস করছি, এখানে আগে অবাধে ড্রাগ চলত। নেশায় অভ্যস্ত ছিল যুবকদের বিরাট অংশ। রাস্তায় উন্মুক্ত বিক্রি হতো নানা ধরনের ড্রাগস। আমি এখানে বসবাস করার অল্পকালের মধ্যে তরুণ লেখক-শিল্পীদের নিয়ে এগুলো তাড়িয়েছি। এখন এলাকাটি অনেকটা পরিচ্ছন্ন, তবে সম্পূর্ণ ড্রাগমুক্ত নয়।
মামুন: একসময় আপনারা-ই তো নেশা করতেন এবং উসকে দিচ্ছিলেন মার্কিন তরুণদের।
গিন্সবার্গ: অনেক বছর ধরে আমি প্রচার করে যাচ্ছি, বিট বংশের কেউ নেশাগ্রস্ত হয়ে যেন মারা না যায়। অতিরিক্ত মদ্যপান এবং নেশার কারণে আমরা অনেক মেধাবীকে অকালে হারিয়েছি। এখন আমাদের বেঁচে থাকতে হবে অন্তত এই বলার জন্য, আর ড্রাগ নয়, এটা বিষাক্ত, আমাদের মেরে ফেলবে।
মামুন: আপনি সারা জীবন ড্রাগের পক্ষে বলছেন। এখন বলছেন আর ড্রাগ নয়। আপনার কথা কেউ শুনবে?
গিন্সবার্গ: আমরা নেশা করেছি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার জন্য নয়। নতুন কিছু করা যায় কি না, সে রাস্তাটা খুঁজে বের করার জন্য ড্রাগের আশ্রয়ে যেতে হয়েছিল। পৃথিবীর বহু দেশের ভেষজ নেশার তথ্য আমি সংগ্রহ করেছিলাম। বহু বই আমার সংগ্রহে আছে। মাদক বিশেষজ্ঞ হয়ে আমি একবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের এক কমিটিতে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। আমি বলেছি, সিআইএ কীভাবে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন দেশে মাদক পাচার করে সে দেশের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কোনো নেশাকে উন্মুক্ত করতে বলিনি আমরা। আমি সব সময় বলি মাদককে নিয়ন্ত্রণ করতে, বন্ধ করা নয়।
মামুন: রাস্তাটা পেয়ে গেছেন?
গিন্সবার্গ: হ্যাঁ। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করেছি। নয়তো ওই যুদ্ধটা আরও ২০ বছর চলতে পারত।
মামুন: বিশ শতকে প্রত্যেকটি প্রেসিডেন্টের আমলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করছে ইচ্ছা করেই।
গিন্সবার্গ: একদম খাঁটি কথা। হোয়াইট হাউসে যারা যান, তারা কিছুদিনের মধ্যে টের পান যে বিশ্বকে অশান্ত না রাখলে বা যুদ্ধ না বাধালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কোনো কাজ করার থাকে না। তার অখণ্ড অবসর। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত মুন্সিয়ানা জারি রাখার জন্য তাদের সিআইএ মদদ দেয় যুদ্ধ শুরু করার জন্য। প্রেসিডেন্ট তখন অস্থির হয়ে ওঠেন কখন কীভাবে যুদ্ধের সূচনা করবেন। এমন একটি নিরাপদ ভূখণ্ড কোথায় পাবে? পুঁজিবাদী শক্তির নাটের গুরু যুক্তরাষ্ট্র। নজিরবিহীন কাণ্ডকারখানা ঘটাতে পারে এরা।
মামুন: আপনি আমাকে বলছিলেন, আপনাদের বিট বন্ধুদের অনেকে নেশা ও মদ্যপানের কারণে স্বল্প বয়সে প্রয়াত হইছেন। আপনি সেইভাবে মরতে চান না।
গিন্সবার্গ: বলেছি, এখন রীতিমতো প্রচার করি। এখন বিশ্বে আমাদের চেনে যে আমরা যুদ্ধবিরোধী, আমরা পাগল, খ্যাপাটে, মাদক সেবন করি বা উল্টাপাল্টা জীবনযাপন করি। কিন্তু আমাদের সাহিত্যের যে মানবিক দিক রয়েছে, এটা আমাদের বলতে হবে। আগে অনেকে সমালোচনা করতে গিয়ে বলত, বিট লেখকদের সাহিত্য অশ্লীল। এ ব্যাপারে অনেক মামলা হয়েছে, এখনো আছে। আমাদের বই নিষিদ্ধ করেছে। পুলিশ হয়রানি করেছে। এসব অতীতকে আমি টেনে আনব না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্যে আমাদের লেখালেখি উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। কিছুকাল আগেও বলতে শুনেছি, বিট সাহিত্য দুর্বোধ্য। আমাদেও দুর্বোধ্য শব্দগুলোকে পরিষ্কার করে দিয়েছেন একজন, এই মুহূর্তে তার নামটা মনে আসছে না। তিনি বিট ডিকশনারি নামে একটি অভিধান রচনা করে আমাদের পাঠ করা সহজ করে দিয়েছেন।
অনেক অসমাপ্ত কাজ আমি গুছিয়ে আনছি। বোল্ডারে আমার বিট জেনারেশনের বন্ধুদের একটা করে স্ট্যাচু স্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এতে প্রচুর শ্রম ও অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু কাজটি করতে হবে। ১৯৪৮-৪৯ সালে আমি যখন কলাম্বিয়ার ছাত্র, তখন প্রায় আট মাস আমাকে একটি মানসিক নিরাময় কেন্দ্রে থাকতে হয়েছিল। সেখানে দেখেছি আমার বন্ধু অর্ধউন্মাদ কার্ল সলোমনকে, কীভাবে স্বেচ্ছায় বৈদ্যুতিক শক নিতেন। আমার হাউল কবিতার 'বেস্ট মাইন্ডস অব মাই জেনারেশন' কার্ল সলোমন। উইলিয়াম বারোজ বিভিন্ন দেশের মাদকের ওপর সময় ব্যয় করেছেন। অনেক সময় ক্ষতিকর ড্রাগ সেবনের ফলে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়েছে। নিজের শরীরের ওপর দিয়ে তিনি নতুন নতুন ড্রাগসের পরীক্ষা চালাতেন, যার ফলে তার মৃত্যু হতে পারত। তিনি একসময়ে টেক্সাসে মারিজুয়ানার চাষ করেছেন। স্বভাবে তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা। কোনো স্থিতি ছিল না তার। ১৯৬৮ সালে মদের সঙ্গে বিটুরিয়েট ট্যাবলেট মিশিয়ে সেবন করলে বিষক্রিয়ায় অকালমৃত্যু হয় নিল ক্যাসিডির। মেক্সিকোতে রেললাইনের ওপর নিলের লাশ পড়ে থাকে। জ্যাক কেরুয়াক অত্যধিক পান করতেন। তার প্রয়াণ আমাদের গোষ্ঠীকে দুর্বল করেছে। মাত্র ৪৭ বছরে মারা গেলেন জ্যাক।
মামুন: আপনাদের লেখায় অনেক শব্দ শুধু দুর্বোধ্য নয়, বিমূর্তও!
গিন্সবার্গ: তোমাকে মানতেই হবে কোনো পুরোনো প্রথা, যা শত বছর ধরে অব্যাহত ছিল বা রয়েছে, তা থেকে নতুন চিন্তা এবং বিষয় নিয়ে সাহিত্যে অনুপ্রবেশ করতে চাইলে তাতে প্রাণ দিতে হবে। নতুন শব্দ এবং ভাব সঞ্চারিত করতে না পারলে বিটদের নিয়ে এত কথা হতো না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পর ইউরোপ, আমেরিকা তথা পৃথিবীব্যাপী যে নৈরাজ্য চলছিল, তা থেকে সাহিত্য বা লেখকেরা নিষ্কৃতি পায়নি। আমরা একটা নতুন পথ নির্মাণ করেছি এবং বিশ্ববাসীকে বলেছি, বাস্তবতাই হচ্ছে সাহিত্য। মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটছে, তা সাহিত্যের বিষয় করতে আমরা অগ্রগামী। এখন ইংরেজি সাহিত্য বলতে চাইছে আমাদের পথটা আপাতদৃষ্টিতে অশ্লীল হলেও সঠিক। বাস্তবতাবিবর্জিত এবং শুধু ঈশ্বরের প্রতি অগাধ প্রেম নিবেদন করে মহৎ সাহিত্য হতে পারে না। আমরা এগুলো মেনে নিই। তোমার ঠাকুরকে (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) সে জন্য আমি বড় কবি বিবেচনা করি না।
মামুন: বাংলা ভাষায় কাকে বড় মনে করেন আপনি?
গিন্সবার্গ: অবশ্যই জীবনানন্দ দাশকে।
মামুন: ক্লিনটন সিলির বইটা দেখলাম আপনার অফিসে।
গিন্সবার্গ: হ্যাঁ, ওটা পড়েছি। ও জীবনানন্দকে ধরতে পেরেছে। সে নাকি বাংলা ভাষা শিখে তারপর অনুবাদ করেছে।
মামুন: রবীন্দ্রনাথ আপনার পড়া আছে?
গিন্সবার্গ: কিছুটা।
মামুন: অল্প-স্বল্প রবীন্দ্র সাহিত্য পাঠ করে তাকে জানা যাবে না!
গিন্সবার্গ: আমার মনে হয় তোমার কথাটা অনুমানমাত্র। প্রত্যেকের লেখায় একটি সিগন্যাল থাকে। ঠাকুরের সিগন্যালটা অল্প পাঠেই আমি বুঝে গেছি।
মামুন: বিস্তর বিষয়ে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। শুধু কবিতা নয়।
গিন্সবার্গ: তোমাদের বাংলা ভাষার লোকদের একটা বদভ্যাস যে, কোনো ব্যাপারে সুযোগ পেলেই ঠাকুরকে টেনে আনতে পারলে তোমরা সুখ পাও। এসব হীনম্মন্যতা মাত্র। আসলে ঠাকুর ছাড়া তোমাদের উল্লেখ করার মতো বড়মাপের প্রতিভা কম। আর তিনি তো নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছেন। তাকে একেবারে উপেক্ষা করাও যায় না। তবে তার প্রতি আমার আগ্রহ নেই।
মামুন: সেইটা হইতে পারে। কিন্তু যে ব্যাপারে জীবনানন্দ দাশকে আপনি রবীন্দ্রনাথের চাইতে বড় কবি মনে করছেন, মানে ঈশ্বরের প্রতি নিজেকে সমর্পণ বা নিবেদন, তা জীবনানন্দ দাশেও আছে। তা ছাড়া জীবনানন্দ দাশের রচনা দুর্বোধ্য। তার প্রায় বাক্যগুলো বিমূর্ত। তাকে বুঝতে হলে সমালোচক হওয়া প্রয়োজন। সম্ভবত সে জন্য জীবনানন্দ দাশ দীর্ঘকাল আমাদের আকর্ষণ করে নাই বা একপ্রকার উপেক্ষিত ছিল।
গিন্সবার্গ: জীবনানন্দ দাশের জীবিতকালে তার কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। সে কারণে তাকে তোমরা জানতে না।
মামুন: জীবনানন্দ জীবিতকালে অন্তরালে ছিলেন। কিন্তু তার বই প্রকাশিত হয়েছিল।
গিন্সবার্গ: আচ্ছা!
মামুন: আপনি আমেরিকান কবি, না ইংরেজি ভাষার কবি?
গিন্সবার্গ: আমি এমন একজন যে, দেখতে পারি এবং বলতে পারি সত্য কথাটি সঠিক সময়ে। পৃথিবীর তাবৎ সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলাটা প্রয়োজন মনে করেছি। সাহসের সঙ্গে বলেছি। আমেরিকাকে কেউ আক্রমণ করেনি। যুদ্ধে আমি আক্রান্ত হইনি। যুদ্ধটা আমার কাছে মানবজাতির পরম শত্রু মনে হয়েছে। আমেরিকা যাতে আর যুদ্ধ না করে, তার জন্য কথা বলেছি, নির্যাতন ভোগ করেছি এবং লিখেছি। এভাবে আমার উত্তরটা আশা করোনি তুমি!
মামুন: ভিয়েতনামে যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে নাই। এমন হল কেন?
গিন্সবার্গ: ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে। এই শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষিত হতে পারেনি সিআইএ বা হোয়াইট হাউস। ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য করার মওকা ছিল না। সেখানে জড়িত ছিল আমাদের রাজনীতিবিদের তথাকথিত সম্মান, যার জন্য দুই পরাশক্তির সঙ্গে লড়তে হয়েছে। ভিয়েতনামের পরে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল যুদ্ধে যায়নি। উসকানি দিয়েছে, খণ্ডকালীন অঘোষিত যুদ্ধ করেছে। পৃথিবীর ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে হলে সিআইএকে নাকি অস্ত্রের ওপর ভরসা করতে হয়। আমাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা আট বছর আগে বলেছিলেন, তাদের পরিকল্পনা আছে পরবর্তী ২০ বছরে কোথায় কোথায় তারা আক্রমণ করবে বা যুদ্ধ বাধাবে। কোথায় কখন কী ঘটবে তাদের নীলনকশা করা আছে! এতে নাকি তাদের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে!
অথচ এই দেশে হাজার হাজার যুবক-যুবতী বেকার। নেশায় শেষ হয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ তরুণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কীভাবে তেল আনা যায় এবং অস্ত্র বিক্রি করা যায় এই ফন্দিতে তাদের ঘুম নেই। উপসাগরীয় যুদ্ধ পেন্টাগনের জন্য অপরিহার্য। ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন তাদের দুটি বানানো ইস্যু। পেন্টাগনের একটাই কাজ, সব সময় তারা উত্তেজেনায় থাকে যুদ্ধের পরিকল্পনা করার বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত, সমগ্র মানবজাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া তার অতীত কার্যকলাপের জন্য। আমি নিজেও একজন মার্কিন নাগরিক বলে লজ্জিত।
মামুন: এতে যুক্তরাষ্ট্রের কী লাভ?
গিন্সবার্গ: তুমি এমনভাবে জিজ্ঞেস করলে যেন আমি পেন্টাগনের প্রধান।
মামুন: তাহলে আপনারা কী করলেন?
গিন্সবার্গ: তোমাকে পুরোনো সব কথা বলতে আমার বিরক্তিবোধ হচ্ছে। আমাদের বিট গোষ্ঠীর বেশ কয়েকজন সৈনিক ছিলেন। তারা আমেরিকার পক্ষে যুদ্ধ করেছে। জ্যাক কেরুয়াক, নরম্যান মেইলার, লরেন্স ফার্লিংহেট্টি, জন ক্লিলন হোমস, কার্ল সলোমন... মাত্র ১৪ বছর থেকে শুরু হয়েছে—যার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পোল্যান্ড, ইতালি, গ্রিস ও ফ্রান্স ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। কেনেথ রেক্সরথ, ফিলিপ হোয়ালেন ১৯৫৩ সালে কোরিয়ায় যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। পিটার অরলভস্কি এবং আমাদের আরও অনেকে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।
মামুন: আপনার দলের লোকেরা যুদ্ধ করছে কোথায়?
গিন্সবার্গ: তুমি ওয়াকিবহাল নও কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কথা বলছ। দ্বিতীয়ত, তোমার কোনো ধারণা নেই আমাদের কষ্ট এবং পরিশ্রমের ব্যাপারে। আমি এখন তোমাকে বের করে দিতে চাই না।
মামুন: দুঃখিত, আমি হয়তো ভালো প্রস্তুতি নিতে পারি নাই। সত্যি কথা, আমার তেমন জানা নাই।
গিন্সবার্গ: আমি যেভাবে বলি শুনে যাও। তর্ক কোরো না।
মামুন: পৃথিবীতে যেখানে যুদ্ধ বাধে, আপনি তার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু দেখা যায় বেশির ভাগ দেশে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রই।
গিন্সবার্গ: কারণ, সে শক্তিশালী। বলতে পারো পরাক্রমশালী। সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর আমেরিকা নিজেকে অনেকটা নিরাপদ মনে করছে এবং তার উদ্দেশ্য সফল করার জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখছে না। সে এখন কাউকে তার স্বার্থে আঘাত করতে চাইলেই করতে পারে।
মামুন: আমেরিকা চীনকে ভয় করে?
গিন্সবার্গ: যুদ্ধ যাদের একমাত্র নেশা, তাদের কোনো লজ্জা থাকে না, ভয়ও থাকে না। সামরিক শক্তি এবং ভৌগোলিক কারণে আমেরিকা চাইলেও চীনকে ঘায়েল করা কঠিন। আবার চীনও আমেরিকাকে ঘাঁটাতে চায় না। তিব্বতকে চীন প্রায় জোরপূর্বক দখলে রেখেছে। তিব্বতিরা চায় না চীনের সঙ্গে থাকতে। তারা আলাদা থাকতে চায়। প্রতিবছর ১০ মার্চ তিব্বতিরা আমাকে তাদের পক্ষে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তাদের এক সমাবেশে আমি বললাম, 'চায়না ডোন্ট হাইড ইয়োর ফেস ফ্রম দ্য ওয়ার্ল্ড!' পরে আমার কথাটা তিব্বতিদের স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
মামুন: পৃথিবীর কোন যুদ্ধকে আপনার সবচেয়ে ভয়াবহ মনে হয়?
গিন্সবার্গ: আদিকাল থেকে এ পর্যন্ত। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস করতে হবে। হত্যা করতে হবে শত্রুকে। শত্রু কারা? যদি দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়, উভয়ে উভয়ের শত্রু। আর যদি একাধিক পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বাধে, তাহলেও এক পক্ষ আরেক পক্ষকে শত্রু মনে করে। যুদ্ধের ফলে অনেক সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। আগ্রাসন এবং ধ্বংস কোনো জাতিরই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না। যুদ্ধ বাধায় অল্প কয়েকজন উন্মাদ এবং হঠকারী ব্যক্তি সমগ্র জাতির দোহাই দিয়ে।
মামুন: আপনি কি সমর্থন করেন পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না এবং রাষ্ট্রপ্রধানও স্বাভাবিকভাবে থাকবে না?
গিন্সবার্গ: এমন প্রশ্নের সামনে আমি কোনো দিনই পড়িনি! প্রশ্নটায় কৌশল আছে। আগে রাষ্ট্র আমার কাছে অপরিহার্য ছিল। বুড়ো হচ্ছি আর তোমার প্রশ্নের মতো আমাকেও এখন ভাবিত করছে। মানুষের জন্য যদি রাষ্ট্র হয়, একটা সমগ্র পৃথিবী নিয়ে মানবসমাজ কেন থাকতে পারবে না। আমি চিন্তাবিদ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নই, তবু আমার মনে হয়, রাষ্ট্র ছাড়া মানুষ ভালোভাবেই চলতে পারবে। কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে হবে নতুনভাবে। এটা বড় কঠিন কাজ। এই বদলের জন্য চিন্তাবিদ দরকার।
মামুন: আপনাদের বন্ধু অ্যান্ডি ওয়ারহল নাকি বলতেন, ১৫ মিনিটের জন্য কাউকে রাজা বানাইতে পারেন?
গিন্সবার্গ: না না, তথ্যটা ঠিক নয়। ওয়ারহল ম্যানহাটনের টুয়েন্টিথার্ড স্ট্রিটের হোটেল চেলসিতে রাত-দিন কাজ আর বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা মারত। একদিন সে এক আড্ডায় বলল, ১৫ মিনিটের জন্য সে কাউকে বিশ্ববিখ্যাত বানিয়ে দিতে পারেন। এ ব্যাপারে মিডিয়ায় আলোচনা হয়েছিল। ওয়ারহল ছবি আঁকত, ফটোগ্রাফি করত এবং নানা জিনিস তৈরি করত, তার একটি পরিবার ছিল। তারা সবাই বড় বড় পাগল। হোটেল চেলসিতে বসেই ওয়ারহল পপ আর্টের সূচনা করেছিল।
মামুন: পপ আর্ট আপনার ভালো লাগে?
গিন্সবার্গ: লাগবে না কেন। অ্যান্ডি ওয়ারহলের প্রতিটি শিল্পকর্মের মূল্য এখন দিতে আরম্ভ করেছে বড় মিউজিয়ামগুলো। তার নিজের নামে একটি জাদুঘর হয়েছে।
মামুন: কিন্তু পপ আর্ট স্থায়ী নয়।
গিন্সবার্গ: কী স্থায়ী?
মামুন: কেউ নয়।
গিন্সবার্গ: অবান্তর কথা বলো কেন? সোডার ক্যান বা বোতল দিয়ে শিল্প সৃষ্টি করা যায়, এটা কি ওয়ারহলের আগে কেউ ভেবেছে? ও আমাদের ভালো বন্ধু ছিল। সে বলেছে, পৃথিবীর কোনো কিছুই যখন স্থায়ী নয়, কোনো শিল্পকর্মও স্থায়ী হতে পারে না। তার চিন্তাটা সঠিক।
মামুন: কিন্তু বিভিন্ন জাদুঘর শিল্পকর্ম স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতেছে?
গিন্সবার্গ: এরা কি শিল্পকর্মগুলোকে এক কোটি বছর ধরে রাখতে পারবে? সম্ভব নয়।
মামুন: আপনি কেন ছবি আঁকেন?
গিন্সবার্গ: আমি দক্ষ চিত্রশিল্পী নই, কিন্তু ছবি আঁকতে দোষ কী। এদিকে এসো, আমার কিচেনের পাশের ঘরটায় চলো।
মামুন: আমি দেখতে চাই, ধন্যবাদ।
গিন্সবার্গ: আমারও কিছু হাত আছে।
মামুন: এগুলা সব পেইন্টিং!
গিন্সবার্গ: এই ছবিটি কর্সোর আঁকা। ইংরেজ কবি শেলি ও বায়রন তার একসময়ের প্রিয় চরিত্র। তেলরঙা আমার আঁকাটা দেখো, ভালো হয়েছে না? এটা রবার্ট লা ভিনের আঁকা। ছবি আঁকার ব্যাপারে আমাদের বিটদের মধ্যে সে বিশাল প্রতিভা। তার পেইন্টিং বড়-ছোট অনেক জাদুঘরে ঝুলছে। এক ধরনের নীরব জীবনে অভ্যস্ত রবার্ট লা ভিন। আমাদের শ্রেষ্ঠ পেইন্টিংগুলো বিশেষ করে পোর্ট্রেটগুলো তারই আঁকা। সে একজন নিভৃতচারী শিল্পী। অর্থের পেছনে থাকেনি। চল আমরা ওখানটায় গিয়ে বসি।
মামুন: আপনি ছবি আঁকলেন না কেন?
গিন্সবার্গ: আমার মতো করে আঁকি। কেউ যদি আমার কাছে অটোগ্রাফ চাইতে এসে সুন্দর কোনো খাতা আমাকে দেয়, তাতে আমি আনন্দের সঙ্গে ছবি এঁকে দিই।
মামুন: কেন?
গিন্সবার্গ: মানুষের নাকটা আমি ঠিক আঁকতে পারি না। ঠোঁট আর নাক আমার হয় না।
মামুন: যুক্তরাষ্ট্র যত দিন কল্যাণকর রাষ্ট্র না হইতেছে, তত দিন বিশ্বশান্তি আশা করা ঠিক নয়।
গিন্সবার্গ: বিলকুল। যে পররাষ্ট্র এবং অভ্যন্তরীণ নীতি পঞ্চাশের শেষ দিক থেকে শুরু এবং এখন পর্যন্ত বহাল আছে, তাতে বিশ্বের ঘুম ক্রমান্বয়ে হারাম হতে বাধ্য। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রতিক্রিয়াশীল এবং সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর সিআইএর নীতি আরও বেপরোয়া হয়েছে। আগে সিআইএর আন্তর্জাতিক পরিকল্পনাগুলো করা হতো মস্কোকে হিসাব করে অত্যন্ত সন্তর্পণে। সে অবস্থা এদের কেটে গেছে। এখন তারা কোনো কিছুতেই বাধাগ্রস্ত মনে করে না। কাজেই যা ইচ্ছে তাই করতে চায়। 'দ্য ফল অব আমেরিকা' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। লেখাগুলো পড়ে দেখবে, আমি যুক্তরাষ্ট্রকে কেন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বলেছি, তার অর্থ সেখানে খুঁজে পাবে।
মামুন: রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া যুদ্ধবাজদের কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যায় না। আপনি কী মনে করেন?
গিন্সবার্গ: নির্বাচনের আগে বুলশিট সাংবাদিকেরা এ ধরনের প্রশ্ন করে। আর যারা প্রশ্নটার সামনে থাকে, তারা নিশ্চয় রাজনীতিবিদ। নির্বাচন পার হওয়ার পর মূল্যবান ব্যক্তিটি ইচ্ছে করেই ভুলে যায় যে, সে সাংবাদিককে যুদ্ধবিরোধী সুন্দর কথাগুলো বলেছিল। আমি রাজনীতিবিদ নই। আবার রাজনীতিকে ঘৃণাও করি না। এখন মনে হচ্ছে, কবি নিজে সমাজ পরিবর্তন করেন না। তিনি সিগন্যাল দেন। আমি ইদানীং প্রত্যয়ের সঙ্গে বলছি যুদ্ধ হবে না। যদি পৃথিবীতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, আলাদা মানচিত্র বা জাতীয় পতাকা না থাকে। এমনকি বিভেদও কমে আসবে। অন্তত মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে। আর এই গ্রহের আয়ু আরও কিছুকাল বেড়ে যাবে।
মামুন: আপনি নিজে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র দেখছেন?
গিন্সবার্গ: আমার বন্ধুদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করেছি—সব মহাদেশ দেখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রায় ১৪টি শহরে থেকেছি বা বসবাস করেছি। আমার পূর্বপুরুষেরা যুদ্ধ এবং কমিউনিজমের ভয়ে সোভিয়েত রাশিয়া ত্যাগ করেছে। তারা জাতে ইহুদি। সবকিছু মিলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ মনে করেছিল তারা। আমার মা নাওমি বামপন্থী ছিলেন। বিয়ের কয়েক বছর পর তিনি বুঝতে পারলেন, এই দেশও তার মন জোগাতে স্বস্তির জন্য বিশেষ নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে এত বৈষম্য আমার মা সহ্য করতেন না। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়িতে প্রায় প্রতি সপ্তাহে মায়ের সহযোগিতায় বামদের গোপন সভা হতো। আমার বাবা লুই গিন্সবার্গ বিরক্ত হলেও কিছু বলতেন না। আমার পরিবারটাই একটা যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে ঃৎড়ঢ়যরবং সম্ভব আবার কোনো কিছুই সম্ভব নয়।
প্যাটারসনে দেখেছি মায়ের অস্থিরতা, বাবার পেশা নিয়ে শৃঙ্খলার জীবন। মায়ের অনেক আত্মীয়স্বজন ছিলেন রাশিয়ায়। তাদের বেশির ভাগের সঙ্গে কোনো দিন তার দেখা হয়নি। ১৯০৫ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে আমার মা (নাওমি) চলে আসেন নিউইয়র্কে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে। তাকে খুব কম হাসতে দেখেছি। কেন যেন তার জীবনটা বেদনার ছিল। পরিবারের এসব মানসিক মুহূর্ত দেখছি আর বড় হচ্ছি।
ব্যাপক পর্যটন করেছি আমি নিকারাগুয়া থেকে ভারত, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা—যেখানেই গেছি সাধারণ মানুষের সঙ্গে থেকেছি, মিশেছি। দেখেছি প্রত্যেকেই যুদ্ধের জন্য পুঁজিবাদকে দায়ী করে এবং যুদ্ধের ব্যাপারে সবাই বিরক্ত ও ভীত। যাদের সঙ্গে ভ্রমণের সময় অমি থেকেছি, তাদের প্রত্যেকের রয়েছে যুদ্ধের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। ১৯৬৩ সালে জাপান ভ্রমণের সময় প্রত্যক্ষ করলাম, সে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক যুদ্ধকে ঘৃণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু অ্যাটম বোমার কথা তারা ভোলেনি। যুক্তরাষ্ট্রকে তারা এখনো ক্ষমা করেনি।
মামুন: আপনি বৌদ্ধধর্মের দিকে আকৃষ্ট হইলেন কীভাবে?
গিন্সবার্গ: কিয়োটোতে গ্যারি স্নাইডার ও জোয়ানে কাইজারের বাসায় পাঁচ সপ্তাহ ছিলাম। ওহ, ভুলে গিয়েছিলাম, ভারতে কিছুকাল আমার বন্ধু ছিল মারেটা। সে কলকাতায় ও বারাণসীতে আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা করতে আসত। ধর্মশালায় দালাইলামার আখড়ায় সে বাচ্চাদের ইংরেজি শেখানোর সময় বৌদ্ধধর্মে আকৃষ্ট হয়েছিল। বৌদ্ধধর্মের অহিংসবাদ আমাকেও আকর্ষণ করত। কিয়োটোতে প্রতিদিন দেখতাম মেঝেতে আসন করে গ্যারি ধ্যান করতেন গৌতম বুদ্ধের মতো। প্রথমে আমি আসন করে বসতে পারতাম না। তার প্রভাবে অনেকে বৌদ্ধধর্মে আকৃষ্ট হয়েছে। পরে তিব্বতের গুরু, যিনি এখানে বসবাস করেন দীর্ঘকাল ধরে চোগিয়াম ট্রুপা, তার মাধ্যমে ১৯৭২ সালে আমি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিই।
মামুন: আপনারা আসলে কোনো ধর্ম পালন করেন না।
গিন্সবার্গ: কে বলল তোমাকে? আমি নিয়মিত ধ্যান করি। বুদ্ধের মূর্তি আছে আমার ঘরে; ভারত থেকে একটা এনেছিলাম। আগরবাতি জ্বালাই, ধূপ দিই মূর্তির জন্য। প্রতিদিন আমি ধ্যান করি। এতে আমার আত্মার শান্তি সাধিত হয়। আমি নিজেকে একজন খুব সাধারণ মানুষ ভাবতে পারি। মনে করি, এইমাত্র জন্ম হলো আমার।
মামুন: আপনার কি কখনো মনে হয় আপনি একজন ইহুদি?
গিন্সবার্গ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভয়ানকভাবে মনে হয়েছিল। অনেককাল এই ভূত আমার মধ্যে ছিল।
মামুন: 'বিট' সাহিত্য কী?
গিন্সবার্গ: আমেরিকান সাহিত্য থেকে আলাদা, তবে বিচ্ছিন্ন নয়। আমরা বলি, 'প্রাইভেট ইজ পাবলিক'। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতি আমাদের সাহিত্যের সিংহভাগ। কিন্তু আমাদের লেখায় পাঠক তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবেন। এখানেই অন্যদের স্মৃতিচারণা-কাতরতা থেকে আমরা ভিন্ন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আমাদের লেখায় খুঁজে পেয়েছে তারুণ্য, দ্রোহ এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়ার সংকল্প। মানুষের মূল্যবোধকে সম্মান জানানো আমাদের লেখায় বারবার এসেছে এবং ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছিল। আমাদের সময়ে যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছিল, তা সইবার এবং প্রতিবাদ করার মতো শক্তি আমরা উপস্থাপন করছিলাম আমাদের লেখায় ও ব্যক্তিগত জীবনে।
চল্লিশের শেষ থেকে পঞ্চাশের শেষ পর্যন্ত বিট জেনারেশনের কবি ও ঔপন্যাসিকেরা ছোটকাগজের প্রেসে তাদের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ধরনা দিয়েছে এবং তারা ব্যস্ত থেকেছে লেখার জন্য একে অপরকে উৎসাহ দিয়ে। কেরুয়াক ও আমার তাড়নায় নিল ক্যাসিডি চুরি করা টাইপরাইটারে তার প্রথম লেখা আরম্ভ করেন। তখন নিল থাকত ডেনভারে। প্রথমে আমাদের লেখা কেউ ছাপতে চাইত না। ১৯৪৮ সালে কেরুয়াকের প্রথম উপন্যাস 'দ্য টাউন অ্যান্ড দ্য সিটি' লেখা হয়, কিন্তু প্রকাশকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় বারবার। শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়েছিল ১৯৫০ সালে।
মামুন: আপনারা প্রতিষ্ঠানবিরোধী। বিট জেনারেশনকে কি একটা প্রতিষ্ঠান বলা যেতে পারে?
গিন্সবার্গ: আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের ধার ধারি না। আমাদের জেনারেশন যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি আন্দোলনের সূচনা করেছিল, যা পৃথিবীর প্রায় সব দেশে নাড়া দিয়েছিল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ পুরোনো বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে মধ্যবিত্তের কোনো ঠিকানা ছিল না। সংখ্যাগরিষ্ঠ এ অংশটি ছিল গুনতির বাইরে। বিট মুভমেন্ট হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী একটি সত্যিকারের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
মামুন: বিট জেনারেশনের কেন্দ্রীয় চরিত্র কাকে বলা যায়?
গিন্সবার্গ: জ্যাক কেরুয়াক।
মামুন: এখানে আপনার অবস্থান কোথায়?
গিন্সবার্গ: তুমি কি পরীক্ষা নিচ্ছ যে, আমাকে প্রথম-দ্বিতীয় বা শেষে ফেলবে?
মামুন: বিট মুভমেন্ট সম্পর্কে বলেন।
গিন্সবার্গ: আমাকে বিরক্ত করছ। এসব বইয়ে আছে। বহু লেখাতে আছে এসব কাহিনি।
মামুন: যদি দয়া করে বলেন। যেহেতু আমি ভিনদেশি, বিষয়টি আমাদের প্রায় অজানা।
গিন্সবার্গ: বিট শব্দটি প্রাথমিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর কয়েকজন জাজ মিউজিশিয়ান ব্যবহার করতেন। জাজশিল্পী মেজ মেজরো ১৯৪৬ সালে তার লেখা 'রিয়েলি দ্য ব্লুজ' বইয়ে প্রথম শব্দটি লেখেন। কিন্তু শব্দটি জনপ্রিয় করেন তার আগে মৌখিকভাবে হার্বার্ট হাঙ্কে ১৯৪৪ সালে। তিনি তখন টাইমস স্কয়ারের ভবঘুরে নেশাখোর, বেশ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত তার, ফুলটাইম চোর এবং হোমলেস। অপরাধজগতের সঙ্গে ছিল তার নিবিড় সম্পর্ক। মাঝেমধ্যে পুলিশ চোর-ছিঁচকেদের ধরার জন্য তার সাহায্য নিত। তিনি আমার ১১ বছরের বড়। ১৯৪৪ সালে কলম্বিয়ার গ্র্যাজুয়েট উইলিয়াম বারোজ তার বাবার একটি শটগান এবং কিছু মরফিন বিক্রি করতে এলে টাইমস স্কয়ারে হার্বার্ট হাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। হাঙ্কে বারোজকে হেরোইন সেবনে উৎসাহ দেন। বারোজের মাধ্যমে কেরুয়াক এবং আমার সঙ্গে হাঙ্কের পরিচয় হয়। নিয়মিত চুরি করা যার অভ্যাস, তাকে আমরা লেখার পরামর্শ দিই। তার আগেই হাঙ্কে 'এলসি জন; এবং 'জো মার্টিনেজ' নামে দুটি গল্প লেখেন।
[সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ১ মে ১৯৮৯ থেকে অক্টোবর ১৯৯৬, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র]