বিশ্বকাপ থেকে 'টিম মেল্লি'-র বিদায়: ইরানজুড়ে তীব্র আবেগ ও উত্তেজনা
বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন আবারও ভঙ্গ হয়েছে ইরানের। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে মিসরের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে আসর থেকে বিদায় নিয়েছে 'টিম মেল্লি' হিসেবে পরিচিত দলটি। গ্রুপ 'জি' থেকে ৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে ইরান।
৩২ থেকে দল বাড়িয়ে ফিফা এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। এই নিয়মে আটটি সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দলের পরবর্তী পর্বে যাওয়ার সুযোগ ছিল। তবে অন্য ম্যাচগুলোর ফলাফল ইরানের পক্ষে না আসায় মাত্র একটি স্থানের ব্যবধানে বাদ পড়ে যায় তারা। তেহরানের বাসিন্দা মিলাদ আল জাজিরাকে বলেন, 'এমন কিছু ঘটার কথা ছিল না। আমরা নকআউট পর্বের ঠিক এক ধাপ বাইরে থেকে কীভাবে বাদ পড়লাম, তা বিশ্বাস করতে পারছি না।'
মাঠের বিতর্ক ও অদ্ভুত সব ঘটনা
ইরানের বিদায়ে মাঠের ফুটবলের চেয়ে মাঠের বাইরের পরিস্থিতি বেশি আলোচনায় এসেছে। দেশটির প্রধান কোচ আমির ঘালেনোই 'অদৃষ্টের' কথা বলেছেন। অন্যদিকে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন অন্য দলগুলোর বিরুদ্ধে কারচুপি ও যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছে।
মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের ৯৩ মিনিটে শোজা খলিলজাদে জয়সূচক গোল করলেও ভিএআর প্রযুক্তিতে সেটি অফসাইড বলে বাতিল হয়। গোলটি টিকে থাকলে ইরান সরাসরি রাউন্ড অব ৩২-এ পৌঁছে যেত।
এদিকে গোল উদযাপনের সময় দলটির এক স্টাফের অনিচ্ছাকৃত ধাক্কায় অন্য এক কোচিং স্টাফের নাক ভেঙে যায়। খলিলজাদে চশমা পরে গোল উদযাপন করেছিলেন। পরে মিসরীয় স্ট্রাইকার মোহাম্মদ সালাহর একটি হাস্যোজ্জ্বল চশমা পরা ছবি পোস্ট করে ইরানকে উপহাস করে মিসর।
ম্যাচ শেষে ঘালেনোই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই টুর্নামেন্টে ভাগ্যের সাহায্য পাননি তারা। তার ভাষায়, 'মনে হচ্ছিল সৃষ্টিকর্তাই আমাদের বিপক্ষে ছিলেন।' আসরে ইরানের মোট তিনটি গোল ভিএআর-এ বাতিল হয়েছে, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।
যুদ্ধ ও ভিসা জটিলতা
কোচ ঘালেনোই খেলোয়াড় ও স্টাফদের ওপর দিয়ে যাওয়া বৈরী পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন। গত চার মাস ধরে আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে ইরান। শুক্রবারের ম্যাচের কিক-অফের কয়েক ঘণ্টা আগেও হরমুজ প্রণালির বেশ কিছু দ্বীপে বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
এছাড়া আইআরজিসির (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনেক ফেডারেশনের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফুটবলারদের ওপরও ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। অ্যারিজোনার পরিবর্তে তাদের রাখা হয়েছিল মেক্সিকোর টিয়ুয়ানায়। ম্যাচ শুরুর আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেযুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং খেলার দিনই দেশ ছাড়ার শর্ত ছিল তাদের। কেবল সিয়াটল ম্যাচের জন্য দুই দিন আগে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ
মিসর ম্যাচের পর ইরানের ভাগ্য ঝুলে ছিল অন্য তিনটি ম্যাচের ওপর। শর্ত ছিল—ক্রোয়েশিয়াকে ঘানার কাছে হারতে হবে, কিন্তু তারা ২-১ গোলে জয় পায়। ডিআর কঙ্গোকে উজবেকিস্তানের কাছে হারতে বা ড্র করতে হতো, কিন্তু তারা ৩-১ গোলে জেতে। শেষ ম্যাচে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া ৩-৩ গোলে ড্র করলে ইরানের আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। ইরানের পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য এ ম্যাচে কাউকে জিততে হতো।
ম্যাচের আগে ইরানের জনপ্রিয় সঞ্চালক জাভাদ খিয়াবানি আলজেরিয়ার প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে আরবিতে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। আলজেরিয়ার 'মুসলিম ভাইদের' প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করার অনুরোধ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানকে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
ম্যাচটির সরাসরি সম্প্রচার চলাকালীন ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিওর উপস্থাপকদের মধ্যে তীব্র আবেগ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। খেলার অতিরিক্ত সময়ে আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজের করা গোলে ম্যাচের স্কোরলাইন ৩-২ দাঁড়ায়, যা ইরানকে পরের রাউন্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
এ সময় একজন ধারাভাষ্যকার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে খেলাধুলার সঙ্গে ধর্মের যোগসূত্র টেনে চিৎকার করে বলেন, 'অবশেষে একটি মুসলিম দেশ অন্য একটি মুসলিম দেশকে নকআউট পর্বে নিয়ে যেতে অবদান রাখছে।'
তবে অস্ট্রিয়ার সাশা কালাজদিক গোল করে ম্যাচটি ড্র করলে ইরানের কপাল পোড়ে। এই ড্রয়ের ফলে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া দুই দেশই পরের রাউন্ডে পৌঁছে যায়। ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উঠলে অস্ট্রিয়ার কোচ রাল্ফ রাংনিক তা অস্বীকার করে বলেন, 'আলফ্রেড হিচককও যদি এমন কোনো নাটক লিখতেন, তবে আমি হয়তো তাকে পুরোপুরি পাগলই বলতাম।'
বিভক্ত জনমত
মাঠের বাইরেও ইরানিদের মধ্যে জাতীয় দলকে নিয়ে ছিল তীব্র বিভক্তি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে অন্তত ২৩০ শিশুসহ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
আগের বিক্ষোভগুলোর মতোই সরকার এবারও সমস্ত দোষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল দ্বারা সংগঠিত 'সন্ত্রাসীদের' ওপর চাপিয়েছে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি 'নজিরবিহীন প্রাণঘাতী দমনপীড়ন' হিসেবে অভিহিত করেছে, যার মধ্যে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউনও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ওই ঘটনায় ফুটবলারদের নীরবতা বা পরোক্ষভাবে সরকারকে সমর্থনের বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারেননি।
বিশ্বকাপ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়ামগুলোর বাইরে ইসলামিক রিপাবলিক-বিরোধী কিছু ইরানি দেশটির ১৯৭৯-পূর্ববর্তী 'সিংহ এবং সূর্য' খচিত পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ জানান, যা কেন্দ্রে 'আল্লাহ' শব্দ থাকা বর্তমান সরকারি পতাকার বিপরীত। তবে প্রবাসী ইরানিদের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামে দলের হয়েই গলা ফাটিয়েছেন।
ইরানের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ খাকপুর, যিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, রবিবার একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন যে টুর্নামেন্ট থেকে ইরান বাদ পড়ার পর ইরানিদের মিশ্র অনুভূতি থাকার বিষয়টি একটি সামাজিক বার্তা বহন করে।
তিনি বলেন, 'সমাজের একটি অংশ যখন মনে করে যে "টিম মেল্লি" আর তাদের আবেগ, কষ্ট বা আশার প্রতিনিধিত্ব করছে না, তখন একটি ফাটল তৈরি হয়। মানুষ হয়তো ফুটবল ম্যাচে পরাজয়ে খুশি হয় না, কিন্তু তারা মাঝে মাঝে এমন একটি ইমেজের পতনে খুশি হতে পারে যা তারা সত্য বলে মনে করে না।'
পূর্ব তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা ফরহাদ আল জাজিরাকে বলেন, এখন থেকে কয়েক দশক পরে মানুষ টিম মেল্লিকে কেবল ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবেই মনে রাখবে না, বরং তাদের রেখে যাওয়া ফুটবল রেকর্ডের জন্যও মনে রাখবে।
তিনি বলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে, তারা পরবর্তী রাউন্ডে গেলে আমি বেশি খুশি হতাম, তবে তারা যেতে পারেনি বলে আমি একেবারে ভেঙে পড়িনি।'
