প্রথম বিশ্বকাপের যত চমকপ্রদ তথ্য
ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম আসর উরুগুয়ে ১৯৩০-কে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য চমকপ্রদ ঘটনা ও অজানা গল্প। রাজকীয় হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে সমুদ্রযাত্রা, বহুমুখী ক্রীড়াবিদ থেকে সাহসিকতার নজির—প্রথম বিশ্বকাপ ছিল নানা ব্যতিক্রমে ভরপুর।
রাজকীয় নির্দেশ
কোচ কস্তেল রাদুলেস্কু নন, বরং রোমানিয়ার দল নির্বাচন করেছিলেন দেশটির রাজা দ্বিতীয় ক্যারল। প্রথম বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ৩৫ দিন আগে ক্ষমতায় আসা রাজা দ্বিতীয় ক্যারল উরুগুয়ে বিশ্বকাপে দল পাঠানোকে অগ্রাধিকার দেন। দেশের সেরা খেলোয়াড়দের অধিকাংশ যে ইংরেজ তেল কোম্পানিতে চাকরি করতেন, তারা তিন মাসের বেতনসহ ছুটি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
তখন রাজা কোম্পানির প্রধানকে ফোন করে হুমকি দেন, ছুটি না দিলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানি রাজি হয়।
এক জাহাজে দল ও ট্রফি
গ্লাসগোতে নির্মিত ইতালীয় মহাসাগরগামী জাহাজ কন্তে ভের্দে চারটি দলকে উরুগুয়ে নিয়ে যায়। জেনোয়া থেকে রোমানিয়া দলকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাহাজটি পরে ভিলফ্রঁশ-সুর-মেরে ফরাসি খেলোয়াড়দের তোলে। সেখানে তিনজন রেফারি এবং ফিফা সভাপতি জুল রিমেও জাহাজে ওঠেন। বিশ্বকাপ ট্রফিটি ছিল তার স্যুটকেসে।
পরে বার্সেলোনা ও রিও ডি জেনেইরো থেকে যথাক্রমে বেলজিয়াম ও ব্রাজিল দলও জাহাজে যোগ দেয়। পুরো যাত্রায় সময় লাগে ১৬ দিন। খেলোয়াড়রা জাহাজের ১০টি ডেকে দৌড়ে নিজেদের ফিট রাখতেন এবং রাতে কৌতুক ও সংগীতানুষ্ঠান উপভোগ করতেন।
বিস্ময়কর জার্সির রং
বর্তমানে ব্রাজিলের পরিচয় তাদের হলুদ জার্সি, আর বলিভিয়া ও চিলি যথাক্রমে 'লা ভের্দে' (সবুজ) ও 'লা রোহা' (লাল) নামে পরিচিত। তবে উরুগুয়ে ১৯৩০ বিশ্বকাপে তিন দলই সাদা জার্সি পরেছিল।
১০টি খেলায় অংশ নেওয়া একজন ক্রীড়াবিদ
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম গোল করা প্রেগুইনিওকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বহুমুখী ক্রীড়াবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফুটবলের পাশাপাশি তিনি অ্যাথলেটিকস, বাস্কেটবল, ডাইভিং, রোলার হকি, রোয়িং, সাঁতার, টেবিল টেনিস, ভলিবল ও ওয়াটার পোলোতেও প্রতিযোগিতা করেছেন।
১৯২৫ সালের এক দিনে তিনি রিও ডি জেনেইরোর ৬০০ মিটার সাঁতারে তৃতীয় শিরোপা জেতার পর ট্যাক্সিতে করে লারাঞ্জেইরাসে যান। এরপর ফ্লুমিনেন্সের হয়ে অভিষেক ম্যাচে দলকে তোরনেইও ইনিসিও জিততে সহায়তা করেন।
তারুণ্য
উরুগুয়ের বিশ্বকাপে ১৮ বছর বয়সী মেক্সিকোর ম্যানুয়েল রোসাস ও রোমানিয়ার নিকোলায়ে কোভাচ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাদের তালিকায় যথাক্রমে দ্বিতীয় ও পঞ্চম স্থানে আছেন। অন্যদিকে যুগোস্লাভিয়ার দলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ দল হিসেবে এখনও রেকর্ড ধরে রেখেছে। তাদের গড় বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর ৭ দিন।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ তিন কোচের মধ্যে দুজন—আর্জেন্টিনার হুয়ান হোসে ত্রামুতোলা ও চিলির গিওর্গি অর্থ—গ্রুপ '১'-এ মুখোমুখি হন। তখন তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ২৭ ও ২৯ বছর। আর ৩১ বছর বয়সে উরুগুয়ের আলবার্তো সুপ্পিচি এখনও বিশ্বকাপজয়ী সর্বকনিষ্ঠ কোচ।
ভাই ভাই একসঙ্গে
১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল তিন জোড়া সহোদর ভাই। তারা হলেন- আর্জেন্টিনার হুয়ান ও মারিও এভারিস্তো, ফ্রান্সের জ্যাঁ ও লুসিয়েন লরাঁ এবং মেক্সিকোর রাফায়েল ও ফ্রান্সিসকো গারজা গুতিয়েরেস।
লুসিয়েন লরাঁ বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলটি করেছিলেন। এভারিস্তো ভাইয়েরা প্রথম সহোদর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেন। পরে এই কীর্তি গড়েন পশ্চিম জার্মানির ফ্রিৎস ও অটমার ভাল্টার, ইংল্যান্ডের জ্যাক ও ববি চার্লটন, নেদারল্যান্ডসের রেনে ও উইলি ফান ডে কেরখফ এবং পশ্চিম জার্মানির বের্ন্ড ও কার্ল-হাইনৎস ফোরস্টার।
আলভারো গেস্তিদো ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের চারটি ম্যাচেই খেলেছিলেন। তার ভাই অস্কার দিয়েগো পরে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
সাহসিকতা ও ব্রোঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের সেমিফাইনালে ম্যাচের শুরুতেই রালফ ট্রেসির পা ভেঙে যায়। তবু তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। বিরতির সময় তার সতীর্থ জেমস জেন্টল—দলের একমাত্র স্প্যানিশ ভাষাভাষী খেলোয়াড়—স্থানীয় চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন।
জানা যায়, স্প্যানিশ ভাষা জানার কারণেই তাকে রবার্ট মিলারের দলে রাখা হয়েছিল। পরে চিকিৎসকেরা ট্রেসিকে বোঝাতে সক্ষম হন যে তার পক্ষে ম্যাচ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
অলিম্পিক পদকজয়ী ও হকির বিস্ময়
টুর্নামেন্টের শেষ চারে ওঠা আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের কয়েকজন খেলোয়াড় এর আগে অলিম্পিক পদক জিতেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জেমস জেন্টল পরে ১৯৩২ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে পদক জিতে তাদের কাতারে নাম লেখান। তবে ফুটবলে নয়, তিনি পদক জিতেছিলেন হকিতে।
সেই অলিম্পিকের আরেক নায়ক ছিলেন একজন আমেরিকান। ১৯৩০ বিশ্বকাপের সময় এডি 'দ্য মিডনাইট এক্সপ্রেস' টোলানের ১০০ মিটার দৌড়ের বিশ্বরেকর্ড ছিল ১০.৪ সেকেন্ড। অন্যদিকে উরুগুয়ের স্ট্রাইকার পেদ্রো পেত্রোনের ব্যক্তিগত সেরা সময় ছিল মাত্র ০.৬ সেকেন্ড বেশি।
সেমিফাইনালে হুবহু একই ফলাফল
১৯৩০ বিশ্বকাপের দুই সেমিফাইনালই একই ব্যবধানে শেষ হয়।আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলে হারায়। অন্যদিকে উরুগুয়েও একই ব্যবধানে যুগোস্লাভিয়াকে পরাজিত করে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে পরে মাত্র পাঁচবার ৬-১ ব্যবধানের ফল দেখা গেছে। সেগুলো হলো—১৯৫০ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে স্পেনের ৬-১ হার, ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির কাছে অস্ট্রিয়ার ৬-১ হার, ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার কাছে ক্যামেরুনের ৬-১ হার, ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের কাছে পানামার ৬-১ হার এবং ২০২২ সালে পর্তুগালের কাছে সুইজারল্যান্ডের ৬-১ হার।
এক হাতের নায়ক
ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে উরুগুয়ের ৪-২ গোলের জয়ে শেষ গোলটি করেছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তার ডাকনাম ছিল 'এল মানকো' বা 'এক হাতওয়ালা'।
১৩ বছর বয়সে বৈদ্যুতিক করাত ব্যবহার করার সময় দুর্ঘটনায় নিজের একটি হাতের নিচের অংশ কেটে ফেলেছিলেন নাসিওনালের এই কিংবদন্তি খেলোয়াড়।
বল নিয়ে দ্বন্দ্ব
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে নিজেদের বল দিয়ে নিজেদের ম্যাচ খেলার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে ওঠার পর দুই দলই নিজেদের বল ব্যবহারের দাবি জানায়।
বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'বল বাছাইয়ের সময় দুই দেশের মধ্যে নজিরবিহীন বৈরিতা প্রকাশ পেয়েছিল। দুই দলই নিজেদের বল দিয়ে খেলতে চেয়েছিল।'
পরিস্থিতি সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করেন ফিফা সভাপতি জুল রিমে। তিনি সিদ্ধান্ত দেন, দুই দল একেক অর্ধে নিজেদের বল ব্যবহার করবে।
স্কটল্যান্ড থেকে আনা নিজেদের বল ব্যবহার করে আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধ শেষে ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড থেকে কেনা নিজেদের বল ব্যবহার করে উরুগুয়ে টানা তিন গোল করে শিরোপা জিতে নেয়।
সালামি স্যান্ডউইচের গল্প
তখন কোনো পুষ্টিবিদ বা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছিল না। ফলে খেলোয়াড়রা প্রায় যা খুশি তাই খেতে পারতেন।
ফ্রান্সিসকো ভারালো বলেন, 'স্তাবিলের একমাত্র পরামর্শ ছিল আমরা যেন সালামি স্যান্ডউইচ না খাই।' তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে ম্যাচের আগে তিনি প্রায়ই দ্বিতীয়বার খাবার খেতেন।
গিয়ের্মো স্তাবিলে টুর্নামেন্টে মাত্র চার ম্যাচে আট গোল করেছিলেন। আর্জেন্টিনার হয়ে এটাই ছিল তার একমাত্র বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। পরবর্তী ২০ বছর তিনি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। পরে আদেমির দে মেনেজেস সেই রেকর্ড ভাঙেন।
এক শহরের বিশ্বকাপ
প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র একটি শহর ও তিনটি স্টেডিয়ামে। অন্যদিকে ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০টি শহর ও ২০টি স্টেডিয়ামে, যা বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিসরে বিশাল পরিবর্তনের প্রতীক।
