বাইসাইকেল থেকে সার্কিট বোর্ড: বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক পণ্য রপ্তানিতে উৎপাদনের নতুন যুগের সূচনা
বাংলাদেশের প্রকৌশল খাতের রপ্তানিতে বৈদ্যুতিক পণ্য এখন অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাইসাইকেল ও ধাতব পণ্যের মতো প্রথাগত সামগ্রীর গণ্ডি পেরিয়ে এই খাতের বিস্তৃতি ঘটছে। এ থেকেই স্পষ্ট, উচ্চমূল্য পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে দেশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই–মে সময়ে প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫৯৮.১২ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.০৫ শতাংশ বেশি। তবে এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পরও আলোচ্য সময়ে দেশের মোট ৪৩.৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ে এ খাতের অবদান ছিল মাত্র ১.৩৭ শতাংশ।
এই খাতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। এ দুই ধরনের পণ্য থেকে এ সময় রপ্তানি আয় এসেছে ১৮৯.২৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় ২২.২৩ শতাংশ বেশি।
এ সময়ে বাইসাইকেল রপ্তানি ২৮.৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৮.৭৫ মিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে তামা ও তামাজাত পণ্য থেকে ৬০.৬৯ মিলিয়ন ডলার এবং লোহা ও ইস্পাত রপ্তানি থেকে ৫৬.৩২ মিলিয়ন ডলার আয় এসেছে।
তবে যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশল সরঞ্জামের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৮.৮৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪২.১১ মিলিয়ন ডলার।
এক দশক আগের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলেই এই খাতের রূপান্তরটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রকৌশল খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছিল প্রায় ৪৪৭ মিলিয়ন ডলার। সে সময় রপ্তানির বড় অংশজুড়েই ছিল বাইসাইকেল, আর বৈদ্যুতিক পণ্য থেকে আয় এসেছিল ৯০ মিলিয়ন ডলারের মতো। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে দেখা যাচ্ছে, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী এই খাতের বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠেছে। এ থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে।
বিদেশের বাজারে রপ্তানি হওয়া পণ্যগুলোর ধরন দেখলেও এই পরিবর্তনের প্রমাণ মেলে। কেবল হোম অ্যাপ্লায়েন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের উৎপাদনকারীরা এখন ক্রমশ উচ্চমূল্যের ইলেকট্রনিকস পণ্য তৈরির দিকে এগোচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সেফপ্রো টেকনোলজিসের কাছে দেশে উৎপাদিত প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি) ও প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড অ্যাসেম্বলি (পিসিবিএ) রপ্তানি করেছে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। এসব যন্ত্রাংশ গানশট-ডিটেকশন (বন্দুকের গুলির শব্দ শনাক্তকরণ) ও জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হবে। এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আধুনিক ইলেকট্রনিকস উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় মাইলফলক।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন ও এয়ার কন্ডিশনার (এসি) থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক তার (ক্যাবল), ট্রান্সফরমার, সার্কিট ব্রেকার, ব্যাটারি ও থার্মাল প্রিন্টারের মতো পণ্য এখন বৈদ্যুতিক পণ্য খাতের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, 'স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন এবং সরকারের ধারাবাহিক নীতি সহায়তাই রপ্তানি বৃদ্ধির মূল কারণ।'
সংগঠনটির তথ্যমতে, 'মেইড ইন বাংলাদেশ' ট্যাগযুক্ত ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য বর্তমানে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার ৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান গন্তব্য হলো জার্মানি, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, আয়ারল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ইসমাইল জানান, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস খাতের রপ্তানি আয়ে এখনো সবচেয়ে বেশি অবদান রাখাছে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ। তবে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং, রহিমআফরোজ ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) অবস্থিত বেশ কয়েকটি রপ্তানিমুখী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও বিদেশের বাজারে নিজেদের ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে।
এছাড়া এ খাতে বিশেষায়িত রপ্তানিকারকদের উত্থানও লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে থার্মাল প্রিন্টার রপ্তানি করা টিএইচটি-স্পেস ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড এমনই একটি প্রতিষ্ঠান।
কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শি ফেং বলেন, 'ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকসের বাজার এখন আর আগের মতো নেই। সারা বিশ্বে সব প্রথম সারির উৎপাদনকারী এখন এআই-চালিত, স্মার্ট পণ্য তৈরির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ যদি এই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারে, তবে শিল্প ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়বে।'
ওয়ালটন কম্পিউটার প্রোডাক্টসের চিফ বিজনেস অফিসার তৌহিদুর রহমান রাদ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানও একই পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, ওয়ালটনের নিজস্ব পিসিবি ও পিসিবিএ উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় স্মার্ট, ইন্টারনেট অভ থিংস (আইওটি) ও এআই-চালিত পণ্য উৎপাদনের পথ সুগম হচ্ছে।
পিসিবি হলো তামার তারের সংযোগ পথ ও প্যাডযুক্ত একটি খালি বোর্ড, যাতে কোনো সক্রিয় যন্ত্রাংশ থাকে না। অন্যদিকে পিসিবিএ হলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত একটি বোর্ড। সারফেস মাউন্ট টেকনোলজি (এসএমটি) বা থ্রু-হোল টেকনোলজির মাধ্যমে ওই ফাঁকা বোর্ডে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বসানোর পরেই সেটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ডিভাইসে পরিণত হয়।
তৌহিদুর বলেন, 'পিসিবি ও পিসিবিএ উৎপাদনে দক্ষতা অর্জনের ফলে আমরা এখন আমাদের পণ্যের মধ্যে উন্নত চিপসেট ও এজ-কম্পিউটিং প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারছি।' এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে ইলেকট্রনিকস সামগ্রী সংযোজনের (অ্যাসেম্বলিং) প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে আরও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
খাতটির এমন অগ্রগতি সত্ত্বেও উৎপাদকদের এখনো কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রকৌশল ও বৈদ্যুতিক পণ্যে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের একটি বড় অংশ—যেমন স্টিলের শিট, তামা, সেমিকন্ডাক্টর, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড ও ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট—এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যের ধরনভেদে বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের হার ৩০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। ওয়ালটন জানিয়েছে, নিজস্ব পিসিবি উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) কার্যক্রম এবং প্রিসিশন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে বিনিয়োগের সুবাদে বর্তমানে তাদের নিজস্ব মূল্য সংযোজনের হার প্রায় ৪০–৪৫ শতাংশ। তবে সেমিকন্ডাক্টর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এখনো বিদেশ থেকেই আনতে হচ্ছে, যা এই খাতের আমদানিনির্ভরতাকেই স্পষ্ট করে।
এ শিল্পের আরও প্রসারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় বাধার কথাও তুলে ধরেছেন উৎপাদনকারীরা। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: চড়া আমদানি ব্যয়, জ্বালানি সংকট, সার্টিফিকেশনের বাধ্যবাধকতা, লজিস্টিকস দুর্বলতা ও দক্ষ কারিগরি কর্মীর অভাব।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ আরও শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ফ্যাসিলিটি প্রতিষ্ঠা ও তৈরি পোশাক খাতের মতো নীতি সহায়তা দেওয়া হলে এই খাতের সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের প্রকৌশল খাত এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যেমন বিশাল উৎপাদন ভিত্তি ও সরকারের প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেন্টিভ স্কিমের হাত ধরে ভারতের প্রকৌশল খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সাথে গভীর সংযোগ ও বিদেশি বিনিয়োগের সুবাদে ভিয়েতনাম প্রতি বছর প্রায় ১৩০ থেকে ১৬০ বিলিয়ন ডলারের ইলেকট্রনিকস পণ্য রপ্তানি করে।
এর বিপরীতে বাংলাদেশের প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের নিচেই আটকে আছে। এ খাত মূলত দেশীয় উৎপাদনকারীদের ওপরই নির্ভরশীল। পাশাপাশি এখানে মূল্য সংযোজনের হারও কম এবং ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পও সীমিত। তারপরও বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে পিসিবি উৎপাদন শুরু হয়ার বিষয়টিকে এ খাতের ধারাবাহিক উন্নতির ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন স্টেকহোল্ডাররা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের তুলনায় প্রকৌশল খাতের রপ্তানি আয় এখন পর্যন্ত বেশ কম হলেও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেশের শিল্পোৎপাদনের ভিত্তি ক্রমশ শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একইসাথে এটি উচ্চমূল্যের শিল্প ও প্রযুক্তিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতারও পরিচয় দিচ্ছে।
