তুলসি বাগানের এক টারজানের গল্প
শৈশবে কতোটা দুরন্ত আর চটপটে ছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা? কয়েক কথায় এই বর্ণনাটা দেওয়ার উপায় নেই। বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়কের দুরন্তপনা নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে। তবু অজানা রয়ে গেছে অনেক গল্প। অজানা সেই ভান্ডার থেকে কয়েকটি নতুন গল্প শোনালেন মাশরাফি।
যে গল্প বলতে গিয়ে মাশরাফি নিজেই নিজেকে ডাকলেন অসম্ভব দুষ্টু হিসেবে। এতটাই দুষ্টু ছিলেন যে, একবার তিন তলা থেকে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি, অবশ্য কিছু হয়নি। নদীতে সাঁতরানো, গাছ বেয়ে বেড়ানোয় ওস্তাদ ছিলেন ছোটবেলার মাশরাফি। গাছে গাছেই বেশি সময় কাটতো তার। যে কারণে নামই হয়ে যায় তুলসি বাগানের টারজান।
নিজের দীর্ঘদিনের সুখ-দুঃখের সাথী প্রিয় ব্রেসলেটটি নিলামে তুলেছিলেন মাশরাফি। করোনাভাইরাস দুর্গতদের সাহায্যে নিলামে তোলা এই ব্রেসলেটটি ৪২ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। নিলাম অনুষ্ঠানে ক্রিকেট, ক্রিকেটের বাইরের অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেন মাশরাফি।
মাশরাফিকে প্রশ্ন করা হয় আলাদিনের দৈত্যকে সামনে পেলে কোন তিনটি জিনিস চাইতেন? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রথম চাওয়ায় নিজের শৈশবে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন মাশরাফি। শৈশবের কথা শুনে আয়োজকদের মধ্য থেকে আরেকজন প্রশ্ন করেন বসেন, কেমন ছিল সেই শৈশব, কতোটা দুষ্টু ছিলেন?
এ প্রশ্নে মাশরাফি যেন শৈশবেই ফিরে যান। বলতে থাকেন, 'অসম্ভব দুষ্টু ছিলাম। গাছে ওঠা, নদীতে সাঁতরানো, বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করা, বাসায় কম থাকা, তিনটায় মাঠে যাওয়া, এসব করেই সময় কাটতো। স্কুল ছুটি হলেই বাসায় গিয়ে কাপড় পাল্টে মাঠে আসা। এগুলো নিয়েই সারাদিন কাটতো। পড়ালেখাকে মনে হত তারে জামিন পার সিনেমার মতো, অক্ষর-বর্ণ সব ঘুরপাক খেত।'
এমন দুরন্তপনার কথা শুনে মাশরাফির শৈশবের গল্পে ফিরে যান সেই প্রশ্নকর্তা। ছোটবেলায় যে তাকে টারজান ডাকা হতো, সেটা মনে করিয়ে দেন তিনি। টারজান শব্দটা শুনেই মাশরাফি বলে ওঠেন, 'আমাকে তুলসি বাগানের টারজান বলা হতো। বাড়ির পাশেই ওই বাগান ছিল, এখন সেখানে অনেক বাড়ি উঠেছে। ওই বাগানের আম, কাঁঠাল, লিচু সব মনে হত আমার আয়ত্তের ভেতরে।'
গাছ বেয়ে টারজান উপাধি পাওয়া মাশরাফি সাঁতারেও সবার আগে থাকতেন। চিত্রা নদীর বুকে দাঁপিয়ে বেড়ানো সেইসব দিনের কথা মনে করে মাশরাফি বলেন, 'নড়াইলকে চিত্রা নদী ঘিরে রেখেছে। যারা নড়াইলের কিন্তু এখন নড়াইলের বাইরে থাকে, সবাই চিত্রা নদীকে মিস করে। এমনকি আমার স্ত্রীর বাসাও চিত্রা নদীর পাশে ছিল।'
'সেও ছোটবেলা এই নদীতে সাঁতার কেটেছে, তীরে খেলাধুলা করে বড় হয়েছে। আমাদের শৈশবই ছিল এখানে। মিস তো করিই। এখনও বাড়ি গেলে চিত্রা নদীতে সাঁতরাই। নদীর কাছাকাছি থাকার ওই অভ্যাস এখনও আছে।' শৈশব পেরিয়েছে, কিশোর মাশরাফি ছেড়েছেন নড়াইল। হাতে তুলে নিয়েছেন ৬ আউন্সের বল, ২২ গজে তুলেছেন গতির ঝড়।
সেই তুলসি বাগানের টারজানই পরে হয়ে উঠেছেন নেতা, বড় ভাই, অভিভাবক। দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলে 'বাবা'র দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। গত মার্চে ওয়ানডের অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন তিনি। তবু অন্যদের চোখে মাশরাফি সব সময়ের অধিনায়ক। নতুন ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালের ভাষায়, 'অধিনায়ক একজনই, সেটা মাশরাফি বিন মুর্তজা।'
সেই তুলসি বাগানের টারজান বড় হয়ে লাল-সুবজ জার্সি গায়ে চাপিয়ে দীর্ঘ সময় ছুটে বেড়িয়েছেন এই দেশ থেকে সে দেশে। দেশের মুখ উজ্জল করতে সত্যিকার অর্থেই শেষ বিন্দু দিয়ে লড়ে গেছেন। হিসাব যখন দেশের, তখন তার মাথায় অন্য কিছুই জায়গা করে নিতে পারেনি। তাই তো এক হাঁটুতেই সাতবার অস্ত্রোপচারের পরও ঘাড় বাঁকা করে বারবার মাঠে ফিরে এসেছেন মাশরাফি।
অবশ্য তিনি বীরশ্রেষ্ঠ পর্যায়ের কেউ নন। বীরশ্রেষ্ঠ ডাকলেই ভীষণ বিরক্ত হন মাশরাফি। লড়াইয়ের মানসিকতার কারণে তাকে বীরশ্রেষ্ঠ ডাকা হলেও মাশরাফি এমন বড় নামের ভার নেননি। উল্টো অতি আবেগি ভক্তদের অনুরোধ করেছেন আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার।
মাশরাফির চোখে সত্যিকারের বীরশ্রেষ্ঠ তারাই, যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। মাশরাফি এরআগে বলেছেন, 'বীর হলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা জীবন যাবে জেনেও সামনে গিয়ে লড়েছেন দেশের জন্য। আমরা কী করি? খুব বাজেভাবে বলি, টাকা নিই, পারফর্ম করি।'
'একটা অভিনেতা-গায়কের মতো পারফর্ম করি। এর এক ইঞ্চি বেশিও না। মুক্তিযোদ্ধারা গুলির সামনে এই জন্যে দাঁড়ায় নাই যে জিতলে টাকা পাবে। কাদের সঙ্গে কাদের তুলনা! ক্রিকেটে বীর কেউ থেকে থাকলে রকিবুল হাসান, শহীদ জুয়েলরা। মুক্তিযোদ্ধারা যদি পায়ে গুলি নিয়ে যুদ্ধ করতে পারে, তাহলে আমি কেন সামান্য সার্জারি নিয়ে বোলিং করতে পারব না।'
মাশরাফির দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আর সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। যে গুণাবলীর কারণে তুলসি বাগানের সেই দুরন্ত ছেলেটি এখন আরও বেশি দুরন্ত। তার ছোটাছুটি আরও বেড়েছে। এখন নড়াইলের এই প্রান্তে তো পরক্ষণেই অন্য প্রান্তে। তবে এটা সেই ছোটবেলার টারজানের মতো ছোটাছুটি নয়। এই ছোটাছুটি নড়াইলের মানুষের সেবার জন্য।
লম্বা সময় ধরে ক্রিকেট মাঠে দুরন্তপনা করা মাশরাফি এখন নড়াইলবাসীর কাছে 'দুরন্ত সংসদ সদস্য'। তুলসি বাগানের সেই টারজান এখন পুরো নড়াইলের টারজান। যে কিনা সব সময়ই কান পেতে রাখেন, তাকে কেউ ডাকলো কিনা সেটা শোনার জন্য।
