আলোচনায় বিশ্বকাপ ও কালেমাখচিত পতাকা
যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী, তাদের বুঝ হওয়ার পরই পরিবার থেকে ইসলামে মৌলিক বিশ্বাস বা সাক্ষ্যের মূল দুই কালেমা: কালেমা তাইয়্যেবা এবং কালেমা শাহাদাত শেখানো হয়। 'কালেমা' ঈমানের মূল সাক্ষ্য। একজন প্রকৃত মুমিন এই কালেমা বিশ্বাস করেন ও অন্তরে ধারণ করেন। কিন্তু কালেমাকে পতাকায় খচিত করা হয়েছে খুব সম্প্রতি এবং তা বাংলাদেশে।
এর আগে আমাদের দেশসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশেও কালেমা খচিত পতাকা দেখা যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ করে কেন এবং কারা বাংলাদেশে এই পতাকা উত্তোলন করছে, বিভিন্ন জায়গায় টাঙিয়ে রাখছে, পতাকা হাতে মিছিল ও সমাবেশ করছে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এরকম মিছিল-সমাবেশ চোখে পড়েছে এবং ইস্যুটি আলোচনায় এসেছে।
এই পতাকাগুলোর কোনোটির রঙ কালো, কোনোটি সাদা। যারা পতাকা নিয়ে মিছিল করেছেন, তাদের কেউ কেউ বলেছেন এটা 'মুসলিমদের পতাকা'। অনেকে বলছেন বাংলাদেশের সবখানে বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য অন্যান্য অনৈসলামিক দেশের পতাকা টাঙানো ও মিছিল করা হচ্ছে, সেখানে তারা মুসলমানদের 'ইসলামের নিশানা কোনটি' সেটা বোঝানোর জন্য র্যালি করেছেন।
কিন্তু একটি কাপড়ের ওপর জাতীয় পতাকার পাশেই কেন এই পতাকা দেয়া হচ্ছে? আমরা দেখেছি ফেসবুক লাইভে এসে একজন বিক্রেতা আরবি অক্ষরে কালেমা লেখা ও জাতীয় পতাকা এক কাপড়ের ওপর তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করছেন।
এ প্রসঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি গণমাধ্যমকে বলেছেন, "জাতীয় পতাকাকে বিকৃত করে কালেমা সংযুক্ত পতাকা তৈরি করে অনলাইন পেজের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছিল। এ কার্যক্রমের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।"
পতাকাটিকে যারা ইসলামের পতাকা বলছেন। এই পতাকা সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে তারা বলছেন 'ইসলামের পতাকার অবমাননা'। পতাকা নিয়ে মিছিলকে বলছেন 'ইসলামের পতাকার মর্যাদা রক্ষার' মিছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে 'ইসলামের পতাকা' বলে কি কিছু আছে? ইসলাম ধর্মে এভাবে নির্দিষ্ট কোনো পতাকার কথা উল্লেখ নেই বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ইসলামী গবেষক মো. আনিসুজ্জামান সিকদার।
তিনি বলেছেন, "ইসলামের নামে কোনো পতাকা যদি হতো, তাহলে তো আমরা সবাই সেটা ব্যবহার করতাম। এখানে কোনো উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে কখনই দাবি করা হয় নাই যে, এটা বা ওটা ইসলামের পতাকা। রাসুলের জামানায় তিনি পতাকা ব্যবহার করতেন, তবে সেটা যুদ্ধের সময়। সেই পতাকা আবার একেক যুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ছিল। ইসলামের রেওয়াতে নির্ধারিত কোনো পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায় না।" (বিবিসি)
ইসলামি বুজর্গরা মনে করেন সহি হাদিসে এমন কোনো নির্দেশ নেই যে মুসলিমদের জন্য একটি নির্দিষ্ট নকশার পতাকা ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধ বা অভিযানের সময় বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধের পতাকা ও ব্যানার ব্যবহৃত হতো। তবে এগুলো ছিল মূলত সামরিক বা প্রশাসনিক পতাকা, ইসলামের স্থায়ী ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কোনো পতাকা নয়।
পারমানেন্ট কমিটি ফর ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড ইফতা (Permanent Committee for Islamic Research and Ifta) ইসলামে পতাকার ব্যবহার সম্পর্কে বেশ কয়েকটি ফতোয়া প্রদান করেছে। তাদের প্রদানকৃত ফতোয়া বা মতামত অনুযায়ী ইসলামের প্রথম যুগে যুদ্ধের ময়দানে বা মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্দিষ্ট রঙের পতাকা যেমন সাদা, কালো বা সবুজ ব্যবহৃত হতো। তবে ইসলাম ধর্মে বিশেষভাবে কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন বা রঙের পতাকাকে বাধ্যতামূলক বা ইবাদতের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি।
কালেমা খচিত পতাকা প্রসঙ্গে তারা বলেছেন কোনো পতাকায় কালেমা তাইয়্যেবা বা আল্লাহর নাম লেখা থাকলে তা পবিত্র হিসেবে গণ্য হয়। তবে ওই পতাকার ব্যবহার নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে—কেউ কেউ এটিকে সম্মানের চোখে দেখেন, আবার কেউ কেউ অবমাননা বা অপব্যবহারের আশঙ্কায় এর বিরোধিতা করেন। ইসলামে কোনো কাল্পনিক বা কৃষ্টিগত রূপের পতাকার চেয়েও মানুষের ঈমান, আমল ও ইসলামের মূল বিশ্বাসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসলামে যদি কোনো নির্দিষ্ট পতাকা না-ই থাকে, তাহলে ঠিক এখন কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে মিছিল হচ্ছে কেন? এর উত্তরে দুটি বিষয় সামনে এসেছে, এক বিশ্বকাপ ফুটবল। যাকে ঘিরে সারাদেশে এবারও আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা লাগিয়েছেন ফুটবল ভক্তরা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ফুটবলের এই পতাকা টাঙানোর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থিদের কেউ কেউ অবস্থান নিয়েছেন।
এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে চট্রগ্রামভিত্তিক একটি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসিচব মুফতি হারুন ইজহারের একটি বক্তব্য। যেখানে তিনি বলেছেন, "আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগায় দিবেন। এখন যদি এটা জঙ্গিবাদ হয়ে থাকে তাহলে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল—এগুলোর সব পতাকা নামাতে হবে। এগুলো যেখানে থাকবে, আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে।" (বিবিসি বাংলা)
ধারণা করা যায়, ফেসবুকে তার এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর কালেমাখচিত সাদা ও কালো রঙের পতাকা ওড়ানো, মিছিল, শোভাযাত্রা এবং ফ্লাইওভার, ব্রিজ কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থানে পতাকা লাগাতে শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বা দেশে ফুটবল খেলা নতুন কিছু নয়, এটা যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা। অথচ একে বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে সমালোচনা করে অনেকে বক্তব্য দিচ্ছেন, মিছিল করছেন এবং চ্যালেঞ্জ করছেন।
এতগুলো বছর যাবত যে বিশ্বকাপ চলছে, বাংলাদেশের কোনো সমর্থক কি খেলাকে কেন্দ্র করে নিজের ধর্ম বাদ দিয়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছেন? করেন নাই, কারণ খেলা পছন্দের সাথে ধর্ম বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়া ১৪টি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশও ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলছে।
যদিও পরবর্তীতে হারুন ইজহার নিজেই বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এটা ফুটবল খেলাকে ঘিরে বলা হয়েছিল। "খেলাকে ঘিরে অমুসলিম দেশগুলোর পতাকা এভাবে উত্তোলন করা, বিদেশি একটা পতাকা বা সিম্বলকে দেশে এভাবে গণহারে ব্যবহার করা—এটা কোনোদিক থেকেই যায় না। আমি বলেছিলাম যে, আমাদের ভাইদের অনেকেই এটাকে সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিরোধ করতে গিয়ে কালেমার পতাকা লাগাচ্ছেন।"
আধুনিক বিশ্বে সব আয়োজনের মধ্যে খেলাধুলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে ৪৮টি দেশ অংশ নিলেও বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়। চারিদিক ছেয়ে যায় বড় বড় পতাকা, ফেস্টুন, জার্সি, টুপি, দেয়াল লিখনে। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট এলেই বাংলাদেশের দৃশ্যপট এভাবেই বদলে যায়। চায়ের টেবিলে, অফিসে, আড্ডায় বিতর্ক জমে ওঠে। বিশ্বকাপে বিভিন্ন দেশের পতাকার বিপরীতে কালেমাসহ বাংলাদেশের পতাকা ব্যবহার করার বিষয়টি নিয়ে সেজন্যই আলোচনা হচ্ছে।
অবশ্য কেন এইসব কালেমা লেখা পতাকা ওড়ানো হচ্ছে, এর প্রতীকী অর্থ কী, এটা হয়তো অধিকাংশ মানুষ ঠিক বুঝবেন না বা ভাববেন না। তবে একজন মুসলিম এটাকে রেসপেক্ট করবেন এটাই স্বাভাবিক।
সরকারের দিক থেকেও বলা হচ্ছে কালেমাখচিত পতাকা বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীককে ঘিরে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, অবমাননা কিংবা রাজনৈতিক অপব্যবহার কাম্য নয়। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কালেমাখচিত পতাকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে আলেম-ওলামা, শিক্ষাবিদ, ধর্মপ্রাণ মানুষসহ সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মাতামাতির শেষ নেই। খেলা দেখার সময় মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় ব্যক্তিগত দু:খ, কষ্ট। এমনকি যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবই পেছনে পড়ে যায়। শুধু খেলাকে ভালবেসে হাজার হাজার মাইল দূরের দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, মরক্কো, স্পেন বা জার্মানিকে নিয়ে মানুষের উত্তেজনার শেষ নেই। নিজের দেশ খেলতে না পারলেও এই একটি সময়ে আমরা হয়ে উঠি গ্লোবাল সিটিজেন। সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক আসরের একজন দর্শক মনে করি নিজেদের।
একটি ইতিবাচক দিক যে খেলাধুলার অর্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক পেছনে পড়ে থাকলেও, ফুটবল, ক্রিকেট নিয়ে এদেশের মানুষের আগ্রহ ও উন্মাদনা অনেক বেশি। মানুষ আনন্দ করতে চায়, চায় সুস্থ প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে। খেলা চলাকালীন সময়ে মানুষ ভুলে যায় নিজেদের অপ্রাপ্তি, হতাশা।
শিশু থেকে প্রবীণ সবার মুখে মুখে ফেরে পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, রোনালদো ও নেইমারের নাম। সবাই সমানভাবে বিশ্বকাপের আনন্দ উপভোগ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে এক হয়ে আনন্দ ভাগ করে নেয়াই হচ্ছে 'বিশ্বকাপ জ্বর'। এই নিষ্পাপ আনন্দ উদযাপনের সুযোগ কি সবসময় পাওয়া যায়?
কাজেই বিশ্বকাপ খেলা ও সেটাকে ঘিরে আনন্দকে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো কতটা যৌক্তিক হচ্ছে? খেলা পাগল মানুষ কত কী যে করে নিজের পছন্দের টিমকে সমর্থন করতে গিয়ে। সত্তর থেকে নব্বই দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত বাংলাদেশেও আবাহনী আর মোহামেডান নিয়ে এমনই উত্তেজনা ছিল। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সমর্থন না থাকা ও ক্রিকেটের ধাক্কাসহ আরো কিছু কারণে একসময় আমাদের ফুটবল মুখ থুবড়ে পড়ে, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলে আজ হয়তো আমাদের জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠতো বিশ্বকাপের ময়দানে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
