দেশি গাছে বাংলাদেশ সাজাই, বন্যপ্রাণীর আবাস বাঁচাই
আমাদের প্রকৃতি আর পরিবেশের প্রতিটি উপাদান একে অপরের ওপর নিভরশীল। প্রকৃতির অঞ্চলভেদে রয়েছে স্বকীয়তা এবং স্বতন্ত্রতা। আর এই কারণে পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে জীব বৈচিত্র্যের আর জীবনের অপূর্ব সমাহার।
এই রংবাহারী সমাহারে আপন জগতে প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলকে করে সুশোভিত। এর মাধ্যমে চলে এক অপরূপ ভারসাম্য। কিন্তু যখন এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, প্রকৃতি হারায় তার আপন গতি। প্রকৃতির অনন্য দুইটি উপাদান উদ্ভিদ ও প্রাণী। আর অঞ্চল ভেদে প্রাণীদের বৈচিত্র্য অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে ঐ অঞ্চলের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য।
"গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান" – এই স্লোগানটি বহু বছর ধরে পরিবেশ সচেতনতার অন্যতম প্রধান বার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় শুধু গাছ লাগানো নয়, বরং "সঠিক দেশি গাছ লাগানো" এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কারণ একটি গাছ কেবল ছায়া বা অক্সিজেনের উৎস নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেশ ব্যবস্থার অংশ।
তাই আজ সময় এসেছে নতুন করে বলার "দেশি গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান।" পাশাপাশি শুধু গাছ নয়, দেশি তরু লতা, গুল্ম, ঝোপঝাড়, জলাভূমির জলজ উদ্ভিদ সবকিছুই বাঁচিয়ে রাখে বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ। তাই গাছ বা বৃক্ষের পাশাপাশি এদের সংরক্ষনের উদ্যোগও জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের প্রকৃতি হাজার বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে দেশীয় বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, জলজ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর পারস্পরিক নির্ভরশীল সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। আমাদের বন, গ্রাম, হাওড়, বিল, চরাঞ্চল কিংবা পাহাড়ি অঞ্চল প্রতিটি জায়গার নিজস্ব উদ্ভিদবৈচিত্র্য রয়েছে, যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, উভচর, কীটপতঙ্গ এবং অণুজীবের জীবনচক্র।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় গাছপালা, ঝোপঝাড়, তরু, লতা, গুল্ম। এর পরিবর্তে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়েছে বিদেশি প্রজাতির গাছ; বিশেষ করে আকাশমণি এবং ইউক্যালিপ্টাস। দ্রুত বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক লাভ এবং কাঠ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে এসব গাছকে সামাজিক বনায়ন, রাস্তার পাশ, এমনকি সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়েছে। কিন্তু পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিদেশি গাছের প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আকাশমণি ও ইউক্যালিপ্টাসের মতো বিদেশি গাছ স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে খাপ খায় না। এদের পাতার গঠন, ছায়ার ধরন, মাটির উপর প্রভাব এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রেই দেশীয় উদ্ভিদের জন্য প্রতিকূল। ইউক্যালিপ্টাস মাটি থেকে অত্যধিক পানি শোষণ করে, ফলে আশপাশের জমি শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। আবার এদের পাতা দ্রুত পচে জৈবপুষ্টি তৈরি করতে পারে না, যার কারণে মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে আকাশমণির ঘন একক বন (monoculture plantation) তৈরি হলে সেখানে নিচু স্তরের দেশীয় গুল্ম, ঘাস বা প্রাকৃতিক উদ্ভিদ জন্মাতে পারে না। ফলে বনভূমির স্বাভাবিক স্তরবিন্যাস নষ্ট হয়ে যায়। একটি প্রাকৃতিক বন কখনোই শুধু বড় গাছের সমষ্টি নয়; সেখানে ছোট গাছ, লতা, ঝোপ, মৃত গাছ, পচনশীল পাতা, ছত্রাক ও অসংখ্য অণুজীব মিলে একটি জটিল জীবন্ত প্রতিবেশ গড়ে তোলে। কিন্তু বিদেশি একক প্রজাতির বনায়ন এই জটিলতাকে ধ্বংস করে দিয়ে বনকে জীববৈচিত্র্যহীন কাঠের বাগানে পরিণত করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের অনেক সংরক্ষিত বনাঞ্চল, সামাজিক বনায়ন এলাকা এবং এমনকি কিছু জাতীয় উদ্যানেও বিদেশি গাছের আগ্রাসন বাড়ছে। বন পুনরুদ্ধারের নামে অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক বন উজাড় করে আকাশমণি বা ইউক্যালিপ্টাস লাগানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নষ্ট হয়েছে দেশীয় জীব বৈচিত্র্য। বিশেষ করে উত্তরের শাল বন এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট জীববৈচিত্র্য, দেশের মধ্যাঞ্চলের শালবন সবথেকে বেশি ঝুঁকিগ্রস্ত।
প্রাকৃতিক বনে দেশীয় বৃক্ষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর হাজার বছরের সহাবস্থান তৈরি হয়েছে। একটি দেশী গাছ একটি স্থানের অসংখ্য জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। একটি বট বা পাকুড় গাছ বছরের বিভিন্ন সময়ে ফল দিয়ে পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাদ্যের জোগান দেয়। কদম, চালতা, করচ, ডুমুর, চাপালিশ,ডেউয়া, বরুণ, জাম, ছাতিম, বেত, বাঁশ কিংবা বিভিন্ন দেশীয় ঝোপঝাড় ছোট প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে।
কিন্তু বিদেশি গাছের বনায়নে এই সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। আকাশমণি বা ইউক্যালিপ্টাসের বন সাধারণত খুব কম প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে। সেখানে দেশীয় ফল বা ফুল না থাকায় পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী প্রাণী কমে যায়। অনেক বনাঞ্চলে দেখা গেছে, বিদেশি বনায়নের কারণে পাখির বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীদের জন্যও এসব বন উপযোগী আবাসস্থল তৈরি করতে পারে না। ফলে পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থাই ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর একটি বড় অংশ গ্রামীণ বনকে কেন্দ্র করে বাঁচে। কারণ এই বন গুলোতে টিকে থাকে দেশি বিভিন্ন প্রজাতির বুনো গাছ, যারা আশ্রয়, খাদ্য ও জীবনধারণের বিভিন্ন উপাদান সরবারহ করে তৈরি করে এক অনন্য প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই বাগান গুলো হারিয়েছে তার প্রাকৃতিক অবস্থা এবং দেশি গাছ, তরু, লতা গুল্ম।
২০১৫ সালের আইইউসিএন বাংলাদেশের মূল্যায়ন অনুযায়ী আমাদের একটি গবেষণা থেকে বিশ্লেষণ করে পাই, বাংলাদেশের বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বন্যপ্রাণীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত এলাকার বাইরে বাস করে। এই প্রাণীদের মধ্যে আছে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাংশাসী স্তন্যপায়ী প্রাণী; যেমন—মেছো বিড়াল, খেঁকশিয়াল, উদ বিড়াল, পাশাপাশি রেসাস বানর, যশোরের হনুমান, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বিন্টুরং, বুনোখরগোশ গাঙ্গেও শুশুক, হাতি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
পাখিদের মধ্যে, সংরক্ষিত এলাকার বাইরে যারা আছে তাদের বড় অংশ জলাভূমি নির্ভর। আর আমাদের জলাভূমির দেশজ জলজ উদ্ভিদ আজ হুমকির মুখে। যার ফলে জীবন ধারণের উপকরণ হারাচ্ছে এই পাখিরা। ধলাগলা মানিকজোড়, রাঙা মানিকজোড়, কালা মানিকজোড়, কালা তিতির, কালোমাথা কাস্তেচরা, দেশি গাঙ চোষা, ছোট মদনটাক, ছোট ধলাকপাল রাজহাঁস, পালসি কুড়া ঈগল উল্লেখযোগ্য। আর জঙ্গল গুলোকে কেন্দ্র করে আছে, হলদে চোখ ছাতারে, কাঠ ময়ূর, রাজ ধনেশ।
জলাভূমিগুলোকে কেন্দ্র করে আরও বেঁচে আছে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা কচ্ছপ, ঘড়িয়াল, গুইসাপ, অজগর জাতীয় সরীসৃপ এবং ব্যাঙ।
এই প্রাণীগুলোর একটি বড় অংশ নির্ভর করে গ্রামীণ বন, শহুরে সবুজ অঞ্চল, জলাভূমির আশপাশের গাছপালা এবং মানুষের আশেপাশের ছোট ছোট প্রাকৃতিক আবাসস্থলের উপর। অর্থাৎ শুধু জাতীয় উদ্যান নয়, আমাদের বাড়ির উঠান, রাস্তার পাশের গাছ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবুজ পরিবেশ, ফসলের ক্ষেত, চরাঞ্চল, মাঠ-প্রান্তর, এবং গ্রামীণ বনও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু যখন দেশীয় গাছ কেটে বিদেশি প্রজাতির একক বনায়ন করা হয়, তখন বন্যপ্রাণীরা ধীরে ধীরে খাদ্য ও আশ্রয় হারিয়ে ফেলে। অনেক পাখি গ্রামাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ তারা আর উপযুক্ত ফলজ বা পোকামাকড় সমৃদ্ধ গাছ খুঁজে পাচ্ছে না। প্রজাপতি ও মৌমাছির মতো পরাগায়নকারী পতঙ্গ কমে যাওয়ার ফলে কৃষি ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এখন সময় এসেছে আমাদের বনায়ন নীতিতে বড় পরিবর্তন আনার। উন্নয়ন ও সৌন্দর্যায়নের নামে বিদেশি প্রজাতিনির্ভর বনায়নের পরিবর্তে দেশীয় উদ্ভিদভিত্তিক প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রাকৃতিক পুনর্জন্মকে উৎসাহিত করতে হবে এবং ধীরে ধীরে বিদেশি আগ্রাসী গাছ অপসারণ করে দেশীয় বৃক্ষরোপণ বাড়াতে হবে।
রাস্তার পাশে, পার্কে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সরকারি স্থাপনায় এবং গ্রামীণ এলাকায় বট, অশ্বত্থ, কদম, হিজল, করচ, জলপাই, জাম, অর্জুন, চালতা, বরুণ, পাকুড়, ছাতিম, বেত ও অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে বোঝাতে হবে যে, দেশীয় গাছ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নয়; এটি বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডার, নিরাপদ আবাস এবং ভবিষ্যৎ পরিবেশ সুরক্ষার ভিত্তি।
বাংলাদেশের প্রকৃতি কেবল মানুষের জন্য নয়; এটি লক্ষ কোটি প্রাণের আবাসভূমি। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু বন রক্ষা নয়, বরং একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা করা। বিদেশি আগ্রাসী গাছের একক বনায়ন দিয়ে কখনোই প্রকৃত বন তৈরি করা সম্ভব নয়। একটি প্রকৃত বন তখনই গড়ে ওঠে, যখন সেখানে দেশীয় বৃক্ষ, পাখি, পতঙ্গ, প্রাণী ও অণুজীব একসঙ্গে একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে।
আসুন, আমরা দেশীয় গাছ লাগানোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। আমাদের শহর, গ্রাম, বন ও জলাভূমিকে আবারও দেশীয় লতা-গুল্ম ও বৃক্ষের সবুজে ফিরিয়ে আনি। প্রকৃতি মা ফিরে পাক তার নিজস্ব পরিচয়, আর সেই মায়ের বুকে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাক বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী।
দেশি গাছে বাংলাদেশ সাজাই,
বন্যপ্রাণীর আবাস বাঁচাই।
লেখক: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ (বন্যপ্রাণী ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
