জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়নে ২৯ সদস্যের সমন্বয় কমিটি গঠন, পুনর্বাসনের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে পরিকল্পিত ও সুসংহত উন্নয়নের লক্ষ্যে 'জঙ্গল সলিমপুর উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি' নামে ২৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১১ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কোর কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) সভাপতি করে এই কমিটি গঠন করা হয়। সোমবার (১ জুন) চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত টিবিএসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই কমিটি উদ্ধারকৃত বিশাল খাস ভূমিতে নিরাপত্তা জোরদার, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অবকাঠামো নির্মাণ এবং অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসার পর এই সমন্বয় কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। গত মার্চ মাসে কমিটির প্রথম সভায় এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সম্ভাবনা নিয়ে পর্যালোচনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও র্যাব ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর প্রতিনিধির পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ এবং এলজিইডির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত রবিবার (৩১ মে) জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকা পরিদর্শন এবং বিভাগীয় প্রধানদের সাথে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, জঙ্গল সলিমপুরে একটি শক্তিশালী রোড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। তিনি বলেন, "দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটিয়ে এখান থেকে শুধু সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।"
স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "বিভিন্ন কারণে যারা এখানে এসে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছেন বা স্থানান্তরিত হয়েছেন, তাঁদের কাউকেই আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না। বাসিন্দাদের টেকসই পুনর্বাসনের জন্য সরকার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।" তিনি উচ্ছেদ সংক্রান্ত কোনো অপপ্রচারে কান না দিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানান।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সলিমপুর ইউনিয়নের সঙ্গে সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ ঘটিয়ে একটি আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তিনি জানান, ড্রোন চিত্র ও মানচিত্র পর্যালোচনা করে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর অবকাঠামো এবং সেনানিবাসের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির কাজ চলছে। পাশাপাশি বায়েজিদ লিংক এলাকার খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের ঝুলে থাকা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরের জমিটি মূলত ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধি মোতাবেক আনুষ্ঠানিক ভূমি বন্দোবস্তের প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, "জায়গাটি সরকারি খাসজমি হওয়ায় এর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্তের বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে সরকারের লিখিত নির্দেশনা পাওয়ার পর জেলা প্রশাসন পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে। এখন পর্যন্ত বিষয়টি মৌখিক পর্যায়ে রয়েছে। সরকার সাধারণত সব সিদ্ধান্ত লিখিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে থাকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা বা চাহিদা আসলে জেলা প্রশাসন ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে।"
উল্লেখ্য, গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির ৩ হাজার ২০০ সদস্যের এক বিশাল যৌথ অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। নিরাপত্তার জন্য আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনে ১৩০ সদস্যের একটি যৌথ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। তবে গত ২৪ মে দিবাগত রাতে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ওই ক্যাম্পে আকস্মিক হামলা চালায় এবং বুলডোজার দিয়ে চৌকির দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়। যৌথ বাহিনীর যাতায়াত বাধাগ্রস্ত করতে চারটি স্থানে রাস্তাও কেটে দেয় তারা। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মো. ইয়াসিনসহ ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
