তিস্তার পানি বেড়ে প্লাবিত চার জেলার জনপদ
কদিনের বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে।ফলে লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার বেশ কটি উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য জনপদ। ডুবে গিয়েছে ফসল। আর পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে বাড়তে থাকে পানি। মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাত ১টার দিকে সেটি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে প্লাাবিত হয় লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল।জেলার তিস্তা-তীরবর্তী উপজেলা-- হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম ও আদিতমারীর ডজন খানেক গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। সদর উপজেলার তিস্তা-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে।জেলার প্রায় ৪ হাজার পরিবার এখন পানিবন্দী।
লালমনিরহাট এলাকায় পরে পানি কমতে থাকে। কিন্তু তিস্তার ভাটি অঞ্চল, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলায় পানির বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলেও ঢুকছে পানি। সেখানে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।
নদীর পানি বাড়তে থাকায় নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই, পূর্ব ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়।
ইউএনবির এ-সংক্রান্ত এক খবরে জানা যায়, পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ খান জানান, তার ইউনিয়নের ঝাড়শিঙ্গেশ্বর গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবার এখন বন্যাকবলিত।
একইভাবে উপজেলার নদীতীরবর্তী ৫টি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে।তবে, দুপুরের পর থেকে পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ওই সব গ্রামের পানি নামতে শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টের পানি ছিল বিপদসীমার ওপর
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় রয়েছে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ। বুধবার ভোর ৬টায় ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।অবশ্য এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে সকাল ৯টায় ১৮ সেন্টিমিটার এবং দুপুর ১২টায় ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়।
এভাবে কমতে কমতে বিকাল তিনটায় দেখা যায়, পানি সকালের চেয়ে ২২ সেন্টিমাটর কমে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে।
ওই পয়েন্টে নদীর পানিপ্রবাহের বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ মিটার।
বন্যা পূর্বাভাষ ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ঢলের পানিপ্রবাহ সামাল দিতে আপাতত তিস্তা ব্যারেজের সবকটি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।রাতে পানি-প্রবাহ আরও কমতে পারে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
প্রশাসনের বক্তব্য ও প্রস্তুতি
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান শওকত আলী বীর বিক্রম জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এ ব্যাপারে জানানো হয়েছে। কিন্ত বরাদ্দ না থাকায় কোনো রকম কাজ শুরু হচ্ছে না।
লালমনিরহাটে পানি নেমে যাওয়ায় বিষয়টির ইতিবাচক প্রভাবের কথা ভাবছেন উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিশ্বম্ভর রায়। তিনি বলেন, “বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তাতে এ বন্যায় আমনের বেশ উপকার হবে। পানিতে পোকামাকড় মরে যাওয়ার পাশাপাশি পলি পড়বে ধানক্ষেতে।”
অবশ্য কর্মকর্কতার এ বক্তব্যের বিপরীতে উপস্থিত কৃষকদের কথা হল, “বাহে, খালি কি পইল (পলি) পইড়বে? বালাও (বালু) তো পাইড়ব্যার পায়। তখন হামার কী অবস্থা হইবে আল্লায় জানে।"
লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলী হায়দারও বন্যার পানি স্থায়ী না হওয়ায় খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে মনে করছেন। তবু সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে চাহিদা দিলে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে। কেউ ত্রাণের জন্য চাহিদা না দেওয়ায় বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা ত্রাণ তহবিলে ১৪৫ মেট্রিক টন জিআর চাল ও ২ লাখ ১৪ হাজার টাকা মজুদ রয়েছে বলেও জানালেন তিনি।
লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ে উজানের ঢেউ ও বৃষ্টিপাতের ফলে পানিপ্রবাহ বাড়লেও বন্যার আশঙ্কা নেই বলে মনে করছে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রও।
এই সর্বনাশেও পৌষ মাস নদীর চিরচেনা রূপে
তিস্তায় পানিপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় শুকিয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় নদীটি ফিরে পেয়েছে দু’কুল ছাপানো রূপ। এমনিতে হেঁটে পার হওয়া যায় এ নদী। এখন তিস্তায় চলতে শুরু করেছে নৌকা। হাঁকডাক বেড়েছে মাঝি-মাল্লাদের। কর্মব্যস্ততা দেখা দিয়েছে তিস্তাপাড়ের জেলে পরিবারগুলোতে।
চাষীদের যা ক্ষতি হল
তিস্তায় পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের সবজি চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আগাম সবজি চাষ করেছিলেন যারা, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবেন।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার গোবর্দ্ধন পাসাইটারী তিস্তা চরাঞ্চলের কৃষক মানিক মিয়া জানান, নদীর কিনারে জেগে ওঠা ৩ দোন (২৭ শতাংশে এক দোন) জমিতে আগাম জাতের আমন ধান রোপণ করেন তিনি। সেই ক্ষেতের কিছু অংশ নদী-ভাঙনে বিলীন হলেও বাকি অংশ পানিতে ডুবে আছে। দ্রুত পানি নেমে গেলে ধানক্ষেতের উপকার হবে। কিন্তু বেশি সময় ডুবে থাকলে ধানক্ষেত পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ওদিকে একই জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের চর হলদিবাড়ি গ্রামের আবদুর রহমান ও আনেচ আলী জানান, তিস্তা শুকিয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের জমিতে তামাকসহ বিভিন্ন সবজি চাষের জন্য জমি তৈরি করে রেখেছেন তারা। ক’দিনের বৃষ্টির কারণে সবজি বীজ বুনেননি কেবল।এরই মধ্যে নদীতে পানি বেড়ে জমি ডুবে গেছে। পানি নেমে গেলে আবারও জমি কর্ষণ করে সবজি বীজ বুনতে হবে তাদের।
কী কারণে ফি বছর এই ক্ষতি
নদী নিয়ে কাজ করে উন্নয়ন সংগঠন ‘জীবিকা’। এর পরিচালক মানিক চৌধুরী তিস্তার পানি বাড়লেই গ্রামের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বললেন, তিস্তায় ডালিয়া পয়েন্টে ব্যারেজ নির্মাণ হলেও কখনও এ নদী খনন করা হয়নি। ফলে পলি ও বালু জমে তিস্তার তলদেশ ভরাট হয়ে আছে। এ কারণে সামান্যতেই তিস্তার পানি দু’কুল ছাপিযে লোকালয় প্লাবিত করে। সৃষ্টি হয় বন্যার।
তিনি জানালেন, তিস্তা ভাঙন-প্রবণও হয়ে উঠছে। নদীতে পানি বাড়লে যেমন ভাঙে, কমতে শুরু করলেও তেমন। ফলে প্রতি বছর নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ।
