লন্ডন অচল করে দেওয়া সাইবার হামলায় জড়িত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হ্যাকারের কারাদণ্ড
লন্ডনের লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম গণপরিবহন সংস্থা ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)-এর ডিজিটাল অবকাঠামো কয়েক দিনের জন্য কার্যত অচল করে দেওয়া সাইবার হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই তরুণকে কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের একটি আদালত।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি থালহা জুবায়ের (২০) ও তার ব্রিটিশ সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্সকে (১৮) সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের উলউইচ ক্রাউন কোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আদালত এ রায় দেন।
আদালতে তাদের 'কম্পিউটার পাগল নিঃসঙ্গ তরুণ' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তারা 'স্ক্যাটার্ড স্পাইডার' নামে পরিচিত একটি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে হামলাটি চালিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে চালানো এই সাইবার হামলায় কয়েক মাস ধরে টিএফএলের অনলাইন সেবা ব্যাহত হয়। এতে লাখো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয় এবং টিএফএলের ২৭ হাজার কর্মীকে সরাসরি উপস্থিত হয়ে নিজেদের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হয়।
টিএফএলের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার হামলায় সংস্থাটির সরাসরি ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড। এছাড়া সেবা ব্যাহত হওয়ায় আরও ১ কোটি পাউন্ড আয় হারিয়েছে তারা।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) জানিয়েছে, দেশটিতে তরুণ হ্যাকারদের উত্থান এখন জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
হামলার সময় ফ্লাওয়ার্সের বয়স ছিল ১৭ বছর এবং জুবায়েরের বয়স ছিল ১৮ বছর। তারা ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট বিকেল ৫টায় টিএফএলের সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করেন। তারপর ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক দিন ধরে হ্যাকাররা টিএফএলের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ চালায়।
তদন্তকারীদের মতে, একপর্যায়ে তারা পুরো সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে আরও বড় ক্ষতি এড়াতে টিএফএল তাদের পুরো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি সংস্থাটির বিভিন্ন সেবাও ব্যাহত হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, হামলার সময় ওয়েন ফ্লাওয়ার্স পুরো হ্যাকিং কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং ১৬ ঘণ্টাব্যাপী এই সাইবার হামলা অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারও করেছিলেন। আর থালহা জুবায়ের সেই ভিডিও তার বন্ধুদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেন। লন্ডনের পরিবহনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পেরে তিনি গর্বও প্রকাশ করেন।
এরপর তারা ওই তালিকায় লন্ডনের বিভিন্ন তারকার ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজে দেখেন এবং পরে ব্যাংকিং তথ্যেও প্রবেশের চেষ্টা করেন। পরে ফ্লাওয়ার্স মজা করে লিখেছিলেন, 'স্ক্যাটার্ড স্পাইডার লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে জাল বুনছে।'
স্ক্যাটার্ড স্পাইডার যুক্তরাজ্যের খুচরা বিক্রেতা মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার ও কো-অপসহ আরও বহু সাইবার হামলার সঙ্গেও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গত দুই বছরে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও ফিনল্যান্ডে স্ক্যাটার্ড স্পাইডার-সংশ্লিষ্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনায় বেশ কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আদালতে বলা হয়, দুই আসামিই ছিলেন নিঃসঙ্গ এবং অধিকাংশ সময় তদারকি ছাড়াই অনলাইনে কাটাতেন। সাজা ঘোষণার সময় বিচারক তাদের কম বয়স ও অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি শাস্তি লঘু করার কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন।
পুলিশ জানায়, ওয়েন ফ্লাওয়ার্স খুব কমই বাড়ির বাইরে যেতেন। ২০২৩ সালে ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রথম সাইবার অপরাধের জন্য সতর্কবার্তা পান। এরপর আরও কয়েকটি সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে টিএফএল হামলার ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হ্যাকিং করছিলেন। তদন্তে তার কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সিও জব্দ করা হয়।
অন্যদিকে, থালহা জুবায়েরের পরিবার বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে গিয়েছিল। ১০ বছর বয়সে প্রথম ল্যাপটপ পাওয়ার পর তিনি প্রোগ্রামিং শেখেন এবং ১৩ বছর বয়স থেকেই অনলাইনে অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। ১৪ বছর বয়সে প্রথম গ্রেপ্তার হন। ২০২৩ সালে 'ল্যাপসাস$' হ্যাকার গোষ্ঠীর হয়ে এনভিডিয়া ও বিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার দায়ে 'ইয়ুথ রিহ্যাবিলিটেশন অর্ডার' পান। তার বিরুদ্ধে হ্যাকিং, প্রতারণা ও হয়রানিসংক্রান্ত ২২টি আগের দণ্ড রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাইবার হামলার ঘটনায় তিনি অভিযুক্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব হামলায় তার ও সহযোগীদের কাছে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার মুক্তিপণ গেছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, কোটি কোটি টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নিলেও ফ্লাওয়ার্স ও জুবায়েরের মূল উদ্দেশ্য অর্থ নয়, বরং অনলাইনে পরিচিতি ও কুখ্যাতি অর্জন ছিল।
