নিজেদের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই আবারও রাজপথে নেপালের জেন-জিরা, কিন্তু কেন?
রাইড শেয়ারিং অ্যাপের এক চালকের আত্মহননের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নেপালে আবারও গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে কাঠমান্ডু পুলিশ এক চালকের মোটরবাইকের চাকা লক করে দেওয়ার প্রতিবাদে ওই তরুণ নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর নেপালের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে 'জেন-জি' জনসংখ্যা আবারও কাঠমান্ডুর রাজপথে নেমে এসেছে। তারা প্রধানমন্ত্রী এবং কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র (বালেন) শাহর নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে জবাবদিহি ও বিচার দাবি করছে। অথচ এক বছরেরও কম সময় আগে এই তরুণদের বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন বালেন শাহ।
নেপালি সংবাদমাধ্যম 'দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ বছর বয়সী গণেশ নেপালি গত বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুর একটি সড়কে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় পুলিশ এসে আকস্মিকভাবে তাঁর মোটরবাইকের চাকায় তালা (হুইল লক) লাগিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের এই আচরণের প্রতিবাদে এবং চরম হতাশায় গণেশ নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও গত শুক্রবার তিনি মারা যান।
এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। গত রবিবার শত শত তরুণ কাঠমান্ডুর প্রশাসনিক কেন্দ্র 'সিংদরবার সচিবালয়'-এর সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— 'গরিবের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো' এবং 'মানবাধিকারের সম্মান দাও'। এছাড়া বালেন শাহর সরকার নদী তীরের যেসব বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করছে, তাদের পুনর্বাসন ও বেআইনি গ্রেপ্তার বন্ধের দাবিও জানানো হয়।
বালেন শাহর 'আক্রমণাত্মক' অবস্থান
২০২২ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বালেন শাহর অধীনে কাঠমান্ডু মিউনিসিপ্যাল পুলিশের আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফুটপাত ও ভাসমান বাজার দখলমুক্ত করতে এবং নদী তীরের বস্তি উচ্ছেদে বালেন শাহর 'হার্ডলাইন' বা কঠোর অবস্থান জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো সহিংস রূপ নিয়েছে, যা মূলত শহরের দরিদ্রতম বাসিন্দাদের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইন যা বলছে
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন তাদের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রাজু চাপাগাইন বলেন, "আইনি কাঠামো অনুযায়ী মিউনিসিপ্যাল পুলিশকে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ বা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাদের মূল দায়িত্ব হলো আলোচনার মাধ্যমে প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করা।"
তিনি আরও বলেন, "ট্রাফিক সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে তা ট্রাফিক পুলিশের কাছে পাঠানোর কথা। কিন্তু আমরা দেখছি মিউনিসিপ্যাল পুলিশ হকারদের তাড়া করছে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করছে এবং নাগরিকদের ওপর শারীরিক হামলা চালাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।"
নেপালের সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার মিউনিসিপ্যাল পুলিশ গঠন করতে পারে এবং ২০২৩ সালে বালেন শাহর আমলেই 'কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন সিটি মিউনিসিপ্যাল পুলিশ অ্যাক্ট' পাস হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আইনেও পুলিশকে লাঠিচার্জ বা কাউকে আটক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাদের দায়িত্ব হলো সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, পার্কের দেখাশোনা, পরিচ্ছন্নতা তদারকি এবং সাংস্কৃতিক উৎসবে সহায়তা করা।
নেপাল পুলিশের সাবেক ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল পূর্ণচন্দ্র জোশী জানান, মিউনিসিপ্যাল পুলিশ কেবল একটি সহায়তাকারী মেকানিজম। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তবে তাদের নেপাল পুলিশের সাহায্য নেওয়ার কথা, তারা স্বাধীনভাবে বলপ্রয়োগ করতে পারে না।
আইনি সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বালেন শাহর প্রশাসনের অধীনে দিনমজুর ও হকারদের ওপর বলপ্রয়োগের অসংখ্য ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই আক্রমণাত্মক সুশাসনের মডেলটি বর্তমানে নেপালের অন্যান্য মিউনিসিপ্যালিটিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
