জলবায়ু পরিবর্তনে এভারেস্টের আরও উঁচুতে উঠে যাচ্ছে সাপ, বাড়ছে দংশন; অ্যান্টিভেনমের সংকট
মাউন্ট এভারেস্ট বা হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে বিষধর সাপের উপদ্রব হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। আর সাপের এই নতুন উপদ্রব মোকাবিলায় এভারেস্টের চারপাশের হাসপাতালগুলো এখন অ্যান্টিভেনম সংগ্রহ করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
নেপালের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাধারণত দেশটির দক্ষিণের সমতল অঞ্চলে বিষধর সাপের উপদ্রব বেশি থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন পাহাড়ি অঞ্চলেও সাপ ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে কিং কোবরা বা শঙ্খচূড়সহ বিভিন্ন বিষধর সাপ পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, যা হিমালয়ে আসা পর্যটক ও পর্বতারোহীদের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে।
মাউন্ট এভারেস্টের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত সোলাখুম্বু জেলার সোতাং প্রাথমিক হাসপাতালটি সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষেধক সরবরাহের জন্য সরকারের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
সোতাং হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. পবন মোকতান বলেন, 'নেপালের নতুন বছর অর্থাৎ গত ১৪ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত আমাদের হাসপাতালে প্রায় ৩০ জন সাপে কাটা রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তাদের মধ্যে দুজনকে বিষধর সাপ কামড়েছিল এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের কাঠমান্ডুতে স্থানান্তর করা হয়েছে।'
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ৫৬২ ফুটেরও (২ হাজার মিটার) বেশি উচ্চতায় বসবাসকারী এভারেস্ট অঞ্চলের মানুষের সেবা দেওয়া এই হাসপাতালটি এখন অধীর আগ্রহে অ্যান্টিভেনমের অপেক্ষা করছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নেপালের অন্যান্য পাহাড়ি জেলার হাসপাতালগুলো থেকেও অনুরুপ আবেদন আসছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সাপের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রের বাইরে বিষধর সাপের কামড়ের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।
নেপালের জাতীয় 'স্নেকবাইট গাইডলাইন' তৈরিতে অবদান রাখা বিশিষ্ট বিষবিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক অধ্যাপক সঞ্জীব কুমার শর্মা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, 'আমরা দেখছি সমতল অঞ্চলের সাপগুলো এখন পাহাড়ি অঞ্চলে চলে আসছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সম্ভবত তাদের জন্য পাহাড়ের পরিবেশকে আরও বাসযোগ্য করে তুলছে। তবে ক্রমবর্ধমান যাতায়াত ব্যবস্থা এবং মানুষের বাসস্থানের পরিবর্তনও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।'
গত বছর তিনি নিজে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি একটি বিষধর পিট ভাইপার সাপের কামড়ের শিকার হওয়া একজন জাপানি ট্রেকারকে চিকিৎসা দিয়েছিলেন। ওই পর্যটক সুস্থ হয়ে উঠলেও ডা. শর্মা বলেন, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে বিষধর সাপের কামড় এখন আর কেবল সমতল অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
নেপালে সাপে কাটা অন্যতম একটি অবহেলিত স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। ডা. শর্মা বলেন, 'সাপে কাটার বিষয়টি আমাদের দেশে খুবই কম রিপোর্ট করা হয়। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালে সাপে কেটে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারান।'
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নেপালের আবহাওয়া বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ি এলাকার তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বিষধর সাপগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় বেঁচে থাকতে পারছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও উঁচু অঞ্চলের ঢালগুলোতে এই প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট।
ডা. শর্মা সতর্ক করে বলেন, 'উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, বিশেষ করে শিশু, যারা মাঠে কাজ করেন এবং যারা খড়ের বা মাটির ঘরে বাস করেন, তাদের এই নতুন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।'
গত বছর বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারীরা মাউন্ট এভারেস্টের কাছাকাছি এলাকা থেকে ১০টি বিষধর সাপ উদ্ধার করেছিল, যার মধ্যে ৯টিই ছিল রাজকীয় কিং কোবরা বা শঙ্খচূড়।
ডা. শর্মা বলেন, 'যদি পাহাড়ি অঞ্চলের সাপের বিষের উপযুক্ত অ্যান্টিভেনম তৈরি বা সরবরাহ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
নেপাল সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) 'স্নেকবাইট রোডম্যাপ'-এর সঙ্গে সংগতি রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে সাপে কেটে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের হার অর্ধেক করার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে হিমালয়ের চূড়ায় সাপের এই নতুন বসতি স্থাপন সেই লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এক নতুন এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
