ভারতের গোয়ার চেয়েও বড়, রাশিয়ার চেয়েও প্রাচীন—৪০ বছর পর হারিয়ে গেল বিশ্বের বৃহত্তম হিমশৈল ‘এ২৩এ’
একসময় লন্ডন শহরের প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের এবং প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন ওজনের বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইসবার্গ বা হিমশৈল 'এ২৩এ'- এখন আর কোনো উপগ্রহের ছবিতে দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত এপ্রিলে এটি দেখা গিয়েছিল। এরপর এর অবশিষ্ট শেষ টুকরোগুলোও ভেঙে আলাদা হয়ে গলে যাওয়ায় হিমশৈলটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।
'এ২৩এ'- ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হিমশৈলগুলোর একটি। ১৯৮৬ সালে ফিলশনার আইস শেলফ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এটি প্রায় ৪০ বছর টিকে ছিল। সর্বোচ্চ অবস্থায় এর আয়তন ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার, যা লন্ডনের প্রায় দ্বিগুণ এবং নিউইয়র্ক সিটির প্রায় তিন গুণ।
এটি অ্যান্টার্কটিকার উপকূল ও দক্ষিণ মহাসাগর পেরিয়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার ভেসে যায়। তবে উষ্ণ সমুদ্রস্রোত ও উষ্ণ বায়ুর কারণে ধীরে ধীরে বরফ গলে যেতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে এর অবসান ঘটে, অনেকটা একটি নক্ষত্রের মৃত্যুর মতো।
২০২৬ সালের এপ্রিলে নাসার 'এনওএএ-২১' স্যাটেলাইট দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে হিমশৈলটির শেষ মুহূর্তের ছবি তোলে। তখন এটি এতটাই ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল যে পুরো হিমশৈলের ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।
এর আগে ২০২৬ সালের মার্চে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর আয়তন কমে ১৭০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে, যা মূল আয়তনের মাত্র ৫ শতাংশ।
তখনই ধারণা করা হয়েছিল, এর শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।
ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর পোলার অ্যান্ড ওশেনিক রিসার্চের পরিচালক থাম্বান মেলোথ বলেন, 'এটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দশক আগে বিচ্ছিন্ন হওয়া একটি হিমশৈলের গল্প এটি। আর বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় এটি গোয়া রাজ্যের পুরো আয়তনের চেয়েও বড় ছিল।'
'এ২৩এ'-এর যাত্রা শুরুর কথা
'এ২৩এ' -এর জন্ম অ্যান্টার্কটিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ফিলশনার-রোনে আইস শেলফে। ১৯৮৬ সালে 'ক্যালভিং' নামে পরিচিত প্রক্রিয়ায় এটি মূল বরফস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
অ্যান্টার্কটিকার যে অঞ্চলে এটি পাওয়া গিয়েছিল, তার ভিত্তিতেই এর নাম রাখা হয় 'এ২৩এ'।
বিশাল আকারের পাশাপাশি আরেকটি কারণে এটি আবহাওয়াবিদ, সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এর কারণ এটি ছিল বিশ্বের প্রথম দিকের আবিষ্কৃত বিশাল হিমশৈলগুলোর একটি।
নাসার ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, 'পৃথিবী পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির অগ্রগতির সময়জুড়েই 'এ২৩এ'-এর এর জীবনচক্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং ল্যান্ডস্যাট কর্মসূচি এর পুরো যাত্রার বিস্তারিত ছবি ধারণ করেছে।
বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর প্রথম ৩০ বছর এটি ওয়েডেল সাগরের কাছে সমুদ্রতলে আটকে ছিল, যেখানে এটি প্রথম বরফস্তর থেকে আলাদা হয়েছিল।
মেলোথ বলেন, অনেক হিমশৈলের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে। কারণ সেগুলো সমুদ্রতলে আটকে থাকে এবং এত বড় হয় যে শুধু সমুদ্রস্রোতের ধাক্কায় সহজে সরে না।
তবে ২০২২ সালে 'এ২৩এ'- নড়াচড়া শুরু করলে তা বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে।
নাসার মডিস উপগ্রহ ওয়েডেল সাগর ছাড়ার পর এর গতিপথ অনুসরণ করে। অন্য অ্যান্টার্কটিক হিমশৈলের মতো এটিও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে ভেসে যায়।
শেষ পর্যন্ত বিলীন হওয়ার আগে 'এ২৩এ'-এর যাত্রায় নানা ঘটনা ঘটে। একবার এটি দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপের একটি পেঙ্গুইন অভয়ারণ্যের সঙ্গে প্রায় সংঘর্ষের মুখেও পড়েছিল।
'এ২৩এ' কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
যাত্রাপথের বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা 'এ২৩এ'-এর গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং কাছ থেকে এটি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
২০২৬ সালের মে মাসে একটি ফরাসি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান 'আইস নোম্যাডস' নামে দেড় ঘণ্টার একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করে। এতে 'এ২৩এ'- হিমশৈলের জীবন এবং সমুদ্রজুড়ে তার দীর্ঘ যাত্রার গল্প তুলে ধরা হয়।
তবে 'এ২৩এ' -কে ঘিরে এই আগ্রহ শুধু এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের কারণে নয়।
ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর পোলার অ্যান্ড ওশেনিক রিসার্চের পরিচালক থাম্বান মেলোথ বলেন, 'হিমশৈল গবেষণা লজিস্টিক ও বৈজ্ঞানিক—উভয় কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা হিমশৈল ও আইস শেলফের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করি, কারণ পুরো অ্যান্টার্কটিক বরফস্তরের অবস্থা এর ওপর নির্ভরশীল।'
তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে 'এ২৩এ'- শনাক্ত হওয়ার কারণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের গবেষণা কেন্দ্র 'দ্রুঝনায়া-১'- হিমশৈলটির ওপর স্থাপিত ছিল। হিমশৈলটি মূল বরফস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হলে গবেষণা কেন্দ্রটিও ভেসে যায়।
মেলোথ জানান, ভারতের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ভারতের প্রথম অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কেন্দ্র 'দক্ষিণ গঙ্গোত্রী'- একটি আইস শেলফের ওপর নির্মিত ছিল। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সেটি তুষারের নিচে চাপা পড়ে যায়।
তিনি বলেন, 'এখন পৃথিবী পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এত উন্নত হয়েছে যে হিমবাহ ও হিমশৈলের গতিবিধি সহজেই জানা যায়। তবে ১৯৮০-এর দশকে অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণা কেন্দ্রই ছিল অবস্থান নির্ধারণের প্রধান চিহ্ন। সেটি হারিয়ে গেলে বরফে আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ এলাকায় পথ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।'
বিজ্ঞানীদের মতে, হিমশৈলগুলো পুরোপুরি অ্যান্টার্কটিকার মিঠাপানির বরফ দিয়ে গঠিত। এসব বিশাল বরফখণ্ড লবণাক্ত সমুদ্রে গলে গেলে সমুদ্রের রাসায়নিক গঠন বদলে যায়, পুষ্টি উপাদান ছড়িয়ে পড়ে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যেও পরিবর্তন আসে।
ব্রিটিশ গবেষণা জাহাজ 'আরআরএস স্যার ডেভিড অ্যাটেনবার্গ' ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে 'এ২৩এ'-এর কাছে গিয়ে এর গলিত পানির নমুনা সংগ্রহ করে। এ গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, হিমশৈলের মিঠাপানি সামুদ্রিক পরিবেশে কী প্রভাব ফেলে, তা জানা।
নাসার ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'এ২৩এ'-এবং অন্যান্য হিমশৈল থেকে পাওয়া ছবি ও তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সমুদ্রস্রোত থেকে শুরু করে সমুদ্রতলের গঠন—কোন কোন বিষয় হিমশৈলের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে এখন আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
'এ২৩এ'- মেরু অঞ্চল ও সমুদ্রবিষয়ক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
এদিকে বিজ্ঞানীরা এখনও অ্যান্টার্কটিকায় ভাসমান অন্যান্য বড় হিমশৈল পর্যবেক্ষণ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে 'ডি১৫এ'- যা গত এপ্রিলে 'এ২৩এ'- বিলীন হওয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিমশৈলের স্বীকৃতি পেয়েছে।
