মরুর বুকে হাজারো কোটি গাছ লাগিয়েছে চীন, প্রাকৃতিক বনের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে রোপণ করা গাছ
চীনের বিশাল পুনঃবনায়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে রোপণ করা গাছগুলো—প্রাকৃতিক বনের গাছের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে বলে এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রতি এই রোপণ করা গাছগুলো সম্ভবত বেশি জোরালো সাড়া দিচ্ছে, যার কারণে এমনটি ঘটছে।
চীন খুব দ্রুত সবুজে ছেয়ে যাচ্ছে। গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমির বিস্তার রোধ করতে দেশটির 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০০ কোটি গাছ রোপণ করা হয়েছে। চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে আরও ৩ হাজার ৪০০ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।
এই নতুন বনগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। তবে এগুলো ঠিক কীভাবে প্রাকৃতিক বনের চেয়ে আলাদা, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে বিজ্ঞানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম লাইভ সায়েন্সকে জানিয়েছেন গবেষণার প্রধান লেখক ও চীনের শেনজেনে অবস্থিত পেকিং ইউনিভার্সিটির ল্যান্ডস্কেপ ইকোলজিস্ট ইউহাং লুও।
প্রজাতির বৈচিত্র্য, গাছের ঘনত্ব এবং বয়সসহ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বনের মধ্যকার বিভিন্ন পার্থক্য কীভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি সাড়া দেয়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন লুও ও তাঁর সহকর্মীরা।
ইউহাং লুও বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশলে কৃত্রিম বা মানবসৃষ্ট বন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বৈশ্বিক ইকোসিস্টেমের বেশিরভাগ মডেলে বনের প্রকারভেদের মধ্যে পার্থক্য করা হয় না বা বয়সজনিত গতিশীলতাকে পর্যাপ্তভাবে তুলে ধরা হয় না। তাই আমরা অনুভব করেছি, এই উপাদানগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করে তা স্পষ্ট করা জরুরি—কেবল বৈজ্ঞানিক ধারণার জন্য নয়, বরং বাস্তব বিশ্বের বননীতি এবং কার্বন গণনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা মডেল ও অনুমানগুলোর উন্নতির জন্যও এটি প্রয়োজন।"
মূলত মানুষের তৈরি বা রোপণ করা বনগুলোই হলো কৃত্রিম বন, যেমনটি দেখা গেছে 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' প্রকল্পে। অন্যদিকে, মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে যে বন গড়ে ওঠে, তা-ই হলো প্রাকৃতিক বন।
বিভিন্ন ধরনের বনের বৃদ্ধির গতি নির্ধারণ করতে গবেষকেরা স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে 'লিফ এরিয়া ইনডেক্স' (পাতার পরিমাপ সূচক) ট্র্যাক করেছেন। এটি বনের উপরিভাগের পাতার ঘনত্ব (ক্যানোপি ডেনসিটি) এবং কার্বন শোষণের একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এতে এক চমকপ্রদ পার্থক্য দেখা গেছে: গ্রেট গ্রিন ওয়াল প্রকল্পের মানবসৃষ্ট বা রোপণ করা বনগুলোর পাতার পরিধি প্রাকৃতিক বনের চেয়ে ৬৬ শতাংশ দ্রুত বেড়েছে।
এই পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো, রোপণ করা বনগুলো গড়ে প্রাকৃতিক বনের তুলনায় অনেক কম বয়সী—আর বয়স্ক গাছের চেয়ে কচি বা তরুণ গাছ দ্রুত বাড়ে। তবে সমবয়সী এবং একই ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা বনের মধ্যে তুলনা করার পরও দেখা গেছে, রোপণ করা বনগুলো ৪ দশমিক ৬ শতাংশ দ্রুত বেড়েছে। মিশ্র এবং চিরহরিৎ বনের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যের হার ছিল আরও বেশি স্পষ্ট।
এর বড় একটি কারণ হলো এই মানবসৃষ্ট বনের ব্যবস্থাপনা। এসব বনে সাধারণত ইউক্যালিপটাস ও পপলারের মতো দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ লাগানো হয় এবং এগুলোর নিবিড় পরিচর্যা করা হয়। মানুষ ক্ষতিকারক বা প্রতিযোগী আগাছা পরিষ্কার করে এবং অনেক সময় সারও প্রয়োগ করে। এই পরিচর্যার ফলে আলো, পানি এবং পুষ্টির জন্য গাছের মধ্যকার প্রতিযোগিতা কমে যায়, যা বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রভাবের প্রতি আরও বেশি সাড়া দেয়।
রোপণ করা বনে গাছের বয়স যখন ৩০ থেকে ৪০ বছরের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এই বৃদ্ধির পার্থক্য সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকে এবং ৪০ বছর পার হওয়ার পর তা লক্ষণীয়ভাবে কমতে শুরু করে। এর বিপরীতে, প্রাকৃতিক বনগুলো ধীরগতিতে কিন্তু অবিচলিতভাবে বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেয়।
তবে লুও বলেছেন, "কার্বন শোষণের জন্য মানবসৃষ্ট বন স্বল্পমেয়াদে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, তবে এই সুবিধাটি সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি কার্বন সংরক্ষণ এবং জলবায়ুসহনশীলতার জন্য প্রাকৃতিক বনের কোনো বিকল্প নেই।"
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুতে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার সময় পুনঃবনায়ন মডেল নিয়ে কাজ করা কেভিন ডিসুজা (যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, এই ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই যৌক্তিক মনে হয়। কারণ তরুণ ও দ্রুত বর্ধনশীল গাছের ছড়িয়ে থাকা পাতা কার্বন শোষণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে কার্বন শোষণ ও গাছের বৃদ্ধি ট্র্যাকিংয়ের জন্য 'লিফ এরিয়া' বা পাতার পরিধিই একমাত্র সেরা পরিমাপ কিনা, তা নিয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত নন।
তিনি বলেন, "এটি একটি ভালো মাধ্যম হতে পারে, তবে এটি আপনাকে সম্পূর্ণ চিত্র দেয় না। ক্যানোপি বা পাতার আচ্ছাদন হলো গাছের কেবল উপরিভাগ, অথচ কার্বন জমা হয় গাছের কাঠ, ছাল, শিকড় এবং মাটির মতো বিভিন্ন জায়গায়।"
কেভিন আরও উল্লেখ করেন যে, চীনের বনের ওপর করা অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুর বছরগুলোতে প্রাকৃতিক বনগুলো কৃত্রিম বনের চেয়ে মাটির ওপরে বেশি কার্বন সঞ্চয় করে। তাই অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এই ফলাফলটিকেও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
ইউহাং লুও বলেন, কার্বন শোষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন ধরনের বনের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক জলবায়ু মডেলগুলো যে কিছু বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে, তা এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, "ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা আমরা যেভাবে ভাবি, তার চেয়েও অনেক সূক্ষ্ম এবং সুনির্দিষ্ট উপায়ে কাজ করে। এটি কেবল বেশি করে গাছ লাগানোর বিষয় নয়। এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি কখন গাছ লাগাচ্ছেন, কোন প্রজাতি বেছে নিচ্ছেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে সেগুলোর পরিচর্যা করছেন।"
লুও আশা প্রকাশ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে নতুন বন থেকে যাতে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে এই গবেষণার ফলাফলগুলো পুনঃবনায়ন প্রচেষ্টাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে।
তিনি বলেন, "আমাদের গবেষণা বনায়ন-ভিত্তিক জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা প্রদান করে; যেমন—কখন রোপণ করতে হবে, কী রোপণ করতে হবে, এর সুফল কতদিন স্থায়ী হবে এবং বর্তমান মডেলগুলোতে কী ভুল হচ্ছে। আমরা আশা করি, এটি মানুষজনকে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।"
