দেশে ৩০-৪৯ বছর বয়সী প্রতি ১৩ নারীর একজনের সময়ের আগেই মেনোপজ হয়: আইসিডিডিআর,বি
৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রতি ১৩ জন বাংলাদেশি নারীর মধ্যে প্রায় একজনের অকাল বা আগাম মেনোপজ হয়— আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ ধরনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিস্তৃত বহুদেশীয় এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গত সপ্তাহে বিএমজে গ্লোবাল হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এ গবেষণায় ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের (এলএমআইসি) ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১৪ জনে প্রায় একজন অকাল মেনোপজে আক্রান্ত।
বাংলাদেশে এ হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সামগ্রিক গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালে এ হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
মেনোপজ হলো মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে। ৪০ বছরের আগে মেনোপজ হলে তাকে অকাল মেনোপজ এবং ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সের মধ্যে হলে তাকে আগাম মেনোপজ বলা হয়।
অকাল বা আগাম মেনোপজ হলে হৃদ্রোগ, অস্টিওপোরোসিস, বিপাকজনিত (মেটাবলিক) রোগ, চিন্তাশক্তি ও স্মৃতিশক্তির অবনতি, বিষণ্নতা এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি সারা জীবনের জন্য বেড়ে যায়। পাশাপাশি এটি নারীদের জীবনমান ও দৈনন্দিন কাজেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যেভাবে মেনোপজ পরিমাপ করা হয়েছে
গবেষণায় ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (ডিএইচএস)–এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এই জরিপে নারীদের মাসিক ও প্রজননসংক্রান্ত ইতিহাস সংগ্রহ করা হয়।
ডিএইচএসের পদ্ধতি অনুযায়ী, যেসব নারীর টানা অন্তত ছয় মাস মাসিক হয়নি বা যারা জানিয়েছেন যে তাদের মেনোপজ হয়েছে কিংবা জরায়ু অপসারণ (হিস্টেরেকটমি) করা হয়েছে, তাদের মেনোপজ হয়েছে বলে ধরা হয়েছে। এরপর গবেষকেরা ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হয়েছে কি না তা নির্ধারণ করে সেসব ঘটনাকে অকাল বা আগাম মেনোপজ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন।
শিক্ষা ও দেরিতে বিয়ে করলে ঝুঁকি কম
গবেষণায় দেখা গেছে, অকাল বা আগাম মেনোপজের সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যের স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।
শিক্ষা, সম্পদ, কর্মসংস্থান ও প্রজননসংক্রান্ত বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও গ্রামীণ নারীদের অকাল বা আগাম মেনোপজের সম্ভাবনা শহরের নারীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
শিক্ষার ক্ষেত্রে সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা নারীদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত নারীদের ঝুঁকি ১১ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের ২৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্তদের ৫৮ শতাংশ কম।
যেসব নারীর বিয়ে ১৮ বছর বা তার পরে হয়েছে, তাদের অকাল বা আগাম মেনোপজের সম্ভাবনা কম বয়সে বিয়ে হওয়া নারীদের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম। একইভাবে, ১৮ বছর বা তার পরে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের ঝুঁকি কম বয়সে সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম।
তবে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, এটি একটি ক্রস-সেকশনাল (এককালীন সমীক্ষাভিত্তিক) গবেষণা। তাই এসব ফলাফল কেবল পারস্পরিক সম্পর্ক দেখায়; শিক্ষা, বসবাসের স্থান বা সন্তান জন্মদানের বয়সই সরাসরি আগে বা পরে মেনোপজের কারণ—এমনটি প্রমাণ করে না।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৪টি দেশের মধ্যে অকাল বা আগাম মেনোপজের হার সবচেয়ে বেশি ইথিওপিয়ায় (১২ শতাংশ)। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (১১.৫ শতাংশ) এবং মিয়ানমার (১০.৩ শতাংশ)। সবচেয়ে কম হার জর্ডানে (২.৩ শতাংশ)। এরপর রয়েছে গ্যাবন (২.৬ শতাংশ) এবং আর্মেনিয়া (২.৮ শতাংশ)।
আগাম শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ওপর জোর গবেষকদের
গবেষণার প্রধান লেখক এবং আইসিডিডিআর,বি–এর গবেষক রাইশা বিনতে ইসলাম বলেন, গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অকাল বা আগাম মেনোপজ শুধু জৈবিক কারণের ওপর নির্ভর করে না।
তিনি বলেন, 'কম শিক্ষিত নারী, গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা এবং কম বয়সে বিয়ে বা সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের মধ্যে অকাল বা আগাম মেনোপজের হার ধারাবাহিকভাবে বেশি। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এর সুফল প্রজননস্বাস্থ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হবে।'
আইসিডিডিআর,বি–এর মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, অকাল বা আগাম মেনোপজকে শুধু প্রজনন জীবনের একটি ধাপ হিসেবে না দেখে, নারীর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তিনি চিকিৎসকদের প্রতি নিয়মিতভাবে নারীদের কাছে মেনোপজের বয়স সম্পর্কে জানতে চাওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, এ তথ্যের মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিস, হৃদ্রোগ, বিষণ্নতা ও জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা নারীদের আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত শুরু করা যাবে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণায় ডিএইচএসের সংজ্ঞা অনুযায়ী টানা ছয় মাস মাসিক না হলে মেনোপজ হয়েছে বলে ধরা হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্লিনিক্যাল সংজ্ঞা অনুযায়ী, মেনোপজ নির্ধারণে টানা ১২ মাস মাসিক বন্ধ থাকতে হয়।
এছাড়া, ব্যবহৃত তথ্যের ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে হওয়া মেনোপজ এবং জরায়ু অপসারণ (হিস্টেরেকটমি) বা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কারণে মাসিক বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে ১২ মাসের মানদণ্ড ব্যবহার করে আলাদা বিশ্লেষণেও প্রায় একই ধরনের হার ও প্রবণতা পাওয়া গেছে।
এ গবেষণায় ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন, শারীরিক কর্মকাণ্ড, খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ আরও কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাবক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি। কারণ, অংশগ্রহণকারী সব দেশের জন্য এসব বিষয়ে তুলনাযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
