সুইজারল্যান্ড বৈঠকের মাঝে আসিম মুনিরকে ‘হত্যার চক্রান্ত’ করেছিল মোসাদ, নাকচ করল পাকিস্তান
সুইজারল্যান্ড সফরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের ওপর ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কথিত হত্যা পরিকল্পনার দাবিটিকে 'সম্পূর্ণ আজেবাজে কথা' বলে নাকচ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ। ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক পেপে এসকোবারের করা এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।
লেবানিজ-অস্ট্রেলিয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার মারিও নাওফালের উপস্থাপনায় একটি পডকাস্টে পেপে এসকোবার এই দাবি করেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনাকে কেন্দ্র করে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা। সে সময় সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বিষয়ে 'অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য' পেয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।
এসকোবার দাবি করেন, এই কথিত পরিকল্পনাটি সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিদল অংশ নিয়েছিল।
পডকাস্টে এসকোবার বলেন, 'পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য পেয়েছিল যে, নেতানিয়াহুর [ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী] নির্দেশে সুইজারল্যান্ডে যাওয়া আসিম মুনির এবং সম্ভবত পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের বাকি সদস্যদের ওপর মোসাদ একটি হত্যাচেষ্টার প্রস্তুতি নিচ্ছে।'
তিনি আরও দাবি করেন, এই তথ্যের জবাবে ওমানের মতো কোনো একটি কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে ইসরায়েলকে সরাসরি একটি কঠোর বার্তা পাঠায় ইসলামাবাদ।
ইসরায়েলকে পাকিস্তানের দেওয়া বার্তার বিবরণ দিয়ে এসকোবার বলেন, 'যদি তোমরা আমাদের প্রতিনিধিদলকে স্পর্শ করো, তবে আমরা তোমাদের মানচিত্র থেকে মুছে দেব, ব্যস।'
পডকাস্টে তিনি আরও বলেন, 'তাই পাকিস্তান তাদের সাধারণ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে একটি সরাসরি বার্তা পাঠায়... আমার ধারণা এ ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী ছিল ওমান... সরাসরি ইসরায়েলকে উদ্দেশ্য করে তারা বলেছিল, যদি আমাদের প্রতিনিধিদলকে স্পর্শ করো তবে আমরা তোমাদের মানচিত্র থেকে মুছে দেব, ব্যস।'
স্পর্শকাতর ও বিস্ফোরক প্রকৃতির হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দাবিটি নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তবে পাকিস্তান সরকার ও দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে।
পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল 'এআরওয়াই নিউজ'-এর চেয়ারম্যান কামরান খান সে দেশের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানান, এসকোবারের এই দাবি সম্পূর্ণ বানোয়াট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) কামরান খান লেখেন, ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই দাবিটিকে 'একেবারে বাজে এবং সম্পূর্ণ অর্থহীন কথাবার্তা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ওই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে কামরান খান আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরসহ পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের পুরো সুইজারল্যান্ড সফরটি 'ঘড়ির কাঁটা ধরে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী এবং ফিল্ড মার্শালের লুসার্নে অবস্থানকালে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সচল ছিল।' পুরো সফরটিতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বিঘ্ন বা ঝুঁকির ঘটনা ঘটেনি।
ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, 'সফরের কোনো পর্যায়েই সুইজারল্যান্ড বা মার্কিন নিরাপত্তা দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো নিরাপত্তা সতর্কতা বা সামান্যতম উদ্বেগের কথাও জানানো হয়নি।'
কথিত এই হত্যাচেষ্টার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি এটিকে 'বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্কহীন ভিত্তিহীন এক কল্পকাহিনী' বলে অভিহিত করেছেন।
এই বিস্ফোরক দাবির বিষয়ে ইসরায়েল সরকার বা তাদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
এমন এক সময়ে এই বিতর্কটি সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জোর কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
