ইরানে হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র; মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলার দাবি আইআরজিসির
হরমুজ প্রণালিতে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবে শুক্রবার দেশটিতে পাল্টা হামলা করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, তাদের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত কেন্দ্র এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে আক্রমণ করেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অভিযান ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।
তেহরান জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের সিরিক অঞ্চলের একটি জেটির কাছাকাছি একটি প্রজেক্টাইল এসে পড়েছে। এর জবাবে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানি নৌবাহিনী।
নতুন এই মার্কিন হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ঠিক কতটা, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এই আক্রমণ কেবলই পাল্টা পদক্ষেপ ছিল, বড় কোনো যুদ্ধ অভিযান শুরু করা এর উদ্দেশ্য নয়।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, শুক্রবারের এই আক্রমণ প্রায় ৯০ মিনিট স্থায়ী হয়। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো হরমুজ প্রণালি বরাবর ও কেশম দ্বীপে ইরানের চারটি ঘাঁটিতে এই হামলা চালায়।
তবে এই উত্তেজনার মধ্যেও অন্য জায়গায় কিছুটা অগ্রগতির আভাস মিলেছে। ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটাতে চুক্তি সই করেছে ইসরায়েল ও লেবানন। দুই পক্ষই এ চুক্তিকে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, যার আওতায় হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা হবে এবং লেবানন থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নেবে ইসরায়েল।
তবে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে, তারা এতে সহযোগিতা করবে না।
বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে চলাচলকারী একটি মালবাহী জাহাজে হামলার পর তেহরান বলেছে, হরমুজ প্রণা;অর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। সেইসঙ্গে ওয়াশিংটনের পক্ষ না নেওয়ার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার ইরানকে দায়ী করে বলেছেন, এর মাধ্যমে গত সপ্তাহের চুক্তি লঙ্ঘন করা হয়েছে।
হামলার ঘোষণা দিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, 'বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি বাহিনীর অযাচিত আগ্রাসন স্পষ্টতই যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় গতকাল যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল, এটি তারই জোরালো জবাব।'
মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ পথ সুগম করতে তারা সব ধরনের সমন্বয় ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
'সহিংসতার জবাব সহিংসতাতেই'
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ওয়াশিংটন সমঝোতা স্মারক অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ ভ্যান্স লিখেছেন, 'ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছিল। আমরা সেটি রক্ষা করেছি। এই সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে ওদের কোনো আপত্তি থাকলে ওরা সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু সহিংসতার জবাব সহিংসতাতেই দেওয়া হবে।'
সিরিক বন্দরে বিকট এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম একটি অজ্ঞাতনামা সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে সেখানে মার্কিন হামলা চালানোর কথা জানায়। ওই সূত্র বলেছে, এর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে হরমুজ প্রণালির নিয়ম লঙ্ঘন করা কয়েকটি জাহাজের উদ্দেশ্যে সিরিক থেকে বেশ কিছু সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়েছিল। এর পাশাপাশি নিকটবর্তী কারপান এলাকা থেকেও এই নৌপথের দিকে দুটি সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, এর পাল্টা জবাবে তাদের নৌবাহিনী 'এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা সন্ত্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হেনেছে।' রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে—আমেরিকা যদি আবারও কোনো হামলা চালায়, তবে তার পাল্টা জবাব হবে আরও ব্যাপক।
আইআরজিসি বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হরমুজে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের হাতে।
তারা বলেছে, 'কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ফ্রন্টে উসকানি দিয়ে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের চেষ্টা করেছিল, যার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এই আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটলে আমাদের পাল্টা আঘাতের পরিধি হবে আরও ব্যাপক।'
মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবির বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সর্বশেষ এই মার্কিন হামলার পর ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, ট্রাম্প আলোচনা কিংবা যুদ্ধবিরতির ন্যূনতম নীতি বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।
এক্সে দেওয়া পোস্টে আজিজি লিখেছেন, 'যুদ্ধবিরতির এই বেপরোয়া লঙ্ঘন বরাবরের মতোই ওদের জন্য কেবল পিছু হটা আর চরম অনুশোচনাই ডেকে আনবে।'
বৃহস্পতিবার ইরান ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কনটেইনার জাহাজে ইরান হামলা চালায়। এর জেরে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা শত শত জাহাজকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ স্থগিত করেছে জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিজেদের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের দাবি আবারও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রণালিটি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। সেইসঙ্গে তারা মার্কিন-ইরান চুক্তির এমন একটি ধারার দিকে ইঙ্গিত করেছে, যা তাদের এই জলপথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের আইনি অধিকার দেয়।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরান 'তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে'।
