যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি: বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যেভাবে পুনরায় যুক্ত হতে পারে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১৬ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরানজুড়ে এক ধ্বংসের ছাপ স্পষ্ট। তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনা গত কয়েক বছরের মধ্যে এখন সবচেয়ে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
গত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে ইরানের 'একঘরে' অবস্থার অবসান ঘটতে চলেছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই তেল উৎপাদনকারী দেশ বাকি বিশ্বের সাথে পুনরায় তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করার সুবর্ণ সুযোগ পেতে যাচ্ছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে সম্পাদিত এই প্রাথমিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকটি— একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেওয়ার পথটি মোটেও মসৃণ নয়, বরং নানাবিধ বাধা-বিপত্তিতে জর্জরিত। যেমন সুইজারল্যান্ডে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরিকল্পিত বৈঠকটি স্থগিত করা হয়, যেখানে মূলত প্রাথমিক চুক্তি সইয়ের কথা ছিল। ওদিকে লেবাননেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের সই করা এই চুক্তিটি যদি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, তবে ইরানের বুকে বিঁধে থাকা সবচেয়ে বড় কাঁটাটি—অর্থাৎ দেশটির তেল রপ্তানি এবং আর্থিক লেনদেনের ওপর আরোপিত শাস্তিমূলক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা—খুব শিগগিরই অপসারিত হতে পারে।
এর ফলে বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ করে রাখা ইরানের শতকোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত হতে পারে। এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে যৌথভাবে ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি বিশেষ পুনর্গঠন তহবিল গঠনেও সম্মতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
একই সাথে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহন রুট বা 'চোক পয়েন্ট'- আগলে বসে থাকা এই জ্বালানি পরাশক্তি আয়ের একটি সম্পূর্ণ নতুন খাত বা উৎস তৈরিতে সমর্থ হতে পারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতি বছর চলাচলকারী হাজার হাজার বাণিজ্যিক বা কার্গো জাহাজ থেকে টোল বা অর্থ আদায়ের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল ইরান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এমন একটি বিষয় কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল, তবে বর্তমান মার্কিন-ইরান চুক্তিতে এখন বিষয়টি আলোচনার টেবিলে স্থান পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই ছাড় আদায়ও করেছে তেহরান।
লন্ডন-ভিত্তিক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা 'বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন'-এর প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাতমানেলিজ বলেন, "এটি সত্যিই একটি অসাধারণ দলিল বা চুক্তি।" তার মতে, এই চুক্তিটি "যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কোন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে, তার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা ভালো করেই জানেন যে ট্রাম্প একজন খামখেয়ালি মানুষ, তার সাথে আলোচনা চালানো বেশ কঠিন এবং অতীতে তিনি নিজেকে একজন অবিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবেও প্রমাণ করেছেন। কিন্তু একই সাথে তার হাতে এমন আমূল পরিবর্তনকারী কূটনীতি (ট্রান্সফরমেটিভ ডিপ্লোম্যাসি) পরিচালনার ক্ষমতা রয়েছে, যা তার আগে অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছিল না।"
আমেরিকার দীর্ঘদিনের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচিত ইরান আন্তর্জাতিক 'সন্ত্রাসবাদে' মদদ দেওয়া এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির অভিযোগে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার হওয়া দেশগুলোর একটি। এর আগে কখনো বৈরিতার অবসান এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এমন সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক কোনো পরিকল্পনা আলোচনার টেবিলে আসেনি।
"আর এই কারণেই পুরো প্রক্রিয়াটি যেমন একদিকে চরম অনিশ্চয়তায় ভরা, তেমনি অন্যদিকে ইরানিদের জন্য এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও লোভনীয়" –যোগ করেন বাতমানেলিজ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাবেক উপ-পরিচালক আদনান মাজারেয়ি উল্লেখ করেন যে, এই যুদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর কাছে ওয়াশিংটনের দেওয়া নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাসের ভিতকে অনেকটাই নাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বর্তমান এই চুক্তির রূপরেখা ওই অঞ্চলে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করছে।
ইরানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইরানি বাণিজ্য, অর্থায়ন এবং ব্যবসার একটি প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র বা হাব হিসেবে কাজ করে আসছিল। আদনান মাজারেয়ি বলেন, "সেই সম্পর্ক ঠিক কতটুকু এবং কীভাবে আবার সচল হবে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।"
আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যখন একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলবে, তখন উভয় পক্ষের মধ্যে একগুচ্ছ 'আস্থা তৈরির পদক্ষেপ' নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত ইরানের প্রায় ৯ কোটি সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা অর্থনৈতিক স্বস্তি বয়ে আনবে।
এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং গত এপ্রিল থেকে ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা সর্বাত্মক নৌ-অবরোধের অবসান ঘটানো। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে পুনরায় তেল রপ্তানি শুরু করার অনুমতি দিতেও রাজি হয়েছে, যা দেশটির আয়ের প্রধান উৎস। এর অর্থ হলো, ইরানকে আর নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে বা ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করতে হবে না। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা অবরুদ্ধ ইরানি তহবিলের একটি অংশও ছাড় করার কথা রয়েছে।
এছাড়া এই নৌ-অবরোধ উঠে যাওয়ার ফলে আমদানিকৃত পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ইরানি নাগরিকদের আর কালোবাজার থেকে তা কিনতে অতিরিক্ত চড়া দাম দিতে হবে না। তবে দেশটিতে আরও বৈপ্লবিক, সুদূরপ্রসারী এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের নেতৃত্বের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের 'সেন্টার ফর গ্লোবাল বিজনেস'-এর একাডেমিক ডিরেক্টর কিশলয়া প্রসাদ বলেন, একটি বড় ঝুঁকি হলো ইরানের সরকার হয়তো অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ের লোভে বা অতি-উৎসাহী হয়ে পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটিকেই নস্যাৎ বা লাইনচ্যুত করে দিতে পারে।
এছাড়া আগামী দিনগুলোতে সরকার কীভাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পরিচালনা করবে, সেটিও একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো নিঃসন্দেহে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল; তবে সরকারের অব্যবস্থাপনা, কঠোর দমনপীড়ন এবং দুর্নীতিও কম দায়ী ছিল না। এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই দেশটিতে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, আকাশচুম্বী বেকারত্ব এবং ব্যাপক জনবিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক উত্তেজনা হ্রাস পাওয়ার মানেই এই নয় যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ তীব্র সংকট ও সীমাবদ্ধতাগুলো রাতারাতি গায়েব হয়ে যাবে। যুদ্ধ ইরানের জ্বালানি, শিল্প এবং পরিবহন অবকাঠামোর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে, তা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে চলে আসা তীব্র বিনিয়োগের ঘাটতি এবং নানাবিধ পণ্যের সংকট দূর করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
নিষেধাজ্ঞা ইরানকে তার নিজস্ব প্রয়োজনীয় পণ্য দেশে উৎপাদন করতে বাধ্য করেছিল। এর ফলে তাদের অর্থনীতিতে এক ধরনের বৈচিত্র্য এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটিকে সাহায্য করতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার তেহরানে পৌঁছানো ভার্জিনিয়া টেকের অর্থনীতির অধ্যাপক জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বলেন, "ভবিষ্যতের ব্যাপারে তেলের চেয়েও যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী করে তুলছে, তা হলো আর্থিক খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।"
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া বা আটকে থাকা সরকারি সম্পদ অবমুক্ত করা হলে মূলত সরকারের তহবিলে অর্থ আসবে। তবে আর্থিক লেনদেনের ওপর থেকে বিধিনিষেধ উঠে গেলে সরাসরি সাধারণ ইরানি নাগরিকদের পকেটে অর্থ আসবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হবে। আর এটাই পুরো অর্থনীতিকে চাঙ্গা বা গতিশীল করতে অনুঘটক (ক্যাটালিস্ট) হিসেবে কাজ করবে।
ইরানি বংশদ্ভূত এই অধ্যাপক আরও বলেন, সরকার তাদের নতুন এই রাজস্ব কীভাবে ব্যবহার করবে—তা কেউ নিশ্চিত করে জানে না। তবে ইরানি নাগরিকদের বিশ্ববাজারে সরাসরি কেনাবেচার সুযোগ দেওয়া হলে, তা নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এছাড়া বর্তমানে ইরানি রিয়ালের মান আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণে তারা তৈরি পোশাক বা অন্যান্য রপ্তানি পণ্যে— বাংলাদেশ ও চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাড়তি সুবিধা পাবে।
তিনি পরিশেষে বলেন, "সবকিছুর মূল কথা হলো—এখন বিশ্ববাজারে তেল এবং অন্যান্য পণ্যসামগ্রী অবাধে বিক্রির সক্ষমতা অর্জন করা।"
