শপিং ব্যাগ বইতে এখন ভাড়ায় মিলছে লোক, দিল্লিতে কতটা জনপ্রিয় নতুন এই সেবা?
ধরুন, আপনি এক দোকান থেকে আরেক দোকানে কেনাকাটা করছেন, আর আপনার ব্যাগগুলো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অন্য কেউ! অথবা আপনি যখন কেনাকাটায় ব্যস্ত, তখন কেউ আপনার সন্তানের প্র্যাম (শিশুদের বসার চাকাওয়ালা গাড়ি) ঠেলে দিচ্ছে!
ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি ব্যস্ত বাজারে ক্রেতাদের ঠিক এমন সেবাই দিচ্ছে নতুন একটি স্টার্টআপ।
গত এপ্রিলে চালু হওয়া 'ক্যারি-মেন' নামের এই স্টার্টআপ দিল্লির লাজপত নগর বাজারে ক্রেতাদের জন্য নারী ও পুরুষ সহকারী ভাড়া দিচ্ছে। তারা সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা পর্যন্ত ক্রেতাদের কেনাকাটায় সাহায্য করবেন। প্রথম ৩০ মিনিটের জন্য ভাড়া শুরু হয় ৭৯ রুপি থেকে। আর এক ঘণ্টার জন্য খরচ পড়বে ১৪৯ রুপি।
ক্রেতাদের মধ্যে এই সেবাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, 'ক্যারি-মেন'-এর সহকারীরা তাদের জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছেন।
তবে এই সেবাটি নিয়ে একটি বিতর্কও শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি কি অতিরিক্ত সুবিধাভোগী হয়ে উঠছে? আর এই সহকারীরা কি আসলে শোষণমূলক কাজে নিযুক্ত আধুনিক যুগের 'কুলি'?
কীভাবে এল এই আইডিয়া?
'ক্যারি-মেন' স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠা করেছেন দুই বন্ধু রিতু কান্দারি শ্রীবাস্তব এবং কনিষ্কা মালহোত্রা। তারা দুজনই শিশুসন্তানের মা।
রিতু বিবিসিকে বলেন, 'গত বছর কনিষ্কা আর আমি আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে লাজপত নগরে গিয়েছিলাম। তখন এই আইডিয়াটা মাথায় আসে। এক হাতে সব শপিং ব্যাগ আর অন্য হাতে বাচ্চাদের প্র্যাম সামলাতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা এক বৃদ্ধাকেও তার ব্যাগ নিয়ে কষ্ট করতে দেখেছিলাম। আমরা তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নিজেদের জিনিসপত্রই সামলাতে পারছিলাম না। বিষয়টা খুব হতাশাজনক ছিল।'
রিতু বলেন, 'তখনই আমাদের মনে হলো, যদি টাকার বিনিময়ে এমন কোনো সাহায্য পাওয়া যেত, তবে কেনাকাটায় যাওয়ার জন্য আমাদের আর পরিবারের সদস্যদের কাছে মিনতি করতে হতো না।'
লাজপত নগরের মতো বাজারগুলো কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শপিং মল নয়। এসব খোলা বাজারে হাঁটার জন্য মসৃণ ফুটপাত বা চলন্ত সিঁড়ি নেই। ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা, অসমান এবং অনেক জায়গায় হকাররা দখল করে রেখেছে। ফলে এসব রাস্তায় প্র্যাম চালানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো হাঁটাও কঠিন।
ওই দিনই দুই বন্ধু তাদের পরিবারের সঙ্গে আইডিয়াটি নিয়ে আলোচনা করেন এবং 'ক্যারি-মেন' ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে।
পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে তারা নিজেদের কোম্পানির নিবন্ধন করেন, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ও পুলিশের সব অনুমতি নেন এবং লাজপত নগরে একটি বুথ স্থাপন করেন।
এরপর তারা পাঁচজন যুবক এবং পরে আরও দুজন নারীকে নিয়োগ দেন। এক মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণের পর তারা এই সেবা চালু করেন।
সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক
এই স্টার্টআপের খবর খুব দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ এটি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন এবং মানুষের মতামত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
অনেকেই এই আইডিয়ার প্রশংসা করে বলেছেন যে এটি একটি দারুণ উদ্যোগ, যা বড় পরিসরে চালু হলে হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এমন এক দেশে, যেখানে শহুরে বেকারত্বের হার ধারাবাহিকভাবে ৫ শতাংশের ওপরে এবং লাখ লাখ মানুষ কাজ পাচ্ছে না।
কিন্তু সমালোচকেরা একে অলস ও বিত্তবান ভারতীয়দের 'চরম এনটাইটেলমেন্ট' বা সুবিধাভোগী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যারা ঘরের কাজের জন্য গৃহকর্মীদের ওপর নির্ভরশীল।
সামাজিক মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর এই সমালোচনা আরও তীব্র হয়। ওই ছবিগুলোতে দেখানো হয়েছিল যে পরিপাটি পোশাক পরা বিত্তবান নারীরাই হয়তো এই সেবার মূল গ্রাহক হবেন।
শ্রম অধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানী আকৃতি ভাটিয়া বলেন, 'মনে হচ্ছে এই সেবাটি হয়তো অতি ধনী নারীদের জন্যই আনা হয়েছে, যারা সবে ম্যানিকিওর করিয়েছেন এবং নিজেদের নখ নষ্ট করতে চান না।'
অনেকে আবার বলেছেন, এই 'ক্যারি-মেন'রা আসলে মোড়ক বদলানো 'কুলি'। কেউ কেউ একে আধুনিক যুগের দাসত্বও বলেছেন। তবে স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতারা এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।
রিতু বলেন, 'প্রথম কথা হলো, এখানে কোনো দাসত্ব নেই। আমরা কাউকে আমাদের জন্য কাজ করতে বাধ্য করছি না। আমাদের সব কর্মীই পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত, তারা কোনো গিগ ওয়ার্কার (চুক্তিভিত্তিক কর্মী) নন।'
তিনি আরও বলেন, 'এর সঙ্গে এনটাইটেলমেন্টের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা শুধু তাদেরই সাহায্য করছি, যারা একা একা ভিড়ের মধ্যে আর অলিগলিতে কেনাকাটা করতে হিমশিম খান।'
তিনি জানান, গত ছয় সপ্তাহে তাদের গ্রাহকদের বেশির ভাগই ছিলেন গর্ভবতী নারী, শিশুসন্তানের মা, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী মানুষ।
'ক্যারি-মেন'রা কী করেন?
ক্যারি-মেনদের একজন ১৮ বছর বয়সী আনন্দ কুমার জানান, তাদের প্রথম গ্রাহক ছিলেন একজন গর্ভবতী নারী। প্রশিক্ষণের সময় তাদের শেখানো হয়েছিল, সব সময় গ্রাহকের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করতে হবে এবং তাদের পরিবারের সদস্যের মতো সম্মান করতে হবে।
এই সহকারীরা শুধু ব্যাগই বইতে সাহায্য করেন না, তারা প্র্যাম, ছাতা, ফোল্ডিং চেয়ার, পানির বোতল এবং পোর্টেবল চার্জারও বহন করেন। প্র্যাম কীভাবে খুলতে এবং আটকাতে হয়, সে বিষয়েও তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আনন্দ বলেন, 'আমাদের বলা হয়েছিল বাজারের অলিগলি ভালো করে চিনে নিতে, যাতে আমরা গ্রাহকদের তাদের পছন্দের দোকানে দ্রুত নিয়ে যেতে পারি। এ ছাড়া আমরা তাদের জন্য খাবারের লাইনেও দাঁড়াই। তারা তখন চেয়ারে বসে বিশ্রাম নেন।'
আনন্দ আগে শাড়ির দোকানে সহকারী এবং অ্যাপভিত্তিক খাবার ও পণ্য ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি জানান, এখানে তার বেতন আগের চেয়ে বেশি এবং এই কাজে তিনি সম্মান পান।
তিনি বিশেষভাবে এক ব্যক্তির কথা স্মরণ করেন যার দুটি হাতই কৃত্রিম ছিল। ওই ব্যক্তি তার সব টাকা আনন্দের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং টাকা গুনে বিল পরিশোধ করতে বলেছিলেন। আনন্দ বলেন, 'উনি আমার ওপর যে বিশ্বাস রেখেছিলেন, তা আমার মন ছুঁয়ে গেছে।'
কীভাবে বাড়ছে গ্রাহক?
রিতু জানান, চালুর পর প্রথম সপ্তাহে তাদের কোনো বুকিং ছিল না, তবে এখন তারা মানুষের আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, 'এখন আমরা দিনে প্রায় আধা ডজন বুকিং পাচ্ছি এবং ছুটির দিনে এই সংখ্যা আট-নয়ে গিয়ে ঠেকে।'
গত সপ্তাহে এক প্রচণ্ড গরম ও গুমোট দুপুরে যতিন্দর ও অনিতা সাভারওয়াল 'ক্যারি-মেন'-এর কমলা-সাদা বুথে এসে একজন সহকারী চান।
যতিন্দর জানান, আর কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ৬০ বছরে পা দেবেন। তার কাঁধে একটি ভারী ব্যাগ এবং অনিতার হাতেও দুটি ব্যাগ ছিল। এদিকে তাদের আরও কিছু কেনাকাটা তখনো বাকি।
সাভারওয়াল দম্পতি এই বাজার এলাকার কাছাকাছি থাকলেও, এই প্রথম তারা কোনো সহকারী ভাড়া করলেন। যতিন্দর জানান, তার স্ত্রী ইনস্টাগ্রাম থেকে 'ক্যারি-মেন' সম্পর্কে জেনে তাকে বলেছিলেন।
আনন্দ তাদের সহকারী হিসেবে প্রথম একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যান। কারণ, অনিতার মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হয়েছিল এবং তিনি ব্যথানাশক ওষুধ কিনতে চেয়েছিলেন। তারা যখন দোকানে ঢোকেন, আনন্দ তখন তাদের ব্যাগ নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।
তারা বের হওয়ার পর আনন্দ দ্রুত অনিতাকে পানির বোতল এগিয়ে দেন, যাতে তিনি ওষুধ খেতে পারেন।
যতিন্দর বলেন, 'সে আমাদের পথও দেখাচ্ছে। আমরা জানতাম না ফার্মেসি কোথায়। আমার মনে হয় এটি খুব ভালো একটি সেবা। সে সঙ্গে থাকায় আমরা সাহায্য পাচ্ছি এবং আরামে কেনাকাটা করতে পারছি।'
অনিতা যোগ করেন, 'এখন আমরা ভারী ব্যাগের বোঝা না নিয়ে একদম স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারছি।'
এই দম্পতি জানান, এনটাইটেলমেন্ট বা শোষণের বিতর্কে তারা একমত নন।
যতিন্দর বলেন, 'আমার মনে হয়, যারা নিজেদের ব্যাগ বইতে পারে, তাদের নিজেদেরই সেটা করা উচিত। কিন্তু যারা পারে না, তারা এই সেবা নিতে পারে। আমাদের মতো মানুষের জন্য এটি খুব ভালো একটি উদ্যোগ। এটি প্রতিটি বাজারেই থাকা উচিত।'
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
রিতু জানান, আগামী জুলাই মাসে তারা চাঁদনি চক বাজারে 'ক্যারি-মেন'-এর আরেকটি শাখা চালুর পরিকল্পনা করছেন। ধীরে ধীরে শহরের এবং ভারতজুড়ে অন্যান্য বাজারগুলোতেও এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
তবে শ্রম অধিকারকর্মী আকৃতি সতর্ক করে বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য 'ক্যারি-মেন'-এর বড় তহবিলের প্রয়োজন হবে। আর এই তহবিলের ওপরই নির্ভর করবে তারা কত দিন এই সেবা টিকিয়ে রাখতে পারবে।
বর্তমানে 'ক্যারি-মেন' একটি খুব ছোট স্টার্টআপ, যাদের মাত্র সাতজন পূর্ণকালীন কর্মী রয়েছে।
আকৃতি বলেন, 'ব্যবসা বড় হওয়ার পরও কি তারা এই একই নিয়ম ধরে রাখতে পারবে? অনেক গিগ ওয়ার্ক শুরুতে কর্মীদের বহুবিধ সুবিধা এবং ভালো টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু পরে তা টিকতে পারেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'ভারতে যেহেতু সস্তা শ্রমিকের কোনো অভাব নেই এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর জোর নেই, তাই কোম্পানিগুলো সহজেই শ্রমিকদের শোষণ করতে পারে। এখন "ক্যারি-মেন" কোন পথে হাঁটে, সেটাই দেখার বিষয়।'
