১০০ বছরের বেশি সময় লাখ লাখ মানুষকে খাইয়েছেন—এখন হারিয়ে যাচ্ছেন মুম্বাইয়ের ডাব্বাওয়ালারা
প্রতিদিন সকালে, শহর পুরোপুরি জেগে ওঠার আগেই, সাদা টুপি ও সাদা শার্ট পরা লোকেরা মুম্বাইয়ের শহরতলির রেলস্টেশনগুলোতে এসে পৌঁছান। তাদের সাইকেলের ওপর উঁচু করে সাজানো থাকে খাবারের টিফিনবাক্স।
তারা এসব বাক্স ট্রেনে তুলে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যান। এরপর হেঁটে ও সাইকেলে চড়ে অফিসকর্মীদের কাছে গরম, বাড়িতে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন।
অল্প সময়ের বিরতির পর তারা পুরো প্রক্রিয়াটি উল্টোভাবে সম্পন্ন করেন। খালি টিফিনবাক্স সংগ্রহ করে সেগুলো যে রান্নাঘর থেকে এসেছিল, সেখানে দুপুরের মধ্যেই ফিরিয়ে দেন।
এই লোকদের বলা হয় 'ডাব্বাওয়ালা'। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তারা এমন এক নিখুঁত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে মুম্বাইবাসীদের খাবার পৌঁছে দিয়ে আসছেন, যা বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে।
এই টিফিনবাক্সগুলোকে বলা হয় 'ডাব্বা'। সাধারণত এসব ডাব্বায় থাকে ভাত, ডাল, সবজির তরকারি, রুটি এবং কখনও কখনও মাংস। এসব খাবার প্রতিদিন মুম্বাইয়ের বিভিন্ন শহরতলির বাড়িতে তাজা রান্না করা হয়।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুম্বাইয়ের অফিসকর্মীদের জন্য বাড়িতে রান্না করা খাবার পারিবারিক রুটিন, সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে দ্রুতগতির এই শহরে প্রতিদিনের টিফিনবাক্স কর্মজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রতিটি বাক্সে একটি বর্ণ-সংখ্যাসংবলিত সংকেত চিহ্ন থাকে, যা ডাব্বাওয়ালাদের বলে দেয় বাক্সটি কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, কোন ভবনের কোন তলায় পৌঁছাতে হবে এবং পরে কীভাবে সেটি ফেরত আনতে হবে। কোনো মোবাইল অ্যাপ বা অবস্থাননির্ণয় প্রযুক্তি নয়—শুধু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা, যেখানে কর্মীরা মুম্বাইয়ের ট্রেন ও রাস্তা সম্পর্কে স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান রাখেন।
এই পেশা মুম্বাইকে—ভারতের আর্থিক রাজধানীকে—বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এটিকে স্বল্পব্যয়ে পরিচালিত সরবরাহব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে অধ্যয়ন করেছে। ২০০৩ সালে ভবিষ্যতের রাজা তৃতীয় চার্লসও মুম্বাই সফরের সময় কিছু সময় ডাব্বাওয়ালাদের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন।
এই সেবাটি এমন কিছুর প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যা নিয়ে মুম্বাই গর্ব করত—শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু বিষয় ছিল, যা অবিচল নির্ভুলতার সঙ্গে কাজ করত।
কিন্তু এখন যারা এই সুনাম গড়ে তুলেছিলেন, তারাই টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন।
ধারণা করা হয়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই ডাব্বাওয়ালা ব্যবস্থা শুরু হয়। তখন বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল এবং অফিসকর্মীদের দিনের বেলায় তাজা, বাড়িতে রান্না করা খাবার খাওয়ার একটি উপায় প্রয়োজন ছিল।
সেই সময়ে রেস্তোরাঁ ও খাবারঘরের সংখ্যা সীমিত ছিল। এমন এক শহরে, যেখানে খাবার সংস্কৃতি, ধর্ম ও পারিবারিক রুটিনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই ধারণার সূচনা করেছিলেন একজন পারসি ব্যাংকার। তিনি একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ করেছিলেন, যাতে তিনি প্রতিদিন সকালে তার বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে অফিসে পৌঁছে দেন এবং পরে খালি বাক্সটি ফেরত নিয়ে আসেন। একটি সহজ ব্যবস্থা, যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
শোভা বন্ড্রের 'মুম্বাইস ডাব্বাওয়ালা: দ্য আনকমন স্টোরি অব দ্য কমন ম্যান' বই অনুযায়ী, ১৮৯০ সালে মহাদেও বাচ্চে নামের একজন ব্যক্তি প্রায় ১০০ জন কর্মী নিয়ে এই ব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দেন।
প্রথম দিকের ডাব্বাওয়ালারা সাইকেলে করে টিফিনবাক্স পরিবহন করতেন এবং সেগুলোতে রঙিন সুতা বেঁধে চিহ্নিত করতেন, যাতে সঠিকভাবে বাছাই ও ফেরত দেওয়া যায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিহ্নের পরিবর্তে একটি বিশেষ বর্ণ-সংখ্যাসংবলিত সংকেত পদ্ধতি চালু হয়। আর সরবরাহ বা ডেলিভারিগুলো সাইকেল, মোটর সাইকেল এবং মুম্বাইয়ের শহরতলির ট্রেন নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল।
এই সেবাটি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, পিক আওয়ারে প্রায় সাড়ে চার হাজার ডাব্বাওয়ালা প্রতিদিন মুম্বাইজুড়ে প্রায় ৫০ হাজার টিফিনবাক্স সরবরাহ করতেন।
কিন্তু মহামারির কারণে সেই ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা এসে পড়ে। অফিস বন্ধ হয়ে গেলে এবং মানুষ ঘরে বসে কাজ শুরু করলে তাই দৈনিক সরবরাহের আর আগের মতো প্রয়োজন ছিল না।
যেসব ডাব্বাওয়ালা আগে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন অফিসকর্মীকে সেবা দিতেন, তারা হঠাৎ করেই হাতে গোনা কয়েকজন গ্রাহক নিয়ে পড়ে রইলেন। আবার কারও কারও কোনো গ্রাহকই অবশিষ্ট ছিল না।
নির্ভর করার মতো সঞ্চয় খুব কম থাকায় অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দেন।
এরপর অফিসগুলো আবার খুলেছে, কিন্তু দূরবর্তী ও মিশ্র কর্মপদ্ধতির কারণে প্রতিদিনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা একসময় মুম্বাইয়ের ডাব্বাওয়ালা নেটওয়ার্ককে পূর্ণ সক্ষমতায় সচল রাখত।
মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কিরণ গাভান্ডে বলেন, 'লকডাউনের পর ঘরে বসে কাজ করার সংস্কৃতি শুরু হয়। এখন অনেকেই সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিন দিন অফিসে যান। এটি মুম্বাইয়ের ডাব্বাওয়ালাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে।'
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত ডাব্বাওয়ালার সংখ্যা ২০১৮ সালে প্রায় সাড়ে চার হাজার থেকে কমে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজারে নেমে এসেছে।
একই সময়ে খাবারের সঙ্গে মুম্বাইবাসীর সম্পর্কও বদলে গেছে।
অনলাইন খাবার সরবরাহকারী অ্যাপ্লিকেশন যেমন সুইগি এবং জোমাটোর পাশাপাশি কম দামে রেস্তোরাঁর খাবার সরবরাহকারী ক্লাউড কিচেনগুলোর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা মানুষকে পছন্দের একটি নতুন সেট বা সুযোগ এনে দিয়েছে।
একসময় যেখানে ডাব্বাওয়ালাদের প্রতিযোগী বলতে কিছু ছিল না—মাত্র ২,০০০ রুপিতে মাসজুড়ে বাড়ির রান্না করা খাবার পৌঁছে দিতেন—সেখানে এখন মোবাইলের পর্দায় এক স্পর্শেই বিরিয়ানি থেকে শুরু করে বার্গার পর্যন্ত পাওয়া যায়।
বালু ভাগু শিন্ডে ২০ বছর ডাব্বাওয়ালা হিসেবে কাজ করার পর এই পেশা ছেড়ে দেন।
৪১ বছর বয়সী শিন্ডে একসময় প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন গ্রাহকের কাছে টিফিন পৌঁছে দিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার রুপি আয় করতেন। ভারতের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের শেষ দিকে তার মাত্র দুইজন গ্রাহক অবশিষ্ট ছিল।
তিনি অফিসগুলো পুনরায় খোলার অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় গ্রাহক আর ফিরে আসেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি অটোরিকশা চালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
এখন তিনি মাসে প্রায় ১৫ হাজার রুপি আয় করেন। এটি টিফিন সরবরাহের সময়কার আয়ের চেয়ে কম, কিন্তু তার সামনে বিকল্পও খুব সীমিত।
শিন্ডে বলেন, 'গ্রাহক নেই, টাকা নেই—আমরা কী করব?'
তিনি বলেন, 'আমরা টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছি। সংসারের খরচ কমানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার তিনটি সন্তান আছে, তাদের শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কখনও কখনও আমাকে ধারও করতে হয়েছে।'
যারা এই পেশায় থেকে গেছেন, তাদের জন্য টিকে থাকার অর্থ এখন ক্রমশ দুটি কাজ করা।
৪০ বছর বয়সী মৌলি বাচ্চে দুই দশক ধরে ডাব্বাওয়ালা হিসেবে কাজ করছেন। তার দিন শুরু হয় সকাল সাতটায়, মুম্বাইয়ের একটি শহরতলিতে অবস্থিত বাড়ি থেকে।
সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে তিনি আশপাশের বাড়ি ও ছোট রান্নাঘরগুলো থেকে টিফিন সংগ্রহ করে শহরের বিভিন্ন অফিসগামী ট্রেনে তুলে দেন।
দুপুরের শুরুতেই সরবরাহের কাজ শেষ হয়। দুপুর দুইটায় শুরু হয় খালি বাক্স ফেরত দেওয়ার কাজ।
এরপর শুরু হয় তার দ্বিতীয় চাকরি। তিনি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে দোকানদারদের কাছ থেকে দৈনিক সঞ্চয়ের টাকা সংগ্রহ করেন। সব কাজ শেষে রাত প্রায় দশটায় বাড়ি ফেরেন।
ততক্ষণে তিনি প্রায় ১৫ ঘণ্টা কাজ করেন এবং শহরজুড়ে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করেন।
তার দুই সন্তান রয়েছে—একজন মেয়ে, যে স্কুলের শেষ বর্ষে পড়ছে, এবং একজন ছেলে, যে দশম শ্রেণিতে পড়ে এবং ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
তিনি বলেন, 'কোভিডের আগে আমি ২৫টি ডাব্বা সরবরাহ করতাম। তাদের মধ্যে কেউ এখন ঘরে বসে কাজ করছে, কেউ চাকরি হারিয়েছে—এখন মাত্র ১৫ জন গ্রাহক আছে।'
তিনি বলেন, 'ডাব্বাওয়ালার কাজ থেকে আয় খুবই কম। সবাই একাধিক কাজ করছে।'
এই পেশার বয়স্ক কর্মীদের উদ্বেগ নিজেদের জন্য নয়, বরং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
৩৫ বছর ধরে ডাব্বাওয়ালা হিসেবে কাজ করা বাবান কদম বলেন, 'আমাদের সময়ে আমরা কোনোমতে টিকে থাকতে পেরেছি। কিন্তু বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসবে না। সবাই বেশি আয়ের চাকরি বা ব্যবসা করতে চায়।'
মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রামদাস বাবান কারভান্ডে বলেন, এই নেটওয়ার্ক এখন আর আগের মতো শহরের সব এলাকায় সেবা দিতে পারে না।
সংগঠনটি এখন পালাভিত্তিক কাজের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, যাতে ডাব্বাওয়ালারা সকালের সরবরাহের পাশাপাশি খণ্ডকালীন অন্য কাজও করতে পারেন।
কারভান্ডে বলেন, 'এতে তারা অন্য কাজ বা ছোট ব্যবসা থেকে অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন।'
তবুও তিনি নিশ্চিত নন, এই ব্যবস্থা আর কতদিন টিকে থাকবে।
তিনি বলেন, 'আমরা আপাতত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে, তা বলতে পারি না।'
তবে আপাতত প্রতিদিন সকালে মুম্বাইয়ের ট্রেনগুলোতে এখনও দেখা যায় ইস্পাতের টিফিনবাক্সের স্তূপ নিয়ে ভিড়ের মধ্যে পথ করে এগিয়ে চলা মানুষদের। তারা এমন একটি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, যা একসময় শহরের গতিময়তার প্রতীক ছিল, কিন্তু এখন সেই শহরের পরিবর্তিত বাস্তবতার কাছেই পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
