শিশুদের জন্য ধূমপানের মতোই বিপজ্জনক সোশ্যাল মিডিয়া, চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন "ধূমপানের সমপর্যায়ের" হুমকি হিসেবে গণ্য হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে ব্রিটিশ 'একাডেমি অব মেডিক্যাল রয়্যাল কলেজেস'। সংস্থাটির একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ সরকারের 'অনলাইন বিশ্বে বেড়ে ওঠা' শীর্ষক একটি পরামর্শ প্রক্রিয়া মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় নাবালকদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার মতো সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা, অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা বা 'কারফিউ' নির্ধারণ এবং আসক্তিমূলক ফিচারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের মতো বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে একাডেমি সতর্ক করেছে, চিকিৎসকরা বর্তমানে কিছু উগ্রবাদী শিশুদের একটি ঢেউ লক্ষ্য করছেন যারা ইন্টারনেটে অত্যন্ত ঘৃণ্য, আসক্তিমূলক এবং মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক কন্টেন্টের সংস্পর্শে আসছে।
একাডেমির ৪৫৪ জন চিকিৎসকের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক চিকিৎসকই প্রতি সপ্তাহে অন্তত এমন একজন শিশুর চিকিৎসা করেন যার মানসিক কষ্ট বা শারীরিক আঘাত সরাসরি অনলাইন কন্টেন্টের সাথে যুক্ত। প্রতিবেদনে "পর্নোগ্রাফিক কর্মকাণ্ডের অনুকরণ" এবং সহিংসতা বা উগ্রবাদের প্রতি আগ্রহ থেকে তৈরি হওয়া মৃত্যু ও আঘাতের ভয়াবহ সব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এই মাসের শুরুতে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পর এই বিষয়ে নিজের প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের সাবেক স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়াকে তামাকের মতো বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, "এটি অত্যন্ত আসক্তিমূলক, আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং বড় বড় টেক কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ এড়াতে তামাক কোম্পানিগুলোর কৌশল অবলম্বন করছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের সন্তানদের তাদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য নিষেধাজ্ঞা হওয়া উচিত কেবল শুরু, শেষ নয়। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ লিখে দেওয়ার জন্য টেক মোগলদের হাতে কলম তুলে দিয়েছি। এখন সময় হয়েছে সেই কলম ফেরত নেওয়ার।"
অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে স্বজন হারানো পরিবারগুলো মঙ্গলবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন। তারা ১৬ বছরের কম বয়সীদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়া বিধিনিষেধ আরোপের সরকারি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ দেবেন। অস্ট্রেলিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুক্তরাজ্যেও এই ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার জন্য ব্যাপক দাবি উঠেছে, যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে কিছু মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
গত এপ্রিলে ব্রিটিশ মন্ত্রীরা ঘোষণা করেছিলেন, এই পরামর্শ প্রক্রিয়ার ফলাফল যাই হোক না কেন, তারা ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় "বয়স বা কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতা" চালু করবেন। এই গ্রীষ্মের মধ্যেই প্রস্তাবগুলো উন্মোচন করা হবে এবং বছরের শেষ নাগাদ আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই অবস্থান মূলত হাউজ অফ লর্ডসের চাপের মুখে এসেছে, যার নেতৃত্বে ছিলেন কনজারভেটিভ দলের সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী এবং একাডেমি চেইন প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ন্যাশ। লর্ড সভার সদস্যরা চারবার ভোট দিয়ে হাউস অব কমন্সকে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন এবং মন্ত্রীরা বিধিনিষেধ আরোপে রাজি হওয়ার পরেই কেবল এই দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান ঘটে।
লর্ড ন্যাশ বলেন, "সরকার পার্লামেন্টের কাছে অঙ্গীকার করেছে যে তারা ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো না কোনোভাবে বয়স বা কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতা আনবে। আমরা এখন আশা করি তারা সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণাঙ্গভাবে এবং দ্রুতই বাস্তবায়ন করবে। ক্ষতিকর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশের বয়স ১৬ বছর করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ আওয়াজ তুলেছে। আর আজ প্রধানমন্ত্রী সেই সব শোকার্ত বাবা-মায়েদের সাথে দেখা করবেন যারা ক্লান্তিহীনভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন যাতে তাদের মত অভিজ্ঞতা অন্য কারো সাথে না ঘটে। দয়া করে, এখন এটি বাস্তবায়ন শুরু করুন।"
এলেন রুম, যার ছেলে জুলস সুইনি ১৪ বছর বয়সে একটি অনলাইন চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে মারা যায় বলে তিনি মনে করেন; তিনি বলেন, "আমি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সন্তান হারানো অন্য পরিবারগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে বলব—সোশ্যাল মিডিয়া একটি পণ্য। আর অন্য যেকোনো ত্রুটিপূর্ণ পণ্য যা শিশুদের মৃত্যুর কারণ হয়, সেটির ব্যবহার ততক্ষণ পর্যন্ত সীমিত করা উচিত যতক্ষণ না দায়ী কোম্পানিগুলো এটি ঠিক করে এবং নিরাপদ প্রমাণ করে। আমরা আর কোনো জল্পনা-কল্পনা নিয়ে চলতে পারি না—আমাদের স্পষ্টতা প্রয়োজন।"
তবে শিশুদের নিয়ে কাজ করা অন্যান্য সংগঠনের একটি জোট সতর্ক করেছে যে, শুধুমাত্র বয়সসীমার ওপর মনোযোগ দিলে অনলাইন ক্ষতির নেপথ্যে থাকা কাঠামোগত কারণগুলো উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। '৫রাইটস ফাউন্ডেশন'-এর নেতৃত্বে এবং এনএসপিসিসি ও গার্লগাইডিংয়ের মতো সংগঠনগুলো নিয়ে গঠিত 'চিলড্রেন'স কোয়ালিশন ফর অনলাইন সেফটি' প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেল এবং পণ্যের ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে, যা মূলত তরুণ ব্যবহারকারীদের অ্যাপে আটকে রাখে।
একটি যৌথ বিবৃতিতে ২৫টি সংস্থা টার্গেট অ্যাডভার্টাইজিং এবং কারসাজিমূলক ডিজাইন ফিচার নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। সেই সাথে ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত পরিষেবা নিষিদ্ধ এবং ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ডিফল্ট নিরাপত্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কোনো কোম্পানি এই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে বড় অংকের জরিমানার বিধান রাখারও দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া শিশুদের ওপর ঝুঁকি মূল্যায়নসহ এআই ব্যবস্থার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং একজন স্বাধীন 'অনলাইন সেফটি কমিশনার' নিয়োগের দাবিও উঠেছে।
৫রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক লিয়ান্ডা ব্যারিংটন-লিচ বলেন, "ফিচার পরিবর্তন করে বা কেবল বয়সসীমার ওপর নির্ভর করে আমরা এর সমাধান করতে পারব না। সমস্যাটি কোনো একক পণ্য বা সেটিংয়ে নয়; এটি ব্যবস্থার মধ্যেই গেঁথে আছে। এমন ব্যবসায়িক মডেল এবং ডিজাইনের মাধ্যমে শিশুদের কল্যাণের চেয়ে এনগেজমেন্ট, ডেটা সংগ্রহ এবং মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অফলাইনে কোনো পণ্য শিশুদের জন্য অনিরাপদ হলে বাজারে সেটি অনুমোদন পেত না। অনলাইনেও আমাদের একই যুক্তি বজায় রাখতে হবে। নিজেদের পরিষেবা শিশুদের জন্য নিরাপদ—সেটি প্রমাণ করার দায়িত্ব এই ব্যবসাগুলোর হওয়া উচিত, বাবা-মা বা শিশুদের ওপর সেই ঝুঁকি সামলানোর ভার ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।"
দাতব্য সংস্থা এনএসপিসিসি বলেছে, শিশুদের নিরাপদ রাখার চেয়ে মুনাফাকে টেক কোম্পানিগুলোর অগ্রাধিকার দেওয়া "আর চলতে দেওয়া যায় না।" সংস্থাটির শিশু বিষয়ক নীতি নির্ধারণী প্রধান রানি গোভেন্দার বলেন, রাজনীতিবিদদের অবশ্যই এমন একটি পথ তৈরি করতে হবে যেখানে "প্রতিটি ডিভাইস, ফিচার এবং এআই টুলে শুরু থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যকতা থাকবে। এতে শিশুরা ক্ষতিকর বা অবৈধ কন্টেন্টের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পাবে এবং তারা বয়স অনুযায়ী সেবা পাবে। এটি আসক্তিমূলক ডিজাইনের কৌশলগুলোও বন্ধ করবে যা তরুণ ব্যবহারকারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রলিং, গেমিং এবং ভিডিও দেখতে বাধ্য করে।"
সরকারের একজন মুখপাত্র এ প্রসঙ্গে বলেন, "অনলাইনে ইতিবাচক ও নিরাপদ অভিজ্ঞতা পাওয়ার অধিকার সবারই আছে, বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের। সে কারণেই আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশাধিকার সীমিত করা থেকে শুরু করে সম্ভাব্য 'অ্যাপ কারফিউ'র মতো ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছি যাতে তরুণদের ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং ভারসাম্যতা বজায় রাখা যায়।"
তিনি আরও যোগ করেন, "পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমরা বাবা-মা, তরুণ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিচ্ছি। ইতিমধ্যে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। আমরা অনলাইন ক্ষতি মোকাবিলায় আরও বড় পদক্ষেপ নিচ্ছি। 'অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট'-এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কী দেখছেন তার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ পাবেন এবং ক্ষতিকর সামগ্রী থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।"
