সিএনএনের বিশ্লেষণ: ইরানের সাথে ট্রাম্পের সম্ভাব্য চুক্তি কেন যুদ্ধ ঘোষণার মতোই বিতর্কিত হবে
মার্কিন পার্লামেন্টের প্রতিনিধি পরিষদ-কংগ্রেস বা দেশটির জনগণের সাথে সামান্যতম আলোচনা না করেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন ট্রাম্প। পরিকল্পনাহীন সেই যুদ্ধ শেষ করার একমাত্র উপায় হতে পারে একটি শান্তি চুক্তি, যেটি আবার সব পক্ষের কাছে সন্তোষজনক না-ও হতে পারে। এই চুক্তিটি হয়তো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে ভবিষ্যতের জন্য ঝুলিয়ে রাখবে, এমনকী মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিরোধকে আরও গভীর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, ইরানের সাথে তাঁর শুরু করা সংঘাত থামানোর একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি এবং এটি যেকোনো সময় চূড়ান্ত হতে পারে। তবে অতীতে তাঁর এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী অনেক সময়ই অবাস্তব বা ইরানের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে না পারার ফল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
তাই তেহরানের সাথে একটি কাঠামো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে তাঁর সাম্প্রতিক দাবিকে ওয়াশিংটনে সংশয় ও বিভ্রান্তির সাথেই দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান কট্টরপন্থীদের উভয় পক্ষই মনে করছে, ট্রাম্প একটি ত্রুটিপূর্ণ বা দুর্বল চুক্তির সামনে আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন।
তা সত্ত্বেও, কূটনৈতিক মহলের গুঞ্জন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানি জাহাজ ও বন্দরের ওপর মার্কিন অবরোধ শিথিল করার বিষয়ে একটি সমঝোতা খুব কাছাকাছি সময়ে হতে পারে। আর বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির বাইরে গিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তিকে বিশ্বজুড়ে স্বাগত-ও জানানো হবে, কারণ এটি যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনের আশা জাগাবে।
মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং কট্টর মতাদর্শের কারণে এই ইরান যুদ্ধ শুরু থেকেই একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তবে তাসের চাল যাই হোক না কেন, রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের এখানে সহজে জয়ী হওয়ার সুযোগ কম। জনমত জরিপ বলছে, বেশিরভাগ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী। ফলে ট্রাম্প যদি আবার ইরানে নতুন কোনো হামলার নির্দেশ দেন, তবে তিনি তীব্র জনরোষের মুখে পড়বেন, যা যুদ্ধকে আরও উস্কে দেবে এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। কিন্তু যুদ্ধ থেকে পিছু হটার এই সম্ভাব্য চুক্তিটিকেও ট্রাম্প নিজের 'বিরাট বিজয়' হিসেবে প্রচার করতে পারবেন না।
চুক্তির যে সমস্ত বিবরণ সামনে আসছে, তা আমেরিকার দরকষাকষির অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে:
# সম্পদ অবমুক্তকরণ: তেহরানকে হরমুজ প্রণালি খুলতে রাজি করাতে ওয়াশিংটন ইরানের অবরুদ্ধ কিছু সম্পদ অবমুক্ত করতে পারে এবং মার্কিন নৌ অবরোধ ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নিতে পারে। এটি প্রকারান্তরে যুদ্ধে ইরানের তৈরি করা চাপ বা কৌশলগত সুবিধাকেই স্বীকৃতি দেবে।
# পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি ও সংক্ষিপ্ত সময়সীমা: ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর মৌখিক বা লিখিত প্রতিশ্রুতি ওয়াশিংটনে চরম সন্দেহের মুখোমুখি হবে। এছাড়া সমৃদ্ধকরণ এবং ইউরেনিয়ামের মজুতের মতো জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তাবিত ৬০ দিনের সময়সীমা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ইতিহাস বলে, ইরান সবসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অমীমাংসিত কূটনৈতিক জালে আটকে রাখতে পছন্দ করে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর আরও অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে তারা এই চুক্তিটি পুরোপুরি মেনে নেবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, অনেক বিষয়ে একটি "বোঝাপড়া" তৈরি হলেও চুক্তিটি এখনো আসন্ন নয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়, যা আমেরিকার জন্য চুক্তি ভঙ্গের বড় কারণ হতে পারে।
এই অবস্থায় নিজের দলের নেতারাই এখন ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যাতে তিনি তেহরানের সামনে মাথা নত না করেন। নর্থ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস সিএনএন-কে বলেন, "মাত্র ১১ সপ্তাহ আগে প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) আমাদের বলেছিল, যে তারা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং পারমাণবিক উপাদান নিয়ন্ত্রণে নেওয়া স্রেফ সময়ের ব্যাপার। আর এখন আমরা এমন এক চুক্তির কথা বলছি, যেখানে ইরানের ভেতরেই পারমাণবিক উপাদান রেখে দেওয়ার শর্ত মেনে নেওয়া হচ্ছে? এর কোনো যৌক্তিকতা আছে?"
মার্কিন সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, এই মুহূর্তে চুক্তি করা হবে আমেরিকার "দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ"। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে ছেড়ে দিলে— তা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দেবে।
তবে মার্কিন-ইসরায়েলি তীব্র হামলা সত্ত্বেও তেহরানের প্রতিরোধ ভাঙা সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান ইতিমধ্যেই ড্রোন উৎপাদন শুরু করেছে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে। ফলে যুদ্ধ আবার শুরু হলে তা উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মার্কিন ঘাঁটির ওপর আরও মারাত্মক ইরানি পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি বাড়াবে।
ডেমোক্র্যাটদের তোপ ও অর্থনৈতিক সমীকরণ
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা শুরু থেকেই এই যুদ্ধের সমালোচনা করে আসছেন এবং এখন এর সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়েও ট্রাম্পকে ছেড়ে কথা বলছেন না। নিউ জার্সির ডেমোক্র্যাট সিনেটর কোরি বুকার বলেন, "প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতে এই যুদ্ধে গেছেন। কিন্তু এই চুক্তি সেই সমস্যার সমাধান করছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখানে বোকার মতো আচরণ করছেন।"
ম্যারিল্যান্ডের সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন এটিকে একটি বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, "আপনি যখন নিজে একটি গর্ত খুঁড়ছেন, তখন আপনার প্রথম কাজ হওয়া উচিত খোঁড়া বন্ধ করা। মনে হচ্ছে, আমরা অবশেষে সেটাই করছি।"
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে একে "অযৌক্তিক" বলে দাবি করেছেন এবং ট্রাম্পের পাশেই দাঁড়িয়েছেন।
মার্কিন ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি নাকি শুধুই আশ্বাস?
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান শিবির এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক মোড়ক দেওয়ার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট দাবি করেছেন, চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হবে এবং জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি নেতিবাচক বা ঋণাত্মক হতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এতটা আশাবাদী হতে পারছেন না। জেপি মরগানের মতো শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ বন্ধ থাকার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে এবং বছরের বাকি সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গড়ে প্রতি ব্যারেলে ৯৭ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে দুটি বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে: প্রথমত, এই চুক্তিটি কি ২০১৫ সালে ইরানের সাথে করা ওবামা প্রশাসনের চুক্তির চেয়ে বেশি কার্যকর হবে? এবং দ্বিতীয়ত, ওবামার চুক্তি বাতিল করা এবং এই যুদ্ধ—যা মার্কিন সেনা ও শত শত ইরানির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে—তা কি প্রকৃতপক্ষে ইরান ইস্যুতে ঢাকঢোল পেটানোর মতো যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করাতে পেরেছে?
