ইরান যুদ্ধের অচলাবস্থা ট্রাম্পকে আরও খারাপ অবস্থায় ফেলতে পারে
ইরান যুদ্ধের দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো স্পষ্ট সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এই ঝুঁকির মুখে পড়েছেন যে ইরানের সঙ্গে এই অচলাবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে। এতে আরও বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে, যা কেবল আমেরিকার জন্যই নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই। এমনকি সমস্যাটি যুদ্ধ শুরু করার আগের চেয়েও আরও বেশি বড় হতে পারে।
এই যুদ্ধে উভয়পক্ষই আত্মবিশ্বাসী যে তারা এগিয়ে রয়েছেন এবং তাদের অবস্থান একে অপরের থেকে অনেক দূরে। তাই আলোচনার মধ্যে দিয়ে সমাধান বা বের হওয়ার পথ চোখে পড়ছে না। যদিও ইরান নতুন করে আলোচনার একটি প্রস্তাব দিয়েছে, তবে ট্রাম্প শুক্রবার তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য চলমান এই অচলাবস্থার প্রভাব বেশ গুরুতরই বলা যায়।
একটি অমীমাংসিত সংঘাতের অর্থ হতে পারে সম্ভবত বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও বেড়েছে জ্বালানির দাম। আর এটি অব্যাহত থাকতে পারে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে একদিকে যেমন ট্রাম্পের পক্ষে জনমত কমছে, অন্যদিকে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অপূরণীয় লক্ষ্য
যদিও এ বিষয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তবুও ট্রাম্পের প্রায়ই পরিবর্তনশীল লক্ষ্য (শাসনক্ষমতা পরিবর্তন থেকে শুরু করে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ বন্ধ করা পর্যন্ত) অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে।
গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্প তার আলোচকদের পাকিস্তান সফর বাতিল করার পরে এবং গত ৮ এপ্রিল স্থগিত থাকা যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ করতে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার আশঙ্কা বেড়েছে।
তেহরান প্রস্তাব দিয়েছিল সংঘাত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখতে হবে। এটি ট্রাম্পের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ, তিনি শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার কিছুটা আশার আলো দেখা যায় যখন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, তেহরান পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এই প্রস্তাবে 'সন্তুষ্ট নন', যদিও তিনি বলেন, ফোনে যোগাযোগ চলছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ইরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করতে ব্যর্থ হলে তা ট্রাম্পের জন্য হবে বড় একটি ধাক্কা।
'তাকে এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখা হবে যিনি বিশ্বকে কম নিরাপদ করেছেন', বলেন ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ড।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের 'হতাশা' বাড়ছে। ট্রাম্প 'সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এবং সবচেয়ে ভালো চুক্তিটি করার জন্য তার কাছে প্রয়োজনীয় সময় রয়েছে'।
শত্রুতা পুনরায় শুরু?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ অনিশ্চিত এবং স্পষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্য না থাকায় ট্রাম্প ব্যক্তিগত বৈঠকগুলোতে ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ সম্ভবত আরও কয়েক মাস চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উত্থাপন করেছেন। আর এর লক্ষ্য ইরানের তেল রপ্তানি আরও কমিয়ে এনে দেশটিকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে বাধ্য করা।
গত বৃহস্পতিবার অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, একই সময়ে ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ পুনরায় শুরু করার পথও খোলা রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) 'সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী' ধারাবাহিক হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির একটি অংশ দখল করে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করার বিকল্প উপায় প্রস্তুত করেছে।
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বলেন, এই যুদ্ধের কারণে যেসব দেশের সরকারের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক চাপের মধ্যে, সেসব সরকার ধারণা করছে ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
'এটি কীভাবে দ্রুত শেষ হবে তা বোঝা কঠিন', নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন এক কূটনীতিক।
অবস্থানে অনড় ইরান
ইরানের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী চাপ সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে ইরান জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন সংকট তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, যুদ্ধের পরেও এই অস্ত্র নিজেদের হাতেই থাকবে জেনে ইরান আরও সাহসী হয়ে উঠবে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যান বলেন, 'ইরান বুঝতে পেরেছে, দুর্বল অবস্থায় থাকলেও তারা ইচ্ছামতো প্রণালিটি বন্ধ করতে পারে। এই জ্ঞান ইরানকে যুদ্ধের আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।'
