আলোচনার দুয়ার খুলেছে পাকিস্তান, সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ইসলামাবাদ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়ে নিবিড় আলোচনায় রূপ নেওয়ায়, পাকিস্তানের বিস্তৃত কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ক্রমেই গুরুত্ব দিচ্ছেন মার্কিন গবেষকরা।
টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। তিনি জানান, দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হয়নি।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, আলোচনা সফল করতে জোরালো চেষ্টা চালিয়েছে পাকিস্তান।
তিনি বলেন, 'আলোচনায় যেসব ঘাটতি ছিল, তা পাকিস্তানিদের কারণে নয়। তারা অসাধারণ কাজ করেছে এবং আমাদের ও ইরানিদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সত্যিই চেষ্টা করেছে।'
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।
পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মতবিনিময় ও লিখিত প্রস্তাবও বিনিময় হয়েছে, যা একটি কাঠামোবদ্ধ ও আনুষ্ঠানিক আলোচনার ইঙ্গিত দেয়।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তানের ভূমিকা সহায়ক থেকে সরাসরি মধ্যস্থতাকারী ও শান্তি আলোচকের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সমঝোতার পথে আনতে জটিল ও সংবেদনশীল প্রচেষ্টায় পাকিস্তান নেতৃত্বের আসনে রয়েছে।
কুগেলম্যান আরও বলেন, আগের উদাহরণগুলোর তুলনায় বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অনেক বেশি জটিল।
তিনি উল্লেখ করেন, কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ বা যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকার উদাহরণ টানলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রচন্ড বৈরি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নিরসনের এই প্রচেষ্টা অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী এবং কঠিন কাজ।
স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রাম পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। গত এক বছরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছে পাকিস্তান।
থ্রেলকেল্ড বলেন, চীনের সঙ্গেও পাকিস্তানের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। এই সংঘাত চলাকালীন এবং তার আগেও পাকিস্তান নীরবে বিভিন্ন পক্ষ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি আরও বলেন, এই ক্ষেত্রে পাকিস্তান অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে বৈঠক আয়োজনে সক্ষম হয়েছে, যদিও যখন এই সংঘাতে তাদের নিজেদের ঝুঁকিও ছিল।
থ্রেলকেল্ড বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পৃক্ততার কূটনৈতিক সুফলও পেয়েছে ইসলামাবাদ।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পাকিস্তান দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পেরেছে এবং এই ভূমিকা পালনের মাধ্যমে তা এক ধরনের সাফল্য হিসেবে ধরা যায়।
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ড্যানিয়েল মার্কে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার বহুমাত্রিক পরিবর্তনের দিকটি তুলে ধরেছেন।
তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি পুনঃপ্রকাশ করে বলেন, প্রায় ঠিক এক বছরের ব্যবধানে তোলা এই ছবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে মার্কিন গবেষকদের মতামত পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়।
কুগেলম্যান পাকিস্তানের উন্নীত ভূমিকাকে 'নেতৃত্বের আসনে থাকা' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
থ্রেলকেল্ড প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং নীরব কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদানের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে মার্কে এই ঘটনাপ্রবাহকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখেছেন।
একটি বিষয়ে মার্কিন বিশ্লেষকরা একমত, দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলেও, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান এখন আর শুধু আয়োজক বা সহায়ক নয়; বরং বর্তমানে চলমান সবচেয়ে সংবেদনশীল আলোচনাগুলোর একটিকে সক্রিয়ভাবে প্রভাবিত করছে।
