কুখ্যাত আলকাট্রাজ কারাগার পুনরায় খুলতে ১৫২ মিলিয়ন ডলার বাজেট প্রস্তাব করেন ট্রাম্প
২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অংশ হিসেবে আমেরিকার কুখ্যাত আলকাট্রাজ কারাগার পুনরায় খোলার উদ্যোগ নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য তিনি ১৫ কোটি ২০ লাখ (১৫২ মিলিয়ন) ডলার বা ১১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড বাজেট চেয়েছেন।
সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট ব্রিজের কাছে অবস্থিত এই কারাগারটি 'দ্য রক' নামেও পরিচিত। একসময় একে আমেরিকার অন্যতম ভয়ংকর ও কুখ্যাত কারাগার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, 'আলকাট্রাজকে একটি অত্যাধুনিক ও সুরক্ষিত কারাগার হিসেবে পুনরায় গড়ে তুলতে' এই অর্থের প্রয়োজন। মূলত প্রথম বছরের খরচ মেটাতেই এই তহবিল চাওয়া হয়েছে।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কয়েকজন রাজনীতিক এই পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রকল্পের চূড়ান্ত খরচ কত দাঁড়াবে এবং আলকাট্রাজকে একটি সক্রিয় কারাগার হিসেবে চালানোর ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তার এই কারাগারটি ১৯৬৩ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এর দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ট্রাম্প প্রশাসনের এই বাজেট প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি একে 'পুরোপুরি অযৌক্তিক' বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, 'এটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত।'
পেলোসি আরও বলেন, 'আলকাট্রাজকে আধুনিক কারাগারে রূপান্তরের ভাবনাটি একটি বোকামি। এটি জনগণের করের টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয় এবং একই সঙ্গে এটি মার্কিন জনগণের বুদ্ধিমত্তার প্রতি এক চরম অপমান।'
এই প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাস হতে হবে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার সমালোচনা আগে থেকেই চলে আসছে। সমালোচকরা বলছেন, ওই দ্বীপে সুপেয় পানি বা পয়োনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই এছাড়া সেখানকার প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র নৌকায় করে নিয়ে যেতে হয়, যা বেশ ঝামেলার। মার্কিন কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের (ব্যুরো অব প্রিজনস) তথ্যমতে, আলকাট্রাজ বন্ধ হওয়ার আগে অন্যান্য যেকোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের তুলনায় এটি চালানো তিনগুণ বেশি ব্যয়বহুল ছিল।
উল্লেখ্য, অভ্যন্তরীণ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ট্রাম্প সম্প্রতি প্রতিরক্ষা খাতে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট চেয়েছেন। আর এর মধ্যেই কুখ্যাত আলকাট্রাজ পুনরায় খোলার এই নির্দেশ সামনে আসে।
ন্যান্সি পেলোসি আরও একটি বড় উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। সান ফ্রান্সিসকোর অন্যান্য রাজনীতিকরাও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, আলকাট্রাজকে আবার সক্রিয় কারাগারে রূপান্তর করলে শহরটি তার একটি 'আইকনিক ল্যান্ডমার্ক' হারাবে। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জায়গাটি থেকে প্রতি বছর ৬ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪ কোটি পাউন্ড রাজস্ব আয় হয়।
এই কারাগার পুনরায় চালু করতে যে অর্থ চাওয়া হয়েছে, তা মূলত ব্যুরো অব প্রিজনস-এর জন্য ১.৭ বিলিয়ন ডলার বা ১.৩ বিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনারই একটি অংশ।
গত বছর 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ নিজের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, 'আলকাট্রাজকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ ও পুনরায় নির্মাণের জন্য আমি ব্যুরো অব প্রিজনস, বিচার বিভাগ, এফবিআই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে নির্দেশ দিচ্ছি।' ট্রাম্পের ভাষায়, এই কারাগারে 'আমেরিকার সবচেয়ে নির্মম এবং সহিংস অপরাধীদের রাখা হবে।'
আলকাট্রাজ মূলত একটি নৌ প্রতিরক্ষা দুর্গ ছিল। পরে এটিকে সামরিক কারাগারে পরিণত করা হয়। ১৯৩০-এর দশকে বিচার বিভাগ এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর একে কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল কারাগার হিসেবে রূপান্তর করা হয়।
এই কারাগারের সবচেয়ে কুখ্যাত বন্দিদের মধ্যে ছিলেন আল ক্যাপোন, মিকি কোহেন এবং জর্জ 'মেশিন গান' কেলির মতো চরম ভয়ংকর গ্যাংস্টাররা।
আলকাট্রাজ কারাগারকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো সিনেমাও তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৬২ সালে বার্ট ল্যাঙ্কাস্টার অভিনীত 'বার্ডম্যান অব আলকাট্রাজ', ১৯৭৯ সালে ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনীত 'এসকেপ ফ্রম আলকাট্রাজ' এবং ১৯৯৬ সালে শন কনারি ও নিকোলাস কেজ অভিনীত ব্লকবাস্টার সিনেমা 'দ্য রক'।
চারপাশের বরফশীতল পানি ও তীব্র স্রোতের কারণে এখান থেকে পালানো ছিল প্রায় অসম্ভব। এই দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাই এটিকে এত বেশি কুখ্যাত করে তুলেছিল। তবে ১৯৬২ সালে তিন বন্দির এক দুঃসাহসিক পলায়ন প্রচেষ্টা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল।
