হরমুজ প্রণালি না খুলেই ট্রাম্প ইরান ছাড়লে যে ৩ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন যে, তিনি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়টি নিশ্চিত না করেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে ইচ্ছুক।
যুদ্ধ শুরুর পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ তারা এই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ওপর 'অত্যন্ত কঠোর' আঘাত হানবে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় সব লক্ষ্যই পূরণ হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, 'আজ রাতে আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমাদের মূল কৌশলগত লক্ষ্যগুলো প্রায় শেষের পথে... গত চার সপ্তাহে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, চূড়ান্ত এবং অভাবনীয় বিজয় অর্জন করেছে। এমন বিজয় আগে খুব কম মানুষই দেখেছে।'
বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে তেহরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকেই এই জলপথটি ওয়াশিংটনের মিত্রদের জন্য প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পারাপার হয়। এটি বন্ধ থাকায় তেলের দাম গত প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিশ্বজুড়ে সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ইরানের ক্ষমতাসীনদের আলোচনার টেবিলে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলা আরও জোরদার করেছে। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। তবে বুধবার ট্রাম্প বলেন, 'আমেরিকা এবং পুরো বিশ্বের প্রতি ইরানের এই অশুভ হুমকির অবসান ঘটাতে আমরা একদম দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। আমাদের হাতেই এখন সব নিয়ন্ত্রণ। তাদের কাছে কিছুই নেই।'
হরমুজ প্রণালী: একটি সরু জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে ইরান
বাজার ও ভোটারদের আশ্বস্ত করতে মঙ্গলবার ট্রাম্প জানান, মার্কিন বাহিনী 'খুব শিগগিরই ফিরে আসবে'। এ জন্য তিনি দুই থেকে তিন সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সরে যাওয়ার জন্য ইরানকে 'কোনো চুক্তি করতে হবে না'।
ট্রাম্প বলেন, 'বিশ্বের যেসব দেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল গ্রহণ করে... তাদেরই এই পথের দেখভাল করা উচিত। আপনারাই এর নিয়ন্ত্রণ নিন, একে রক্ষা করুন এবং নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করুন।' মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশগুলো—ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইনকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, 'তারা দারুণ ভূমিকা রেখেছে। আমরা কোনোভাবেই তাদের আঘাত পেতে বা ব্যর্থ হতে দেব না।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা এখন মধ্যপ্রাচ্যের ওপর থেকে পুরোপুরি স্বাধীন। তারপরও আমরা সাহায্য করতে সেখানে আছি... আমাদের সেখানে থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমাদের তাদের তেলের প্রয়োজন নেই। তাদের যা আছে তার কিছুই আমাদের দরকার নেই... আমরা শুধু মিত্রদের সাহায্য করতে সেখানে আছি।'
ট্রাম্প জানান, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল 'অপারেশন এপিক ফিউরি'। তিনি দাবি করেন, এই অভিযান 'যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, চূড়ান্ত এবং অভাবনীয় বিজয় এনে দিয়েছে। এমন বিজয় আগে খুব কম মানুষই দেখেছে।'
চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধ থেকে সরে আসার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে হরমুজ প্রণালী সমস্যার সমাধান না করেই তারা ফিরে গেলে এর পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে এখন সবার নজর। এ ক্ষেত্রে তিনটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে:
১. যুদ্ধ শেষ হবে, কিন্তু কোনো চুক্তি হবে না
মার্কিন গণমাধ্যম মঙ্গলবার জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই সন্দিহান হয়ে পড়ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প তার সহযোগীদের বলেছেন যে তিনি হরমুজ প্রণালী না খুলেই যুদ্ধ শেষ করতে রাজি। এদিকে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, চার থেকে ছয় সপ্তাহের পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই জলপথটি খোলা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা।
দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ বন্ধ থাকার কোনো নজির নেই। আর এটি বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা ও তা ধরে রাখতে ইরানকেও যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সুস্পষ্ট সমাধান ছাড়াই যুদ্ধ শেষ হলে বিশ্বকে জ্বালানির জন্য আরও চড়া মূল্য চোকাতে হবে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ড্যান ব্রুইলেট ফক্স বিজনেসকে বলেন, কোনো চুক্তি ছাড়া ফিরে আসাটা হবে 'ভীষণ সমস্যামূলক'।
ব্রুইলেট বলেন, 'যদি এমনটা হয়, তবে ইরান ঠিক যা চায় তা-ই পাবে। তারা একটি যুদ্ধবিরতি পাবে। জলপথের এই নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতেই থেকে যাবে। এটিকে তখন চুক্তির চেয়ে বরং খেলা থামিয়ে বিশ্রাম বা টাইমআউট নেওয়ার মতোই মনে হবে। এর মানে দাঁড়ায়, আপনি শুধু এই সমস্যাটিকে ভবিষ্যৎ সরকার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন।'
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ৪ ডলার এবং প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার হওয়া কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। তিনি আরও যোগ করেন, কৃষিকাজের জন্য ইউরিয়া এবং ডেটা সেন্টারের জন্য হিলিয়ামের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও এই প্রণালী দিয়েই পারাপার হয়।
২. বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নেবে ইরান
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান গ্যাসব্যাডির প্রধান পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান সিএনএনকে বলেন, চুক্তি ছাড়া ফিরে আসার অর্থ 'মূলত ইরানের হাতে প্রণালীটি সমর্পণ করা। এর ফলে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিশ্চিত হবে। কারণ তখন ইরান স্বাধীনভাবে জাহাজগুলোতে হামলা চালাতে পারবে এবং টোল বা মাশুল আদায় করতে পারবে।'
হরমুজ মূলত ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। তবে এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচিত এবং সাধারণত সব জাহাজের জন্যই উন্মুক্ত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান এই পথে বেছে বেছে অবরোধ আরোপ করেছে। নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তারা কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তিও করেছে। এখন তারা এই পদক্ষেপটিকে আইনে পরিণত করার আশা করছে।
লয়েড'স লিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে খুব অল্প কয়েকটি জাহাজ আগে থেকে অনুমোদিত পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পেরেছে। আইআরজিসি-র চালু করা একটি 'টোল বুথ' ব্যবস্থার মাধ্যমে এই পারাপার চলছে।
ইরানের আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরুজেরদি দাবি করেছেন, নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরান ২ মিলিয়ন ডলার করে মাশুল নিচ্ছে। ব্লুমবার্গকে একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে এই মাশুল প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার কথা ভাবছে ইরান।
সমুদ্র আইনের আওতায় এমন পদক্ষেপ সম্ভবত অবৈধ বলে গণ্য হবে এবং চারপাশ থেকে সমালোচনার জন্ম দেবে। যেভাবেই হোক, তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে এশিয়ার শক্তিশালী দেশগুলো অবশিষ্ট জ্বালানিটুকু কিনে নেবে। তখন উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও দামের দিক দিয়ে ইউরোপ পিছিয়ে পড়বে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা পিলসবুরির অংশীদার ম্যাথিউ ওরেসমান দি ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, সব দেশের জন্য অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত না করেই ট্রাম্প যদি পিছিয়ে যান, তবে পরিস্থিতি বদলে যাবে। তখন ইউরোপীয়, এশীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে 'সরাসরি ইরানের সঙ্গে যাতায়াত চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আক্ষরিক অর্থে মুক্তিপণ দিয়েই তাদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'প্রণালীটিকে অনিরাপদ অবস্থায় ফেলে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হলো ভবিষ্যতের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাতের পথ তৈরি করা। এর ফলে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতের জন্য একটি চিরস্থায়ী অজুহাত তৈরি হবে।'
৩. যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াই অন্য দেশগুলো প্রণালী খুলে দেবে
ইউরোপ এবং এশিয়ার সরকারগুলো ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় পরিস্থিতি এড়ানোর উপায় খুঁজছে।
বুধবার স্যার কিয়ের স্টারমার জানিয়েছেন, 'উপসাগরজুড়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা' নিশ্চিত করার এক অভিন্ন লক্ষ্যে ৩৫টি দেশকে একত্রিত করেছে যুক্তরাজ্য। প্রণালীটি পুনরায় খোলার উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সপ্তাহে তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক করবেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জোট 'নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ মূল্যায়ন করবে। এছাড়া আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চলাচল পুনরায় শুরু করতে তারা কাজ করবে।'
ওরেসমান বলেন, 'এর বিকল্প হিসেবে, হরমুজ প্রণালীতে লক্ষ্যবস্তু করা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে এই দেশগুলোকে নিজেদের মানুষ ও সম্পদের ঝুঁকি নিতে হবে।'
তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নৌবাহিনী প্রত্যাহার করে নিলে জোটের কোনো সদস্যই যে ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াবে, এমন কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। তাছাড়া সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ জনগণও আক্রমণাত্মক হামলায় যোগ দেওয়ার এই ধারণার বিপক্ষে অবস্থান করছে।
প্রণালীর ভেতর দিয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করার বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করতে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে সামরিক পরিকল্পনাবিদদের পাঠিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া কোনো চুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখনও অস্পষ্টই রয়ে গেছে।
