যুদ্ধের মধ্যে দায়িত্ব নেয়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা কে এই মোজতবা খামেনি?
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এই খবর জানিয়েছে আল জাজিরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা হামলার প্রথম দিনে আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবাকে বেছে নেওয়া হলো।
৫৬ বছর বয়সী এই কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতার বাবা আলী খামেনির পাশাপাশি ওই একই হামলায় তার মা, স্ত্রী এবং এক বোনও নিহত হন। তবে মোজতবা খামেনি সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে। ফলে ইরানের ওপর চলমান তীব্র বোমা হামলার মধ্যেও তিনি বেঁচে আছেন।
ইরানের ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস)—যারা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত—সব ইরানিকে ঐক্য বজায় রাখার এবং মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে পরিষদ জানিয়েছে যে, খামেনি একটি 'চূড়ান্ত ভোটের' ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েছেন। পরিষদ সব ইরানিকে, বিশেষ করে 'সেমিনার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী এবং অভিজাতদের' প্রতি 'নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ এবং ঐক্য বজায় রাখার' আহ্বান জানিয়েছে।
মোজতবা খামেনি কখনও কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি বা গণভোটের মুখোমুখি হননি। তবে কয়েক দশক ধরে তিনি পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তিনি অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোজতবাকে তার বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নাম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তার বাবা আলী খামেনি প্রায় ৮ বছর প্রেসিডেন্ট এবং এরপর ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। মোজতবার এই ক্ষমতা গ্রহণ ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থী অংশটির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি আরও আভাস দিচ্ছে যে, তেহরান সরকার এই মুহূর্তে কোনো ধরনের সমঝোতা বা আলোচনায় আগ্রহী নয়।
মোজতবা খামেনি কখনও উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা করেননি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে পাহলভি রাজতন্ত্রের মতো তার এই ক্ষমতা গ্রহণ কার্যত একটি নতুন 'রাজবংশ' তৈরির সমতুল্য হবে বলে বিতর্ক রয়েছে। তবে তিনি নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন। তাকে জনসমক্ষে বক্তৃতা বা জুমার খুতবা দিতে দেখা যায়নি। এমনকি অনেক ইরানি কখনও তার কণ্ঠস্বরও শোনেননি, যদিও তিনি যে ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছিলেন, তা সবারই জানা ছিল।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশে ও বিদেশের বিরোধীরা মোজতবা খামেনির নাম বিক্ষোভকারীদের দমনের সঙ্গে যুক্ত করে আসছেন। ২০০৯ সালের 'গ্রিন মুভমেন্ট'-এর সময় মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর আইআরজিসি-র বাসিজ বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রথম তুলেছিল সংস্কারপন্থী শিবির।
সেই থেকে বাসিজ বাহিনী শাসনবিরোধী প্রতিটি আন্দোলন দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে দুই মাস আগে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে বাসিজ কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতে সরকারি বাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তবে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা ও প্রশাসন এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত 'সন্ত্রাসী' ও 'দাঙ্গাবাজদের' দায়ী করে আসছে।
মোজতবা খামেনি তার তরুণ বয়সেই আইআরজিসি-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি বাহিনীর 'হাবিব ব্যাটালিয়ন'-এ যুক্ত থেকে একাধিক অভিযানে অংশ নেন। তার সেই সময়কার অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিভাগে শীর্ষ পদে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা মোজতবা খামেনি বিভিন্ন দেশে বিপুল সম্পদের মালিক বলেও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে। যদিও তাঁর নামে সরাসরি কোনো লেনদেনের প্রমাণ নেই, তবে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর বিলিয়ন ডলার লেনদেন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্লুমবার্গ তাকে আলী আনসারির সঙ্গে যুক্ত করেছে, যার মালিকানাধীন 'ব্যাংক আয়ান্দেহ' দেউলিয়া হওয়ার পর গত বছর বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
মোজতবা খামেনির ধর্মীয় পদমর্যাদা নিয়েও কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। তিনি বর্তমানে একজন 'হুজ্জাতুল ইসলাম' (মধ্যম স্তরের ধর্মগুরু), যেখানে সর্বোচ্চ নেতা হতে 'আয়াতুল্লাহ' পদমর্যাদার প্রয়োজন হয়। তবে তার বাবা ১৯৮৯ সালে যখন নেতা নির্বাচিত হন, তখন তিনিও আয়াতুল্লাহ ছিলেন না এবং তার জন্য আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। মোজতবার ক্ষেত্রেও একই ধরণের আপস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
