টাকা না দিলে গুগল ম্যাপসে ‘বাজে’ রিভিউ লিখছে বিভিন্ন চক্র; পাকিস্তান-বাংলাদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকের ঘটনা। স্পেনের বাসাবদল বা মালামাল আনা-নেওয়ার সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান 'সার্ভিমুভিং'-এর ব্যবস্থাপক পাবলো সানচেজ অফিসে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন, অনলাইনে অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটছে। গুগল ম্যাপসে তাদের কোম্পানির পেজে একের পর এক 'রিভিউ' আসছে। তবে ভালো কিছু নয়, সবই 'ওয়ান স্টার' রেটিং।
পাবলো বলেন, 'শুরুতে আমরা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলি। জানার চেষ্টা করি, কোনো গ্রাহক আমাদের সেবায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন কি না। কিছুক্ষণ পরই আরেকটি বাজে রিভিউ এল, এরপর আরেকটি... আমরা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম।'
প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই বুঝতে পারে, এগুলো আসল গ্রাহকের কাজ নয়। পাবলো বলেন, 'আমরা তো হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।' এর কিছুক্ষণ পরই রহস্যের জট খোলে। একটি বিদেশি মোবাইল নম্বর থেকে তাদের কাছে বার্তা আসে। তাতে বলা হয়, একটি কোম্পানি টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করেছে এসব নেতিবাচক রিভিউ লেখার জন্য। এখন পাবলোরা যদি ২০০ ইউরো দেন, তবেই ওই সব বাজে মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। এমনকি কারা এই কাজ করাচ্ছে, তাদের নামও জানিয়ে দেওয়া হবে।
শুরুতে পাবলো কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যান। তিনি ওই প্রতারকদের সঙ্গে ফোনে কথাও বলেন। পাবলোর ভাষায়, 'ওপাশ থেকে কথা শুনে মনে হচ্ছিল এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। যেন কোনো কল সেন্টার থেকে অনেকে মিলে কল করছে।'
শেষ পর্যন্ত অবশ্য পাবলো কোনো টাকা দেননি। প্রতারকদের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি ভিন্ন পথ বেছে নেন। প্রতিটি ভুয়া রিভিউয়ের নিচে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে উত্তর দেন এবং গুগলের কাছে ওই সব প্রোফাইলের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রিভিউগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু তত দিনে বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। সার্ভিমুভিংয়ের রেটিং কমে চারের ঘরে নেমে আসে। পাবলোর আক্ষেপ, 'গ্রাহকরা তো এসব রিভিউ দেখেই ফোন দেয়, তখন তাদের বোঝাতে হয় যে আসলে সব ঠিক আছে।'
শুধু এই কোম্পানিটিই নয়, স্পেনে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। মায়োর্কার দন্ত চিকিৎসক, অ্যালিকান্তের গাড়ির ডিলার, মালাগার চাবি নির্মাতা কিংবা মুর্সিয়ার এসি মিস্ত্রি—বাদ যাননি কেউই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে। এদের সবার ওয়েবসাইট ইংরেজি ভাষায় অথবা তারা বিদেশি গ্রাহকদের সেবা দিয়ে থাকে। কিন্তু ভুয়া রিভিউগুলো লেখা হচ্ছে স্প্যানিশ ভাষায় এবং খুব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে।
যেমন—'পল লেইজার' নামের একটি ভুয়া প্রোফাইল থেকে লেখা হয়েছে, 'ভয়াবহ সেবা। আমি স্থানীয়ভাবে বাসা বদলানোর জন্য সার্ভিমুভিং ডেকেছিলাম। তারা শিডিউল মানেনি, আমার জিনিসপত্র নিয়ে টানাটানি করেছে এবং দেয়ালে দাগ ফেলে গেছে।' পরে অবশ্য ওই ভুয়া প্রোফাইলটি ডিলিট বা মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এই অভিনব প্রতারণা ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
'যেন সবকিছুই তাদের জানা'
প্রতারক চক্রটি যে বেশ আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মায়োর্কার পালমা এলাকার 'ইউরোপিয়ান ডেন্টাল প্র্যাকটিস ক্লিনিক'–এর ঘটনায়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা হাইডি ল্যাংকফেল বলেন, 'তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল, বিষয়টি সম্পর্কে তারা বেশ ভালোই জানে।'
হাইডি সন্দেহ করছেন, এই জালিয়াতিতে এআই ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, 'রিভিউগুলোতে বেশ কিছু কারিগরি ও প্রযুক্তিগত বিষয় ছিল। এরপর তারা লিখতে শুরু করল যে আমাদের ক্লিনিক নোংরা, আগের রোগীর রক্তের দাগ চেয়ারে লেগে ছিল…ইত্যাদি। একটি ব্যবসার বারোটা বাজানোর জন্য এটুকু কথাই যথেষ্ট।'
দীর্ঘ আট বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এমন জালিয়াতি নিয়ে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফেডারেল অপরাধ তদন্তকারী কে ডিন। পালমার ওই ডেন্টাল ক্লিনিকের মালিকেরা ডিনের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। 'ফেক রিভিউ ওয়াচ' নামে ডিনের একটি ইউটিউব চ্যানেলও আছে।
তিনি বলেন, 'গুগল এখন ভুয়া রিভিউর মহাসাগর। এখানে ভালো-মন্দ দুই ধরনের ভুয়া রিভিউই আছে। তবে নেতিবাচক রিভিউগুলোর একটি অংশ চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে এক চিকিৎসকের কাছে সেবা নিতে গিয়ে বাজে অভিজ্ঞতার পর আমি এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করি।'
গুগল শেষ পর্যন্ত এসব ভুয়া রিভিউর বেশির ভাগই মুছে দেয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর অনেকগুলোই পোস্ট করা হয় পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু গুগল ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়।
অনুসন্ধানের জবাবে গুগল জানিয়েছে, তাদের সিস্টেম প্রতারণামূলক কন্টেন্ট বা তথ্য শনাক্ত করে তা সরিয়ে ফেলে। প্রতিষ্ঠানটি চমকে দেওয়ার মতো কিছু পরিসংখ্যানও দিয়েছে। তারা জানায়, ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নীতিমালার বাইরে যাওয়ায় ২৪ কোটির বেশি রিভিউ এবং ম্যাপের লোকেশনে ৭ কোটির বেশি এডিট তারা ব্লক করেছে বা মুছে দিয়েছে। পাশাপাশি ১ কোটি ২০ লাখের বেশি ভুয়া বিজনেস প্রোফাইলও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। গুগল আরও জানায়, এই ধরনের চাঁদাবাজি ঠেকাতে তারা গতবছর নতুন একটি ফরম চালু করেছে।
তবে ভুক্তভোগীরা গুগলের এই পদক্ষেপে খুব একটা সন্তুষ্ট নন। অ্যালিকান্তের গাড়ির ডিলারশিপ প্রতিষ্ঠান 'ক্যাটালেক্সকারস'–এর বিক্রয়কর্মী স্টিভ বলেন, 'এসব ক্ষেত্রে গুগল খুব ধীরগতিতে কাজ করে। অভিযোগ করলে তারা কেবল গৎবাঁধা অটোমেটেড উত্তর দেয়।'
ভুক্তভোগীদের অসহায়ত্ব
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিপদে পড়লে গুগলের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায় না। ডেন্টাল ক্লিনিকের হাইডি ল্যাংকফেল বলেন, 'আমি বহুবার গুগলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাদের সাহায্য করার পদ্ধতিটা হাস্যকর। তারা আপনাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যার সুযোগ দেবে না; এরপর আপনার অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য তারা লম্বা সময় অপেক্ষা করাবে।'
সার্ভিমুভিংয়ের পাবলোর অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, 'তাদের কোনো ফোন নম্বর নেই। আমি একদম দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কাকে ফোন করব? কার কাছে অভিযোগ জানাব? মনের ক্ষোভটাই বা ঝাড়ব কার কাছে?'
এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগমুহূর্তে অবশ্য ওই সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পেজ থেকে ভুয়া রিভিউগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করে এবং তাদের রেটিং আবার বাড়তে থাকে। তবে কিছু রিভিউ তখনো থেকে গিয়েছিল। পরে এল পাইসের পক্ষ থেকে গুগলকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসার তালিকা পাঠানোর পর সেগুলো পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়।
কে ডিনের মতে, এই পদ্ধতির বড় সমস্যা হলো, এখানে দায়টা গুগল ব্যবসায়ীদের ওপরই চাপিয়ে দেয়। তিনি বলেন, 'গুগল তাদের দায়িত্বের বড় অংশ ব্যবসার মালিকদের ঘাড়ে ফেলে দেয়। মালিকদেরই কষ্ট করে এসব রিভিউর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে হয়। রেটিং কমে যাওয়া এবং ব্যবসার আর্থিক ক্ষতির মানসিক চাপটা তাদেরই সইতে হয়, তা সে অল্প সময়ের জন্য হলেও।'
ডিন জানান, তিনি এমন ঘটনাও দেখেছেন যেখানে রিভিউ মুছতে দুই দিন লেগেছে, আবার কখনো এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়েছে।
প্রতারকদের কৌশল
প্রতারকদের জন্য কাজটা বেশ সহজ। তারা প্রথমে ভুয়া প্রোফাইল খোলে এবং সেগুলোকে 'রেস্ট্রিকটেড' করে রাখে, যাতে কেউ তাদের সব রিভিউ দেখতে না পায়। ডিন বলেন, এদের ধরতে হলে প্রতারকদের ভুলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
কে ডিন বলেন, 'কাজটা খুব কঠিন, কারণ আমি কোনো স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড পদ্ধতি ব্যবহার করি না। আমার ভরসা কেবল নিজের চোখ আর স্প্রেডশিট। প্রতারকরা মাঝেমধ্যে ভুল করে কোনো একটি প্রোফাইল ব্লক করতে ভুলে যায়, আর সেটাই হয় আমার সুযোগ। তখন আমি স্প্রেডশিটে তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পুরো জালিয়াতির ছকটা ধরতে পারি। দেখা যায়, অনেক প্রতারক প্রোফাইল বিশ্বের ছয়টি মহাদেশেই বিভিন্ন ব্যবসার বিরুদ্ধে ভুয়া ও নেতিবাচক রিভিউ দিয়ে বেড়াচ্ছে।'
'প্রতারণার এই ধরণগুলো খুব স্পষ্ট। আমার প্রশ্ন হলো, গুগল ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই আমি কীভাবে এসব প্রতারক ও তাদের চক্রকে শনাক্ত করে ফেলি? গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের তো আরও আগেই তা পারার কথা,' বলেন তিনি।
গুগল মাঝেমধ্যে ব্যবসার মালিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে ভুয়া রিভিউ সরিয়ে নেয় ঠিকই, কিন্তু একই প্রোফাইল থেকে দেওয়া অন্য ভুয়া রিভিউগুলো অনেক সময় বহাল তবিয়তেই থেকে যায়। কে ডিন বলেন, 'গুগল এমন এক শিথিল পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে যে প্রতারণা এখন ডালভাত হয়ে গেছে। আর এর মাশুল দিচ্ছে সৎ ব্যবসায়ীরা।'
এখন প্রশ্ন হলো, এই পদ্ধতিতে কি আসলেই প্রতারকদের পকেট ভারী হচ্ছে? ডিন জানান, অনেক ব্যবসাই এই হামলার শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, 'বেশির ভাগ ব্যবসায়ী টাকা দেন না। কিন্তু ২০ জনের মধ্যে ১ জনকেও যদি ২০০ ডলারে রাজি করানো যায়, তবেই তাদের লাভ। আমি এমন দু–একটি প্রতিষ্ঠানের কথা জানি, যারা টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে।'
তবে টাকা দিয়েও নিস্তার নেই। 'একটি প্রতিষ্ঠান টাকা দেওয়ার এক মাস পর আবারও তাদের পেজে ভুয়া ওয়ান স্টার রিভিউ আসতে শুরু করে,' বলেন ডিন।
