হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে ‘সরে দাঁড়ালেন’ নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প; গাজায় অনাহারে মরছে মানুষ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার হামাসের সঙ্গে গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। দুজনেই বলেছেন, হামাস যে কোনো চুক্তি চায় না, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল এখন তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য 'বিকল্প' পথ ভাবছে। এই লক্ষ্যগুলো হলো গাজা থেকে জিম্মিদের উদ্ধার ও সেখানে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানো। গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞে অনাহার ছড়িয়ে পড়ছে; অধিকাংশ মানুষই গৃহহীন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তার বিশ্বাস, হামাস নেতাদের এখন 'খুঁজে বের করে' নির্মূল করা হবে। তিনি দাবি করেন, 'হামাস আদতে কোনো চুক্তি করতে চায়নি। আমার মনে হয় তারা মরতে চায়। এবং এটা খুবই খারাপ। আর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কাজটা শেষ করতেই হবে।'
এসব মন্তব্য সংঘাত থামানোর জন্য আলোচনার পথ অন্তত স্বল্প মেয়াদে প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই ঘটনা ঘটছে, যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ক্রমবর্ধমান অনাহার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে।
গাজার মানবিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ঘোষণা করেছেন, প্রথম কোনো বড় পশ্চিমা শক্তি হিসেবে প্যারিস স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।
ব্রিটেন ও জার্মানি বলেছে, তারা এখনও এর জন্য প্রস্তুত নয়। তবে পরে তারা ফ্রান্সের সঙ্গে যোগ দিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, তার সরকার শুধু আলোচনার মাধ্যমে হওয়া শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।
মাখোঁর ঘোষণাকে অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, 'তার কথায় কিছু আসে যায় না। উনি খুব ভালো মানুষ। আমি তাকে পছন্দ করি, কিন্তু তার এই বক্তব্যের কোনো ওজন নেই।'
একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে হামাস তাদের প্রতিক্রিয়া জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বৃহস্পতিবার কাতার থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিনিধি দল প্রত্যাহার করে নেয়।
প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন সূত্র বৃহস্পতিবার জানিয়েছিল, ইসরায়েলের এই প্রত্যাহার শুধু আলোচনার জন্য; এর অর্থ এই নয় যে আলোচনা সংকটে পড়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর মন্তব্যই স্পষ্ট করে দিয়েছে, রাতারাতি ইসরায়েলের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এই অচলাবস্থার জন্য হামাসকে দায়ী করেছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, উইটকফ সঠিক কথাই বলেছেন।
সিনিয়র হামাস কর্মকর্তা বাসেম নাইম ফেসবুকে বলেছেন, আলোচনা গঠনমূলক ছিল। তিনি উইটকফের মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ইসরায়েলের পক্ষে চাপ সৃষ্টির জন্যই এমন মন্তব্য করা হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী কাতার ও মিশর বলেছে, আলোচনার সর্বশেষ পর্বে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তারা বলেছে, আলোচনায় সাময়িক বিরতি এ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ; তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের চেষ্টা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতিতে ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখা, গাজায় আরও ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে হামাসের হাতে থাকা বাকি ৫০ জন জিম্মির কয়েকজনকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাদের কতটা পিছু হটতে হবে এবং ৬০ দিন পর কোনো স্থায়ী চুক্তি না হলে ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে মতবিরোধের কারণে আলোচনা আটকে রয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোটের কট্টর-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির নেতানিয়াহুর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি গাজায় ত্রাণ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে উপত্যকার সম্পূর্ণ দখল নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরও বলেন: 'হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল, (ফিলিস্তিনিদের) দেশত্যাগে উৎসাহিত করা এবং (ইহুদি) বসতি স্থাপন করতে হবে।'
গণ-অনাহার
আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার মধ্যে গণ-অনাহার দেখা দিয়েছে। মার্চে ইসরায়েল ভূখণ্ডটিতে সমস্ত রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। মে মাসে কিছু নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে তা আবার চালু করলেও খাদ্য মজুত প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুক্রবার দাবি করেছে, তারা বিভিন্ন দেশকে বিমান থেকে গাজায় ত্রাণ ফেলার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। হামাস একে 'লোকদেখানো নাটক' বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অপুষ্টি বা অনাহারে আরও নয়জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। অনাহারের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহে কয়েক ডজন মানুষ মারা গেছে।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো শুক্রবার জানিয়েছে, গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য বিশেষায়িত থেরাপিউটিক খাবারের সরবরাহ ফুরিয়ে আসছে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনার পাশাপাশি ইসরায়েল গাজায় আক্রমণও অব্যাহত রেখেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গুলিতে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজা সিটিতে বাস্তুচ্যুত পরিবারদের আশ্রয় দেওয়া একটি স্কুলে হামলায় পাঁচজন নিহত হন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। এতে ১ হাজার ২০০ জন ইসরায়েলি নিহত হন। ২৫১ জন ইসরায়েলিকে জিম্মি হিসেবে ধরে নিয়ে যায় হামাস। এর পরপরই গাজায় নির্বিচার আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে; এছাড়া উপত্যকার বেশিরভাগ অংশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
