এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট দুর্ঘটনা: ফের আলোচনায় মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িং
বৃহস্পতিবার আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রাকালে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট এআই১৭১ গুজরাটের বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। বোয়িংয়ের তৈরি ড্রিমলাইনার মডেলের এই উড়োজাহাজটিতে ২৪২ জন যাত্রী ছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোয়িং নানা বিতর্কের মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, বোয়িংয়ের সাবেক প্রকৌশলী ও হুইসেলব্লোয়ার স্যাম সালেহপুর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)-কে জানান, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ তৈরির সময় কোম্পানিটি একাধিক ক্ষেত্রে 'শর্টকাট' উপায় বেছে নিয়েছে। তার মতে, বিমানটির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ত্রুটি বিপর্যয়কর ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে আহমেদাবাদের এই দুর্ঘটনা — এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ডিজিসিএ) জানিয়েছে, বিমানটি চালাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল, যার উড়ানের অভিজ্ঞতা ৮ হাজার ২০০ ঘণ্টা। তার সঙ্গে প্রথম কর্মকর্তা হিসেবে ছিলেন ক্লাইভ কুন্ডার, যার অভিজ্ঞতা ছিল ১ হাজার ১০০ ঘণ্টা।
উড্ডয়নের কয়েক মিনিট পরই তারা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে 'মেডে' সংকেত পাঠান।
বোয়িং এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'আমরা প্রাথমিক খবরের বিষয়ে অবগত এবং বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে কাজ করছি।'
বোয়িংয়ে ১০ বছর ধরে কাজ করেছেন সালেহপুর। জানা গেছে, তিনি দাবি করেছিলেন, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের কাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে, যেগুলো একপর্যায়ে বিমান বিধ্বস্তের কারণ হতে পারে। তিনি জানান, নির্মাণ প্রক্রিয়ায় শর্টকাট নেওয়ার ফলে বিমানের ফিউজলেজের (বিমানের কাঠামো) কিছু অংশ ভুলভাবে সংযুক্ত হয়েছে, যা কয়েক হাজার ফ্লাইটের পর বিধ্বস্তের কারণ হতে পারে।
এর আগেও, ২০১৯ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস দক্ষিণ ক্যারোলিনার চার্লসটনে অবস্থিত বোয়িংয়ের কারখানায় একাধিক হুইসেলব্লোয়ারের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, কর্মীদের বিমানের নির্মাণ দ্রুত শেষ করতে চাপ দেওয়া হতো এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে উপেক্ষা করা হতো।
বোয়িং এসব অভিযোগ সবসময় অস্বীকার করেছে। এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি বলেছিল, '৭৮৭-এর কাঠামোগত অখণ্ডতা নিয়ে করা এই অভিযোগগুলো ভুল এবং বোয়িং যে বিস্তৃত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা উড়োজাহাজের মান ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।'
এসব অভিযোগের পর এফএএ তদন্ত করেছে — বোয়িং নির্ধারিত পরিদর্শন কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছে কি না এবং কোম্পানির কর্মীরা বিমানের রেকর্ডে কোনো ধরনের জালিয়াতি করেছেন কি না।
২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে বোয়িংয়ের ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজ, যার প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৫০ বছর বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। প্রতিটি উড়োজাহাজ গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ফ্লাইট সম্পন্ন করতে সক্ষম বলে দাবি বোয়িংয়ের।
২০০৬ সালের জানুয়ারিতে এয়ার ইন্ডিয়া বোয়িংয়ের কাছ থেকে ৬৮টি উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দেয়, যার মধ্যে ২৭টি ছিল বি৭৮৭-৮০০ (ড্রিমলাইনার সিরিজ)। প্রথম চালানটি ২০১২ সালে সরবরাহ করা হয়।
৭৮৭-৮ মডেলের প্রতিটি উড়োজাহাজে ২৫৬টি আসন রয়েছে — এর মধ্যে ১৮টি বিজনেস ক্লাস (২-২-২ কনফিগারেশন) এবং ২৩৮টি ইকোনমি ক্লাস (৩-৩-৩ লেআউট)। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এয়ার ইন্ডিয়া ১০ বছরের বেশি পুরোনো ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিমানগুলো প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করে আসছিল।
ভারতের জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনটি ইউরোপগামী সকল ফ্লাইটে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ব্যবহার করে থাকে। লন্ডন ও প্যারিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোতেও এই উড়োজাহাজ নিয়মিত ব্যবহৃত হয়।
চীনা বিমান সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি করার কথা থাকা উড়োজাহাজগুলো কেনার বিষয়ে এয়ার ইন্ডিয়া এপ্রিল মাসে বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছিল। ব্লুমবার্গ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে চীনা সংস্থার কাছে এসব বিমান বিক্রি করতে পারেনি মার্কিন কোম্পানিটি।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনীত এফএএ প্রধান বোয়িংকে আরও কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন। সাম্প্রতিক সময়ে বোয়িংয়ের একাধিক নিরাপত্তাজনিত সংকট কোম্পানিটির কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এফএএ-এর ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক ক্রিস রোচেলো জানান, তিনি বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের মাসিক ৩৮টি উড়োজাহাজ উৎপাদনের সীমা তুলে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন না। রয়টার্স জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের একটি নতুন বোয়িং বিমানে মাঝ-আকাশে জরুরি ঘটনা ঘটার পর এই সীমা আরোপ করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, ওই বিমানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বোল্ট অনুপস্থিত ছিল।
উল্লেখ্য, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুটি ৭৩৭ ম্যাক্স বিমান দুর্ঘটনায় মোট ৩৪৬ জন প্রাণ হারান। সেই ঘটনার পর থেকে বোয়িং এখনো পুরোপুরি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ বোয়িংয়ের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যার আওতায় ৭৩৭ ম্যাক্স জেটলাইনার সম্পর্কে মার্কিন নিয়ন্ত্রকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে কোম্পানিটি ফৌজদারি মামলার হাত থেকে রেহাই পায়। এই চুক্তির অধীনে বোয়িং ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রদান ও বিনিয়োগে সম্মত হয়।
বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনার পর নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বোয়িংয়ের শেয়ারদর প্রাক-বাজার লেনদেনে ৮ শতাংশ কমে যায়। ভারতীয় সময় বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে প্রতি শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় ২১৪ ডলারে।
