ইউক্রেনকে আরো পর্যুদস্তু করতে রাশিয়ার গ্রীষ্মকালীন আক্রমণ শুরু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এলোমেলো মধ্যস্থতায়, যুদ্ধবিরতি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্যহীন এক আলোচনার পর—রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ইউক্রেনের শহরগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে ইউক্রেনের গুপ্তচররাও রাশিয়ার ভেতরে ঢুকে কৌশলগত বোমারু বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসবই মূল ঘটনার সূচনা মাত্র—রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার একটি গ্রীষ্মকালীন আক্রমণ এখন শুরু হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ইউক্রেনের মনোবল ভেঙে ফেলা এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যেকোনো মূল্যে প্রতীকী বিজয় এনে দেওয়া।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোর কর্তৃপক্ষ, অধিবাসী ও সেনারা এখন চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে যুদ্ধের কিনারায় থাকা কস্তিয়ান্তিনিভকা শহরকে রাশিয়া এখন ইউক্রেনীয় বাহিনীর ডনবাস অঞ্চলের রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই শহরের দখল মানে, ওই অঞ্চলের শেষ ইউক্রেনীয় ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশের পথ খুলে যাওয়া।
প্রতিদিন এ শহরের ওপর গড়ে ২৫টি গাইডেড বোমা নিক্ষেপ করছে রুশ যুদ্ধবিমান। বোমা থেকে প্রাণ বাঁচাতে অবশিষ্ট সাড়ে ৮ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই প্রতিদিন বিকেল ৩টার মধ্যে শহর ছেড়ে যান। দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম থেকে রুশ সেনারা ঘিরে ফেলছে শহরটিকে। পুলিশের প্রধান দিমিত্রি কিরদিয়াপকিন আসন্ন হামলাকে ব্যঙ্গ করে বলেন, "রুশ ভালোবাসার খাঁজে ধরা পড়ছে শহরটি।"
২০১৪ সালে হোরলিভকায় এবং ২০২২ সালে মারিওপোল অবরোধে অংশ নেওয়া এই কর্মকর্তা রাশিয়ার রণকৌশল ভালোই চেনেন—মৃত্যু, ধ্বংস, পুনরাবৃত্তি। এখন কস্তিয়ান্তিনিভকায় তাঁর অধীনস্থ পুলিশ ও চিকিৎসাকর্মীরা বেজমেন্টে কাজ করেন এবং ড্রোন হামলা ঠেকানোর জন্য লোহার খাঁচায় মোড়া গাড়িতে চলাচল করেন।
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কস্তিয়ান্তিনিভকা ও পাশের পোকরোভস্ক শহরই হবে রাশিয়ার গ্রীষ্মকালীন অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুমি প্রদেশ নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেখানে রাশিয়া ৫০ হাজার সৈন্য জড়ো করেছে এবং ধীরে ধীরে প্রাদেশিক রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। গত বছর ইউক্রেনের সেনারা ঠিক এভাবেই সীমান্ত পেরিয়ে রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলের কিছু অংশ দখল করেছিল। রুশ সেনারা এখন তারই অনুকরণ করছে।
যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম, রাশিয়া ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলেও যতটা অগ্রগতি করছে, ডনবাস অঞ্চলেও প্রায় ততটাই করছে। কারণ, ড্রোন যুদ্ধের উপযোগী নয় এমন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো তারা সহজেই ভেঙে ফেলছে। সীমান্তের ছোট শহর ও গ্রামগুলো খালি করে ফেলা হচ্ছে, বাসিন্দারা আকাশে বিস্ফোরিত হওয়া সস্তা ড্রোনের ঝাঁক দেখছেন। সামরিক সূত্রগুলো বলছে, রাশিয়া একবার উত্তরাঞ্চলে 'বাফার জোন' প্রতিষ্ঠা করতে পারলে, পরে দৃষ্টি ঘুরাবে ডনবাস ও দক্ষিণাঞ্চলের জাপোরিঝিয়া ফ্রন্টের দিকে, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ অঞ্চলটিকে ইতোমধ্যে একগুচ্ছ বোমার গর্তে ভরা জমিতে পরিণত করেছে।
গত তিন বছরে রাশিয়ার পক্ষে কোনো কৌশলগত অগ্রগতি হয়নি। তবু ইউক্রেনীয়রা বলছেন, আটক রুশ অফিসারদের কাছ থেকে জানা গেছে যে, এই গ্রীষ্মকালীন অভিযানকে 'চূড়ান্ত ধাক্কা' হিসেবে পরিকল্পনা করছে মস্কো—যার লক্ষ্য ইউক্রেনীয়দের মনোবল ভেঙে দেওয়া। পোকরোভস্কের কাছে অবস্থানরত ইউক্রেনীয় ড্রোন ইউনিট 'টাইফুন'-এর কমান্ডার মিখাইলো কেমেটিউক বলেন, 'রাশিয়ান কমান্ডাররা তাদের সেনাদের জীবনকে মূল্য দেন না বলেই এমন পরিকল্পনা করে।'
তাঁর দাবি, নতুন রুশ সেনাদের প্রতি দশজনের মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়, তবু সৈন্যদের ঢল থামে না। বড় অংকের সাইনিং বোনাস দিয়ে প্রতি মাসে রাশিয়া ইউক্রেনের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ হাজার বেশি সৈন্য নিয়োগ দিচ্ছে। সে তুলনায়, ইউক্রেনের বাধ্যতামূলক সেনানিয়োগ জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে এবং এটি একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বলেও অনেকে মনে করেন।
তবে কিছু ইউক্রেনীয় মনে করেন, রাশিয়ার পক্ষে ফ্রন্টলাইনের প্রতিরোধ সম্পূর্ণ ভাঙা সম্ভব নয়। কারণ, বর্তমানে উভয়পক্ষই ড্রোনের ভয়ে ছোট ছোট পদাতিক ইউনিট যুদ্ধে ব্যবহার করছে; ফলে রুশ অগ্রগতি ধীর এবং ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে প্রচুর। একসাথে বিপুল সংখ্যক সেনা ও সরঞ্জাম নিয়ে অগ্রসর হতে পারলে- রুশ আক্রমণ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারত।
ইউক্রেনের সংসদ সদস্য ও প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কমিটির সচিব, বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা রোমান কস্তেনকো বলেন, "রাশিয়ার শেষ বড় আক্রমণ ২০২২ সালের মে মাসে মারিওপোল দখলের পর শেষ হয়েছে। কস্তিয়ান্তিনিভকা তারা তিন বছরে নিতে পারেনি। কৌশল নিয়ে আলোচনাইবা কীভাবে শুরু করব?"
তবু অনেকে সতর্ক। ইউক্রেনের যুদ্ধের মূল শক্তি ছিল ড্রোন ব্যবহারের প্রাথমিক সুবিধা, যে প্রযুক্তিতে আধিপত্য এখন রাশিয়ার দখলে চলে যাচ্ছে। ইউক্রেনের ৯৩তম ব্রিগেডের কর্মকর্তা এডুয়ার্দ বলেন, "রাশিয়া এখন ড্রোন যুদ্ধে এগিয়ে গেছে।" 'রুবিকন' নামে রাশিয়ার নতুন একটি ইউনিট কস্তিয়ান্তিনিভকা-পোকরোভস্ক ফ্রন্টে বড় সমস্যা তৈরি করছে। ২০২৪ সালে কুরস্কের কাছে প্রথম মোতায়েন করা হয়েছিল এই ইউনিট। এটি সরাসরি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে, এবং তাদের সংগঠন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।'রুবিকন' একাধারে বড় ড্রোন থেকে ছোট ড্রোন উড়ায়, যার মধ্যে কিছু ড্রোন থাকে ফাইবার-অপটিক ক্যাবলে নিয়ন্ত্রিত, আবার কিছু চলে এমন ফ্রিকোয়েন্সিতে যা থামানো কঠিন।
ফ্রন্টলাইনে যাঁরা লড়ছেন, তাঁরা বলছেন, চীনের সহযোগিতাও এখন স্পষ্ট—বিশেষত নজরদারি ড্রোনে, যেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের চোখ হিসেবে কাজ করে। চীন ইউক্রেনকে এসব ড্রোন বিক্রি করছে না, অথচ দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, বেইজিং রাশিয়াকে ড্রোন উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছে। যদিও প্রতিপক্ষকে পাল্টা আঘাত দিচ্ছে ইউক্রেনও—সম্প্রতি তারা একটি হ্যাঙ্গারে লুকানো ট্যাংক ৪২ কিলোমিটার দূর থেকে আঘাত করেছে। তবে নতুন প্রজন্মের জ্যামিং-প্রতিরোধী ড্রোন এত উঁচুতে ওড়ে যে, সেগুলো প্রতিরোধ করতে পারে কেবল স্বল্প-পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন—আমেরিকান তৈরি হক বা সোভিয়েত যুগের বাক সিস্টেম। কিন্তু এসব সরঞ্জামে ইউক্রেনের বড় ঘাটতি রয়েছে।
পুরো মাত্রার যুদ্ধ শুরুর তিন বছর চার মাস পরেও ইউক্রেন আশাবাদী যে, ফ্রন্টলাইন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে না। তবে তার আগে 'স্থিতিশীলতা' রক্ষা করতে গিয়ে মাঝের সময়টুকুতে অনেক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই গ্রীষ্মকালীন আক্রমণের সম্ভাব্য ফল হতে পারে স্পষ্ট বিজয় বা পরাজয় নয়, বরং মানচিত্রে কিছু পরিবর্তন, যেটা পুতিনকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট উৎসাহ দিতে পারে। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের এই পর্যায় শেষ হলে আবারও কূটনৈতিক আলোচনার জানালা খুলতে পারে—আবার নাও পারে।
"রুশদের নিয়ে সমস্যা হলো, তারা প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে পারে," বলেন কিরদিয়াপকিন। "অন্যদিকে আমাদের ক্ষতি অনেক কম হলেও, আমরা তা অনেক বেশি অনুভব করি"- যোগ করেন তিনি।
