‘পিকাচু’ নাম রাখা যাবে না : অপ্রচলিত নামের বিরুদ্ধে জাপানের লড়াইয়ের কী কারণ?
জাপানে নাম রাখার নতুন আইনের ফলে 'পিকাচু' বা 'ডোরেমি'-এর মতো চমকপ্রদ নাম রাখা কঠিন হয়ে গিয়েছে। গত সপ্তাহে ঘোষিত এই বিধিনিষেধের লক্ষ্য হলো সন্তানদের অস্বাভাবিক ও আলাদা ধাঁচের নাম দেওয়া রোধ করা। এসব নাম জাপানে পরিচিত 'কিরা কিরা' নামে, যার অর্থ 'চাকচিক্যময়'।
কিন্তু এমন নাম রাখা জাপানি কর্তৃপক্ষের কাছে কেন সমস্যার কারণ হলো? যেসব অভিভাবকরা সন্তানদের নাম রাখতে চান জুতার ব্র্যান্ড 'নাইকি' কিংবা কার্টুনের জনপ্রিয় চরিত্রের নামে ,তারাই বা কী করবেন?
'কিরা কিরা' নাম কী?
'কিরা কিরা' নাম বলতে বোঝায় এমন সব অপ্রচলিত নাম, যেগুলোর উচ্চারণ অস্বাভাবিক বা কাঞ্জি অক্ষরে লিখলে তার উচ্চারণ পুরোপুরি পালটে যায়।
জাপানে লেখার তিনটি প্রধান পদ্ধতি হলো হিরাগানা, কাতাকানা ও কাঞ্জি। নাম লেখার ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যবহৃত হয় কাঞ্জি বর্ণমালা। জাপানি অভিভাবকেরা ২,৯৯৯টি অনুমোদিত কাঞ্জি অক্ষরের মধ্যে থেকে সন্তানের নাম রাখতে পারেন। এর মধ্যে ২,১৩৬টি বর্ণ নাম রাখার জন্য বেশি প্রচলিত। পাশাপাশি, নাম লেখার জন্য হিরাগানা বা কাতাকানাও ব্যবহার করা যায়।
যদিও 'কিরা কিরা' নাম খুব বেশি প্রচলিত নয়, তবুও ১৯৮০ সালের পর থেকে এগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এর পেছনে ছিল পপ কালচার, ব্র্যান্ড এবং পোকেমন কিংবা স্টুডিও জিবলির মতো টোকিওভিত্তিক অ্যানিমেশন চরিত্রগুলোর প্রভাব।
এ ধরনের নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে, অভিভাবকেরা আগে ঠিক করেন তারা সন্তানের নাম কী রাখবেন। ধরা যাক কেউ রাখলেন 'পিকাচু' কিংবা কাল্পনিক চরিত্র 'হ্যালো কিটি'। এরপর তারা নামের উচ্চারণের সাথে মেলানোর জন্য কিছু কাঞ্জি বর্ণ জোড়াতালি দিয়ে থাকেন। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক সময়ই কাঞ্জির উচ্চারণ আসল নামের কাছাকাছিও হয় না। ফলে নাম হয় বিভ্রান্তিকর, কিংবা পুরোপুরি ভিন্ন কিছু বলেই শোনায়।
কিরা কিরা নাম নিয়ে সমস্যাটা কোথায়?
এই নামগুলো যে ভাবে কাঞ্জিতে লেখা হয়, তার উচ্চারণ অনেক সময় একেবারেই ভিন্ন হয়।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক কাঞ্জিতে লেখা "今鹿" নামটি। কাঞ্জি অনুসারে এর উচ্চারণ হওয়া উচিত 'ইমাশিকা', যা সাধারণত একটি পারিবারিক নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে বাবা-মা হয়তো এই কাঞ্জিগুলো দিয়ে রাখতে চেয়েছেন 'নশিকা' নাম,যেটি নেওয়া হয়েছে হায়াও মিয়াজাকির ১৯৮৪ সালের স্টুডিও জিবলির অ্যানিমেশন 'নশিকা অফ দি ভ্যালি অফ দি উইন্ড' থেকে।
টেম্পল ইউনিভার্সিটির ভাষাবিদ জন মাহের বলেন, 'প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক রোল কলের সময় সামনের সারির এক ছাত্রীর নাম দেখে থমকে যান। কাঞ্জি দেখে কিছুই বুঝতে পারছেন না। ভাবছেন ' হুঁ? নশিকা?! তুমি মজা করছো? এটা তো একটা অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের নাম!'
আরেকটি উদাহরণ হতে পারে কাঞ্জিতে লেখা '七音' যার উচ্চারণ হওয়া উচিত প্রচলিত জাপানি নাম 'নানানে' । কিন্তু অনেকে এটি রাখেন 'ডোরেমি' নাম বোঝাতে। এই নামটি ২০০০ সালের জনপ্রিয় অ্যানিমে 'ওজামাজো ডোরেমি' অথবা 'ডোরেমন' মাঙ্গার চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত।
জন মাহেরের মতে, 'এইসব নাম প্রতিদিনকার জীবনে সমস্যা তৈরি করছে। স্কুলের শিক্ষকরা ঠিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের নাম উচ্চারণ করতে পারছেন না। অফিসের বসরাও কর্মীদের নাম বুঝে উঠতে পারছেন না।'
অভিভাবকেরা কেন 'কিরা কিরা' নাম ব্যবহার করছে?
এই 'চকচকে' নামগুলোকে অনেকেই দেখছেন প্রথা ভাঙার এক ধরনের প্রয়াস হিসেবে।
মেইজি ইয়াসুদা লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ১৯১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তথ্য থেকে দেখা যায় এক শতাব্দীর ব্যবধানে নাম রাখার ধরণে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে।
ভাষাবিদ ও লেখক অ্যাডাম আলেকসিক বলেন, 'প্রচলিত নামগুলো বহু প্রজন্ম ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। 'কিরা কিরা' নামগুলো মূলত সেই ঐতিহ্যগত নামগুলোর বিপরীতে এক ধরণের প্রতিক্রিয়া।'
তবে এ ধরনের প্রবণতা শুধু জাপানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আলেকসিক এর মতে পপ কালচারের প্রভাব বিশ্বজুড়েই রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, 'হাঙ্গার গেমস' সিরিজ জনপ্রিয় হওয়ার পর অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানের নাম রেখেছেন 'ক্যাটনিস'।
জাপানের প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, 'কিরা কিরা' নামের উত্থান হতে পারে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি সাংস্কৃতিক এক ঝোঁকের প্রতিফলন। তার ভাষায়, 'সম্ভবত পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবেই এটা ঘটছে। কেননা ঐতিহাসিকভাবে জাপান ছিল অনেক বেশি সমষ্টিকেন্দ্রিক একটি সংস্কৃতি।'
জাপান সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
টোকিওভিত্তিক সাংবাদিক জে অ্যালেন জানান, 'কিরা কিরা' নাম নিয়ে জাপান সরকার যেটি করেছে, সেটি মূলত পারিবারিক নিবন্ধন আইনের একটি সংশোধনী।
এই নতুন আইনে পরিবারগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি রেজিস্ট্রিতে কাঞ্জি নামের সঠিক উচ্চারণ বোঝাতে নামের নিচে হিরাগানা ও কাতাকানা বর্ণে উচ্চারণ লিখে দিতে হবে। এখন থেকে সরকার নামের বানান আর উচ্চারণের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে পারবে।
জে অ্যালেন জানান, এখন জাপানি কর্তৃপক্ষ সব বাড়িতে চিঠি পাঠাবে, যাতে পরিবারের সদস্যদের নামের উচ্চারণ নিশ্চিত করা যায়। শুধু নবজাতক নয়, যেকোনো বয়সী সদস্যের ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে। তবে যেসব প্রবীণ ব্যক্তি ইতোমধ্যে 'কিরা কিরা' নাম ব্যবহার করছেন, তাদের নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না।
আর এভাবেই সরকার সরাসরি 'কিরা কিরা' নাম নিষিদ্ধ করেনি। কিন্তু এই নতুন নিয়মের মাধ্যমে তারা বিভ্রান্তিকর উচ্চারণে কাঞ্জি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইছে।
জে অ্যালেন ব্যাখ্যা করেন, 'বাবা মায়েদের এখন প্রমাণ করতে হবে যে কাঞ্জি বর্ণ ও তাদের বেছে নেওয়া নামের উচ্চারণে সামঞ্জস্য রয়েছে'
ফলে যে নামগুলোর উচ্চারণ কাঞ্জির সঙ্গে সম্পর্কহীন, অথবা যেগুলো সহজেই ভুলভাবে উচ্চারিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে যে নামগুলো সরকার বাতিল করে দেবে।
আইনের ফলে কী হতে পারে?
আলেকসিকের মতে, নতুন আইন অপ্রচলিত উচ্চারণের নামের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, অভিভাবকেরা নামকে বিচিত্র ও আলাদা করতে অন্য উপায় খুঁজে বের করবেন যেমন বিরল কাঞ্জি ব্যবহার বা কাটাকানায় বেশি জোর দেওয়া।
তিনি বললেন, 'ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। তাই এই অভিভাবকেরা অন্য কোনো পথে তাদের সন্তানের নাম আলাদা করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। আর তাতে পুরনো নিয়ম-কানুনে বিশ্বাসীরা বিরক্তই হবেন।'
অনুবাদ:নাফিসা ইসলাম মেঘা
