গাজায় বন্দিদের ওপর নিগ্রহ চালাচ্ছে ইসরায়েল: জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তা
জাতিসংঘের এক মানবাধিকার কর্মকর্তা শুক্রবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নিগ্রহ চালানোর অভিযোগ করেছেন৷
তিনি বলেছেন, তিনি এমন কিছু লোকের সঙ্গে দেখা করেছেন, যাদের কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকে রেখে মারধর করা হয় এবং চোখ বেঁধে রাখা হয়। এমনকি এদের কয়েকজনকে ডায়াপার পরিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
গাজায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তা আজিথ সুংহায় সাংবাদিকদের বলেন, ৭ অক্টোবর হামাসের প্রাণঘাতী হামলার জবাবে ফিলিস্তিনি উপত্যকায় সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে ইসরায়েল ঠিক কতজনকে আটক করেছে, তা এখনও স্পষ্ট না।
গাজা থেকে ভার্চুয়ালি জেনেভায় সাংবাদিকদের সুংহায় বলেন, 'অজ্ঞাত স্থানে বন্দিদের ৩০ থেকে ৫৫ দিন ধরে আটক করে রেখেছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী।'
তিনি জানান, অবরুদ্ধ উপত্যকায় মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, 'এই ঠান্ডা আবহাওয়ায়ও পর্যাপ্ত পোশাক ছাড়া কেবল ডায়াপার পরিয়ে বন্দি পুরুষদের মুক্তি দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।'
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা গাজার যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে তাদের অভিযানের অংশ হিসেবে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত সন্দেহভাজনদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইউনিট জানিয়েছে, আটকদের সঙ্গে 'আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আচরণ' করা হয়েছে এবং যারা যুদ্ধে সম্পৃক্ত নয় বলে প্রমাণ হয়েছে, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তারা জানায়, সন্দেহভাজনদের তাদের পোশাক খুলে দিতে বলা হয়, যাতে 'তারা বিস্ফোরক বা অন্যান্য অস্ত্র লুকিয়ে রাখছে না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য' তল্লাশি করা যায় এবং এরপর আবার বন্দিদের তাদের পোশাক ফেরত দেওয়া হয়।
মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে কয়েকজন কেন ডায়াপার পরেছিলেন সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে সুংহাই বলেন, 'আমরা ঠিক নিশ্চিত না যে কেন তাদের ডায়াপার পরিয়ে বাইরে পাঠানো হয়েছিল। তবে আমি যখন তাদের সঙ্গে দেখা করি, তখন তারা স্পষ্টতই হতবাক হয়ে পড়েছে এবং এমনকি কাঁপছিল।
গত ডিসেম্বরে গাজায় ফিলিস্তিনি পুরুষদের অন্তর্বাস খুলে ফেলার ফুটেজ সম্প্রচার করে ইসরায়েলি টেলিভিশন।
ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ফিলিস্তিনি, আরব ও মুসলিম বিশ্ব এ ঘটনায় ব্যাপক নিন্দা জানায়।
ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র আইলন লেভি বলেন, ছবিগুলোতে পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের দেখা যাচ্ছে। তাদের এমন এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়, যেখান থেকে কয়েক সপ্তাহ আগেই বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল।
অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর শেয়ার করা বেশ কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, শত শত ফিলিস্তিনি পুরুষ শুধু অন্তর্বাস পড়ে ঠান্ডায় নগ্ন হয়ে বাইরে বসে আছেন, কখনও কখনও চোখ বাঁধা ভিডিও দেখা গেছে। কয়েকটি ভিডিওতে নারী ও শিশুদেরও দেখা গেছে।
বেইত লাহিয়া, সুজাইয়া ও জাবালিয়াসহ গাজার বিভিন্ন স্থানে এসব ভিডিও ধারণ করা হয়।
ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের মতে, মুক্তি পাওয়া একাধিক বন্দী বলেছে, নিজেদের অভিশাপ দেওয়া এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গালিগালাজ করার পরে তাদের ট্রাকে করে উন্মুক্ত আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেখানেও তারা মারধর এবং অন্যান্য দুর্ব্যবহার সহ্য করেছে।
সুংহায় জোর দিয়ে বলেন, 'ইসরায়েলকে অবশ্যই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে গ্রেপ্তার বা বন্দিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের নিয়ম ও মানদণ্ড অনুযায়ী আচরণ করা হয়।'
তিনি বলেন, 'ইসরায়েল যদি প্রতিটি বন্দির জন্য প্রয়োজনীয় অপরিহার্য সুরক্ষা না দিতে পারে, তাহলে তাদের অবশ্যই অভিযুক্ত বা বন্দিদের মুক্তি দেওয়া উচিত।'
ইসরায়েলি বাহিনীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন বন্দি শুক্রবার পৃথকভাবে দক্ষিণ গাজার রাফাহের আবু ইউসুফ আল নাজ্জার হাসপাতালে পৌঁছেছেন।
তারা সবাই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের সঙ্গে ভয়াবহ দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন।
মুহাম্মদ আবু সামরা নামের একজন আল জাজিরাকে বলেন, 'আল-সাফতাউই এলাকা থেকে ইসরায়েলের একটি বিশেষ বাহিনী আমাদের গ্রেপ্তার করে। এরপর আমাদের নির্যাতন ও মারধর করা হয়। এরপর তারা ... আমাদেরকে ইসরায়েলি সেনা সদর দপ্তরের একটি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করে।'
তিনি বলেন, 'সেনাবাহিনী...ঠান্ডায় নগ্ন অবস্থায় আমাদের গুলি করে মারার হুমকি দেয়। এরপর নারী সেনারা আমাদের ওপর হামলা চালায় এবং আমরা অশ্লীল অপমানের শিকার হই।'
'প্রেসার কুকার'
রাফায় অবস্থানরত জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তা সুংহায় বলেন, লোকজন এখনও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরটিতে আসছে। অসহায় মানুষগুলো হাতের কাছে যা পাচ্ছে তা দিয়েই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করছে।
তিনি বলেন, 'আমি দেখেছি প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে তৈরি তাঁবু আটকে রাখার জন্য পুরুষ ও শিশুরা কংক্রিট খুঁড়ছে। এটি একটি বিশাল মানবাধিকার সংকট।'
গাজা উপত্যকার জন্য মানবিক সহায়তা বাড়ানোর জরুরি প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে সুংহায় বলেন, 'ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি, সরবরাহ ঘাটতি এবং ব্যাপক ভয়; সব মিলে এখানে একটি প্রেসার কুকারের মতো পরিবেশ বিরাজ করছে।'
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে শুক্রবার পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২৪ হাজার ৭৬২ জন নিহত এবং ৬২ হাজার ১০৮ জন আহত হয়েছে।
৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ১৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
