রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে জিতলে কী হবে? বিশেষজ্ঞরা যেসব পরিস্থিতি অনুমান করছেন...
ইউক্রেনে যুদ্ধ যে সহসাই শেষ হচ্ছে না, গতবছরেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে অনেক ঢাকঢোল পেটানোর পরেও– কাজের বেলায় ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ মুখ থুবড়ে পড়ে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিতে অনুধাবন করছেন, প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও রাশিয়া এ যুদ্ধে জিততে পারে।
কি হবে যদি বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও ইউক্রেনে বিজয় কেতন ওড়ায় রাশিয়া? তাহলে তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতোন ন্যাটো দেশগুলোর সীমান্তে পৌঁছে যাবে রুশ সেনারা। এতে সামরিক জোটটি গুরুতর এক হুমকির সম্মুখীন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি অলাভজনক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক– ইনস্টিটিউট অব স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ)। খ্যাতনামা এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করছে, উল্লেখিত পরিস্থিতির জোর সম্ভাবনা আছে যদি ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দান বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র, এবং তারপরে ইউরোপের অন্যদেশগুলোও একই পদক্ষেপ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই এমন উদ্বেগের পেছনে কাজ করেছে। এরমধ্যে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ তহবিল নানানভাবে আটকে রাখছেন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। কিয়েভকে দেওয়া সাহায্য-সহযোগিতায় আরও নিয়ন্ত্রণের পক্ষে তাঁরা। দলাদলির এই ফেরে– আমেরিকান সমর্থনের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এদিকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও ইউক্রেনের জন্য দুঃসংবাদ আসতে পারে। বিশেষত, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরলে এমন আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে পারে। ইউক্রেন ও ন্যাটো জোটকে বিপুল সহায়তা দেওয়ার বিরোধী ট্রাম্প। তিনি বরং, রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পরিত্যাগ করার পক্ষে।
ফলে পশ্চিমা দুনিয়ার অনেকের কাছে এসব চিন্তা যতই বিস্বাদ ঠেকুক, ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অনুমানে এখন মনোযোগ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে খারকিভ, ঝাপোরিঝিয়া ও খেরসনের মতো যুদ্ধের সম্মুখভাগে ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ কতোটা টিকে থাকতে পারবে– সেই অনুমানও করেছেন তাঁরা।
ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক আইএসডব্লিউ এ ধরনের বেশকিছু দৃশ্যকল্প ভেবে, তাঁর ভিত্তিতে বিভিন পরিস্থিতির অনুমান করেছে।
সংস্থাটির মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে বেশিরভাগ মানুষের ধারণার চেয়েও 'অনেক উচ্চমাত্রার স্বার্থ' রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
দ্য হাই প্রাইস অব ল্যুজিং ইউক্রেন' শীর্ষক তাঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র যদি সমস্ত সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে, এবং ইউরোপও সে পদাঙ্ক অনুসরণ করে– তাহলে সমগ্র ইউক্রেন দখল হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও, বিজয়ী রাশিয়ান সেনাবাহিনী– কৃষসাগর থেকে উত্তর মেরু সাগর উপকূল পর্যন্ত – ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তে চলে আসবে।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কো যে পরিমাণ সেনাশক্তি নিয়ে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করেছিল– পশ্চিমাদের সহায়তায় তার ৯০ শতাংশ ধবংস করতে পেরেছে কিয়েভের বাহিনী। তবে ব্যাপক হারে হতাহত হওয়ার পরেও– তাঁদের জায়গায় নতুন সেনা ভর্তি করতে পেরেছে রাশিয়া। একইসঙ্গে সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি মেটাতে নিজেদের শিল্প উৎপাদনকে বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে ইউক্রেনে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শুরু করেছে ক্রেমলিন।
এই অবস্থায়, আইএসডব্লিউ বলছে, রাশিয়ান সেনাবাহিনী বিজয়ী হলে– মোট সেনাবাহিনীর আকার ২০২২ সালের আগের সময়ের চেয়েও অনেকটাই বড় হবে। তাঁরা হবে যুদ্ধাভিজ্ঞ একটি বাহিনী।
এই অবস্থায়, 'দিনে দিনে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমতে থাকবে' এবং তার ফলে 'মেকানাইজড যুদ্ধে কঠিন লড়াই করে জেতার অভিজ্ঞতার যে শিক্ষা' তারা লাভ করেছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি দুধর্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তুলবে মস্কো।
ন্যাটোর সীমান্তে অবস্থান করা 'এই রুশ সেনাবাহিনী হবে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সজ্জিত। যা একমাত্র ভেদ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিলথ বা রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম যুদ্ধবিমান। তবে এসব বিমান বর্তমানে চীনকে মোকাবিলা করতে অনেক বেশি প্রয়োজন আমেরিকার। ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বেশি সংখ্যায় স্টিলথ বিমান মোতায়েন করা হয়তো সম্ভব হবে না।
'ফলে ১৯৯০ এর দশকের পরে প্রথমবারের মতোন– ন্যাটো জোটের বিরুদ্ধে সর্ববৃহৎ প্রচলিত সামরিক হুমকি হয়ে উঠবে রাশিয়া।'
আইএসডব্লিউয়ের মতে, ইউক্রেন ও বেলারুশ পুরোপুরি দখল করে নিলেও– রাশিয়ার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বহুগুণ শক্তিশালী থাকবে ন্যাটো জোটের মিলিত সামরিক শক্তি। তবুও ইউক্রেনে রাশিয়াকে জিততে দিলে 'অনেকে যা ধারণা করেন তার চেয়ে চড়া মূল্য চুকাতে হবে' বলে উল্লেখ করেছে।
কী হবে সেসব মূল্যদান বা সংকট- তাও তুলে ধরেছেন থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির বিশেষজ্ঞরা। প্রধানত দুটি পরিস্থিতি উল্লেখ করেন তাঁরা, এগলো হলো –
- শক্তিশালী রুশ হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ব ইউরোপে নিজ স্থল বাহিনীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে মোতায়েন রাখতে হবে।
- এদিকে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে এশিয়ায় যত বেশি সম্ভব স্টিলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখতেই হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু, যুদ্ধে জয়ী রাশিয়ার নতুন হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপেও এ ধরনের বিমান সংখ্যা বাড়াতে হবে। এনিয়ে এক উভয় সংকটে পড়বে পেন্টাগন। আর প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বহুগুণে বাড়বে।
প্রতিবেদনে সমর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, 'ইউক্রেনকে হারতে দেওয়ার চেয়ে– প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সহায়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি সস্তা ও সুবিধাজনক। কিন্তু, কোন ধরনের যুদ্ধবিরতি হলে, রাশিয়া সেই সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। এর বিপরীতে, কিয়েভের বাহিনী নিজ দেশের যতখানি এলাকা পুনরুদ্ধার করবে– রুশ সেনাদেরও ততোটাই পূর্ব দিকে পিছু হঠতে হবে।
আইএসডব্লিউ বলেছে, প্রথমে ইউক্রেনকে জিততে সহায়তা করা এবং তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়াই হবে সেরা কৌশল।
