গাজা আক্রমণ নিয়ে ইসরায়েলের চূড়ান্ত পরিকল্পনা কী?
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আচমকা হামলার পর গাজায় নিরবচ্ছিন্ন পালটা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। গাজা উপত্যকা থেকে হামাসকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে চায় ইসরায়েল। কিন্তু এ যুদ্ধ নিয়ে দেশটির কাছে চূড়ান্ত কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।
চলমান যুদ্ধ বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এমন আট আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্স-এর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তারা জানান, ইসরায়েলের 'অপারেশন সোর্ডস অভ আয়রন' শীর্ষক এ সামরিক অভিযান গাজায় অতীতে ইসরায়েলের পরিচালনা করা যেকোনো অভিযানের তুলনায় অনেক বেশি নৃশংস হবে।
তিনজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার মতে, ইসরায়েলের প্রাথমিক কৌশল হচ্ছে গাজার অবকাঠামো ধ্বংস করা, এমনকি তা যদি হয় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণের বিনিময়েও। এছাড়া গাজাবাসীকে মিশরীয় সীমান্তের দিকে ঠেলে দিয়ে তারপর গাজার মাটির তলায় থাকা হামাসের সুড়ঙ্গগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে ইসরায়েলের।
খোদ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধপরবর্তী ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নিয়ে তাদেরও পরিষ্কার ধারণা নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরায়েলের হয়তো হামাসের ওপর বড় কোনো আঘাত হানার পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে, কিন্তু এটি এখনো প্রস্থান-কৌশল তৈরি করে উঠতে পারেনি।
২৩ লাখ বাসিন্দার আবাস গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইসরায়েল এখনো পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেনি বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আরব দেশগুলোর কর্মকর্তারাও।
'গাজার জন্য চূড়ান্ত কোনো পরিকল্পনা নেই ইসরায়েলের। এটির কৌশল হলো হাজার-হাজার বোমা ফেলা, সবকিছু ধ্বংস করা, গাজায় প্রবেশ করা, কিন্তু তারপর কী? তার পরের দিনের জন্য তাদের প্রস্থানের কোনো কৌশল নেই,' একজন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন।
বুধবার ইসরায়েল সফরে বাইডেন বলেছেন, হামাসকে উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। তবে তিনি এও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নিউ ইয়র্কে ৯/১১-এর হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু ভুল করেছিল।
'ফিলিস্তিনিদের বড় অংশ হামাস নন। হামাস ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না,' বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির অনেক কর্মকর্তাই বলেছেন, ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন।
কিন্তু এর পরে কী হবে তা খুব একটা সুনির্দিষ্ট করা নেই। হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার কাজটা হয়তো বলার চেয়ে করা অনেক কঠিন হতে পারে ইসরায়েলের জন্য।
'এ শহরে মাটির তলায় এত সুড়ঙ্গ আছে যে তার তুলনায় ভিয়েতকং নস্যি ঠেকে। তারা হামাসকে ট্যাংক, গোলাগুলির মাধ্যমে ধ্বংস করতে পারবে না,' বলেন একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
দুই আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে বলেন, হামাসের সশস্ত্র বিভাগ আল-কাসাম ব্রিগেড ইসরায়েলি আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা গাজায় ইতোমধ্যে ট্যাংক-বিধ্বংসী মাইন ও বিস্ফোরক-সমৃদ্ধ ফাঁদ পেতে রেখেছে।
এর আগে হামাসের বিরুদ্ধে তিনবার লড়েছে ইসরায়েল — ২০০৮–৯, ২০১২ ও ২০১৪ সালে। দুইবার দেশটি সীমিত পরিসরে গাজায় স্থল আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু এখনকার মতো ইসরায়েল অতীতে কখনো হামাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার শপথ করেনি।
ওই তিন যুদ্ধে ৪০০০-এর মতো ফিলিস্তিনি এবং ১০০-এর কম ইসরায়েলি মারা গিয়েছিলেন।
ওয়াশিংটনও খুব বেশি আশাবাদী নয়। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, ইসরায়েল হামাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারবে, তবে এটি গাজার ক্ষমতা ধরে রাখতে বা গাজা পুনর্দখল করতে চাইবে না।
মার্কিন এক সূত্রমতে, আরও একটি সম্ভাবনাময় দৃশ্যপট হতে পারে, ইসরায়েলি বাহিনী যত সম্ভব হামাস সদস্যকে হত্যার বা ধরার চেষ্টা করবে, হামাসের সুড়ঙ্গ ও রকেট কারখানাগুলো ধ্বংস করবে, এবং এরপর ইসরায়েলি হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে এটি বিজয় ঘোষণা করবে ও গাজা ত্যাগ করার উপায় খুঁজবে।
অঞ্চলটিতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, চলমান সংঘাত কেবল গাজায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও এর মদতদাতা ইরান হামাসের সমর্থনে নতুন রণাঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে পারে — এমন সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকেই।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে সংযত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরান সাইডলাইনে বসে বসে দেখবে না।
মার্কিন সেক্রেটারি অভ স্টেট অ্যান্টনি ব্লিংকেন গত এক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন। আরব নেতারা তাকে জানিয়েছেন, তারা ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণকে নিন্দা জানালেও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দলগত শাস্তির বিরুদ্ধে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সমর্থনে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি বিমানবাহী রণতরীবহর পাঠিয়েছে। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে, ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে লড়াই শুরু করতে পারে ইসরায়েল। তবে মার্কিন সেনাবাহিনী বর্তমান ভূমিকা ছেড়ে এ সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে যাবে — এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
আঞ্চলিক ওই সূত্ররা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন প্যালেস্টাইনিয়ান অথোরিটিকে (পিএ) নতুন করে শক্তিশালী করার চিন্তা করেছে। ২০০৭ সালে হামাসের কাছে গাজার ক্ষমতা হারায় পিএ। তবে গাজা থেকে হামাসকে উৎখাত করলে সেখানে পিএ বা অন্য কোনো সংগঠন শাসন করতে পারবে কি না তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে।
এদিকে গাজার প্রতিবেশী আরব দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইসরায়েল গাজায় স্থল-আক্রমণ শুরু করলে ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে — নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হবেন। এর আগে লাখ-লাখ ফিলিস্তিনি জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তারা আশ্রয় নেওয়া দেশগুলোতে এখনো শরণার্থী হিসেবেই অবস্থান করছেন।
