ইউক্রেন যুদ্ধ: লবণখনি শহর সোলেদারের অধিকাংশই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে
ইউক্রেনের সেনাদের সাথে মাসব্যাপী যুদ্ধের পর দেশটির পূর্বাঞ্চলের লবণখনি সমৃদ্ধ শহর সোলেদারের অধিকাংশ এলাকা বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। খবর বিবিসির
যুক্তরাজ্য জানায়, গত চার দিনে এ শহরে আরো অগ্রসর হয়েছে রাশিয়ান সেনাবাহিনী ও ক্রেমলিন অনুগত ভাড়াটে সেনাদের সংগঠন- ওয়াগনার মার্সেনারি গ্রুপের যোদ্ধারা।
সোলেদার বাখমুতের কাছাকাছি অবস্থিত, আর বাখমুতের নিয়ন্ত্রণ নিতে দীর্ঘদিন ধরে রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। সোলেদারে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাখমুতের লড়াইয়ে তারা শত্রুপক্ষকে পিছু হঠতে বাধ্য করছে।
সোমবার (৯ জানু) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা-ও বলেছেন, সোলেদারের একটি 'বড় অংশ' রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি সোলেদারে ধবংযজ্ঞের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, 'একটি দেওয়ালও অক্ষত নেই, শহরটি প্রাণশূন্য'। তিনি আরো দাবি করেন, 'সোলেদারের কাছাকাছি এলাকা দখলদার সেনাদের লাশে ছেয়ে গেছে। উন্মাদনা হয়তো একেই বলে'।
ইউক্রেন যুদ্ধপূর্ব সময়ে সোলেদারের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। রুশ বাহিনী এ শহরটিকে বাখমুত দখলে নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান মনে করছে। তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব কতোটা তা নিয়ে নিশ্চিত নন পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা।
এখানে রাশিয়ার অন্য লক্ষ্য রয়েছে বলে মনে করেন তাদের কেউ কেউ। যেমন গত সপ্তাহে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াগনার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভগেনি প্রিগোঝিন এই শহরের সুবিশাল লবণ ও জিপসাম খনির নিয়ন্ত্রণ চান।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, সোলেদারে ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ রয়েছে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার সেনারা এটির নিয়ন্ত্রণ চায়। কারণ সুড়ঙ্গটি ব্যবহার করে সহজেই শত্রুর অবস্থানের পেছনে গিয়ে তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালানো যাবে।
প্রিগোঝিন অবশ্য খনি দখল নিয়ে আগ্রহ গোপন করেননি। এগুলো দখল করা গেলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাখমুত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তা 'লোভনীয় উপরি পাওয়া' হবে বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি খনিগুলোকে 'ভূগর্ভস্থ শহরের নেটওয়ার্ক' উল্লেখ করে বলেছেন, '৮০-১০০ মিটার গভীরে এখানে অনেক মানুষ অবস্থান করতে পারবে। সুড়ঙ্গগুলো দিয়ে ট্যাংক ও অন্যান্য সামরিক যানবাহনও চলাচল করতে পারবে।
যদিও ইউক্রেনের প্রতিরোধ লাইন স্থিতিশীল থাকায় রাশিয়া অচিরেই বাখমুত দখলে নিতে পারবে না বলে মনে করছে যুক্তরাজ্য সরকার।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক মাস ধরে চলছে বাখমুত দখলে প্রচণ্ড লড়াই। সাম্প্রতিক সময়ের লড়াইগুলোকে 'নৃশংস' বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এরমধ্যেই বাখমুত অঞ্চলে যাওয়া দুজন ব্রিটিশ নাগরিকের সন্ধান মিলছে না। তাদের সর্বশেষ সোলেদারের দিকে যেতে দেখা গিয়েছিল।
গত রাতের ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সোলেদার প্রতিরোধ গড়ে তোলা ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের অদম্যতা আমাদের অতিরিক্ত সময় ও শক্তি দিয়েছে।
সোমবার ইউক্রেন সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফের এক ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, এদিন ইউক্রেনীয় সেনারা সোলেদার ও বাখমুতসহ ১৩টি জনপদে রুশ বাহিনীর আক্রমণ রুখে দিয়েছে।
রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘ যুদ্ধ চললেও ইউক্রেনের একজন সামরিক বিশ্লেষক ওলেহ ঝাদানভ মনে করেন, সোলেদার বা বাখমুত কোনোটাই সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার দিক থেকে বিশেষ কোনো গুরুত্বের নয়।
তবে 'রাশিয়া পুরো বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চায়, তার সেনাবাহিনী বিজয়ীও হতে পারে'। সোমবার ইউক্রেনীয় সংবাদপত্র গ্যাজেটা'কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক– ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার এর মতে, প্রিগোঝিন 'সোলেদার ও বাখমুতে তার ওয়াগনার গ্রুপের বাস্তব ও কাল্পনিক সাফল্যকে প্রচার করে এটাই দেখাতে চাইবেন যে, ইউক্রেনে ওয়াগনারই একমাত্র রুশ বাহিনী যারা সুস্পষ্ট সাফল্য অর্জনে সক্ষম'। অর্থাৎ, প্রিগোঝিন এ কৌশলে রাশিয়ায় তার রাজনৈতিক প্রভাবকে আরো শক্তিশালী করতে চাইছেন।
