‘জেলেনস্কি জানেন ইউক্রেনের কাছে সময় খুবই কম’
যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো দেশের মাটি ছেড়ে যুদ্ধকালীন সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি। আজ বুধবার (২১ ডিসেম্বর) ওয়াশিংটন ডি.সিতে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। দ্য আটলান্টিক অবলম্বনে
কিন্তু, জেলেনস্কি এসেই বুঝবেন– ওয়াশিংটনে এখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ নিয়েই যত ব্যস্ততা। ইউক্রেন সেখানে গৌণ। এই হাওয়া বদল করেছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল। আর কিছু দিনের মধ্যেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে দায়িত্ব নেবেন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। এরমধ্যেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার সুপারিশ করেছে কংগ্রেসের তদন্ত কমিটি। ট্রাম্প হলেন রিপাবলিকান দলের। মধ্যবর্তী নির্বাচনে শক্তিশালী হওয়া মার্কিন বিরোধী দল এই পদক্ষেপ বানচাল করবে কিনা– সেটাই এখন দেখার বিষয়। মোদ্দা কথা- সামনে আরো নাটকীয় ঘটনা দেখবে মার্কিন রাজনীতি। চারিদিকে চলছে তারই মঞ্চ সাজানোর প্রস্তুতি।
আমেরিকায় এই নাটকের মঞ্চায়ন বেশ গুরুত্বপূর্ণ; বিশ্বের সবচেয়ে পরাক্রমশালী গণতন্ত্রের অনেক কিছুই নির্ভর করবে যার ওপর।
অথচ জেলেনস্কি আসছেন যুদ্ধ-কবলিত একটি দেশ থেকে, দেশ রক্ষার চূড়ান্ত সংঘাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। আক্ষরিক অর্থেই জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছে ইউক্রেন। তিনি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নির্দলীয় সমর্থন আশা করে এতদূর ছুটে আসছেন। সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ারই আভাস মিলছে। কারণ, মার্কিন রাজনীতিতে এখন আসন্ন ঝড়ের আগের থমথমে পরিস্থিতি। ডেমোক্রেট, রিপাবলিকান সবাই নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়নেই ব্যতিব্যস্ত।
আসন্ন বড়দিন উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির প্রস্তুতি চলছে ওয়াশিংটনে। তার মধ্যেই সফরের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এ সময়ে সফর করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনেও যথেষ্ট কারণ আছে জেলেনস্কির।
সাম্প্রতিক সময়ে রুশ বাহিনীর বোমাবর্ষণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউক্রেনের শহরগুলো। অন্যদিকে, স্থলযুদ্ধে দেখা যাচ্ছে কৌশলগত বিরতির ছায়া। বিরতির পর যুদ্ধ নতুন তীব্রতা লাভ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই অবসরে নিজ বাহিনী পুনর্গঠন করছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এরমধ্যেই বেলারুশ সফর করেছেন তিনি। বেলারুশ থেকে ফের কিয়েভ অভিমুখে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আলাপ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্টন আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর সাথে।
বাইডেন ও ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটরা ইউক্রেনকে দৃঢ় সমর্থন দিচ্ছেন। আকাশপথে রাশিয়ান হামলা ঠেকাতে এরমধ্যেই ইউক্রেনে একটি প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের ব্যাটারি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাইডেন প্রশাসন। প্রসঙ্গত, একেকটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিতে থাকে আটটি অ্যান্টি-মিসাইল লঞ্চার বা উৎক্ষেপক। এটি পেলে ইউক্রেনের প্রতিরোধ শক্তির ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে।
তবে এই সিস্টেম পরিচালনায় ইউক্রেনীয়দের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দরকার হবে, ওয়াশিংটনের সাথে কিয়েভের সরবরাহ পরবর্তী পরিচালনার কাজে গভীর সহযোগিতার। ন্যাটো জোটকেও ইউক্রেনকে দিতে হবে প্যাট্রিয়ট সফলভাবে ব্যবহার করা যায় এমন তথ্য। শুধুমাত্র তাহলেই রাশিয়ান মিসাইলের ধবংসলীলা অনেকটাই কমানো যাবে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনে আরো শত শত কোটি ডলারের সহায়তা পাঠানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে মার্কিন কংগ্রেস। তবে এই অর্থের পুরোটাই যাবে না সামরিক সহায়তা হিসেবে। বরং বিদ্যুৎহীন অবস্থায় প্রচণ্ড শীতের মধ্যে সাধারণ ইউক্রেনীয়রা যাতে প্রাণরক্ষা করতে পারে, তেমন সহায়তাও থাকবে।
এই সফরে মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণও দেবেন জেলেনস্কি। তিনি এসময় কী বলবেন, সে সম্পর্কে আগাম জানা যায়নি। তবে সবকিছু যদি পরিকল্পনামাফিক চলে, তাহলে বাইডেনের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে তার দেশের প্রতি পশ্চিমা দুনিয়ার সমর্থন আরো ব্যাপকতা লাভ করবে। বাইডেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রচেষ্টাতেই পুতিনের হুমকির মুখেও ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনে অবিচল থাকতে পেরেছে পশ্চিমারা।
মার্কিন রাজধানীতে নির্দলীয় সমর্থন লাভের পথ মসৃণ নয় জেলেনস্কির সামনে। রিপাবলিকান দল চাইছে সোভিয়েত ভাবাদর্শে বিশ্বাসী রাশিয়ার বর্তমান প্রশাসনের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন। ফলে তারা জেলেনস্কির ভাষণে কতোটা কান দেবে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।
অথচ, জানুয়ারিতে তাদের হাতেই থাকবে প্রতিনিধি পরিষদের চাবিকাঠি। রিপাবলিকানদের অনুমোদন ছাড়া ইউক্রেনের জন্য নিত্যনতুন সহায়তার বিলও পাস হবে না।
একথা সত্য, সার্বিকভাবে রিপাবলিকান দল ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু, এই দল এখন দুই শিবিরে বিভাজিত, একদিকে রয়েছে জর্জ ডব্লিউ বুশের সমর্থক ও প্রাচীনপন্থীরা। অন্যদিকে, আরেক অংশের নিয়ন্ত্রণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। যার সাথে ডেমোক্রেটদের সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায় বললেও কম বলা হয়। তাছাড়া, ট্রাম্পপক্ষীয়রা ডেমোক্রেটদের সাথে একাত্ম হওয়াকে ঘোর অপরাধই মনে করেন। সে তুলনায়, তাদের রয়েছে রাশিয়া প্রীতি।
ইউক্রেনের জন্য আপাতত সুখবর এটাই যে, দেশটির জন্য প্যাট্রিয়ট সিস্টেম পাঠানোর বিষয়টি ইতোমধ্যেই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে রিপাবলিকানদের বিভাজন অদূর ভবিষ্যতে ইউক্রেনের জন্য বিপদই ডেকে আনবে। এতে দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমেরিকার দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ হয়তো আর সম্ভব হবে না। বরং সময়ের সাথে সাথে শিথিল হয়ে পড়বে। সম্প্রতি এমন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, পশ্চিমা বিশ্বের এই দুর্বলতার অপেক্ষাই করছেন পুতিন।
